


শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: গারমেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজের আড়ালেই চলছিল লস্করের হয়ে মডিউল তৈরির কাজ। তাও খাস কলকাতায়! এর কারিগর কে? উমর ফারুক। ধৃত আট লস্কর জঙ্গির একমাত্র ভারতীয়। মালদহের বাসিন্দা। আপাতত দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের হাতে বন্দি। তার কাজ ছিল একটাই—বাংলাদেশি যুবকদের সীমান্ত পার করিয়ে এদেশে এনে বড়োসড়ো নাশকতা ঘটানো। নিউটাউনের কাছে হাতিয়াড়ায় বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল সে। জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য। এটাই প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার প্ল্যান ছিল তার। টাকাও এসে গিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশ থেকে। সেটাই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে গোয়েন্দাদের। ভারতের দুই পড়শি দেশেই একযোগে জঙ্গি মডিউল তৈরির কাজ চলছে। উমরকে জেরায় দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল জানতে পেরেছে, হাতিয়াড়ার বাড়িটিকেই ‘সেফ হাউস’ হিসাবে ব্যবহার করছিল ধৃত জঙ্গিরা। তার থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইলে কোথায় কীভাবে নাশকতা ঘটাতে হবে, তার উল্লেখ রয়েছে। মিলেছে প্রশিক্ষণ ও মগজ ধোলাই সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ও।
৭ ফেব্রুয়ারি দিল্লি পুলিশের কাশ্মীরি গেট সহ বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশনে ‘ফ্রি কাশ্মীর’, ‘স্টপ জেনোসাইড’ লেখা ভারতবিরোধী একাধিক পোস্টার পড়ে। তাতে বুরহান ওয়ানির ঘটনা উসকে নানাবিধ মন্তব্য লেখা ছিল। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে দিল্লি পুলিশ দু’জনকে চিহ্নিত করে। ঘটনাস্থল ও দিল্লি রেল স্টেশনে টাওয়ার ডাম্প পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে জানতে পারে, এদের একজনের নাম উমর ফারুক, অন্যজন রবিউল ইসলাম। শুরু হয় রেকর্ড ঘাঁটা। তখনই হদিশ মেলে ২০০৭ সালের রবিউলের গ্রেপ্তারির। বড়ো ব্রেক-থ্রু পাওয়া যায় অবশ্য টাওয়ার ডাম্প করে পাওয়া উমরের ফোন নম্বর থেকে। সিমটি নিউটাউনের হাতিয়াড়া এলাকার। তার সূত্র ধরেই একে একে মেলে বাংলাদেশ, মালদহ এবং কলকাতার লিঙ্ক। পুলিশ জানতে পারে, কলকাতা থেকে তারা এসেছিল। সেখানেই ফিরে গিয়েছে। কলকাতায় পৌঁছে যায় দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। রাজ্য পুলিশকে সঙ্গে শুরু হয় অভিযান। হাতিয়াড়া এলাকার ওই বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় উমর ফারুক ও তার সহযোগী বাংলাদেশি রবিউলকে।
জেরায় ফারুকের সঙ্গে লস্করের হ্যান্ডলার সাব্বির আহমেদ লোনের যোগের কথা জেনেছে পুলিশ। ফারুক একাধিকবার বাংলাদেশে গিয়ে লস্করের ক্যাম্পে ট্রেনিংও নিয়েছে। সে-ই রবিউলকে কলকাতায় নিয়ে আসে। দু’জনে মডিউল তৈরির কাজে হাত লাগায়। এই দুই জঙ্গিই কলকাতার একটি গারমেন্ট ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকের ছদ্মবেশে ছিল। ফলে কারও সন্দেহও হয়নি। তদন্তকারীদের ফারুক জানিয়েছে, নিউটাউনের ফ্ল্যাট ভাড়া-সহ জঙ্গি কার্যকলাপের পুরো টাকাই তাকে পাঠিয়েছিল সাব্বির। ওই হ্যান্ডলারের নির্দেশমতো সে ও রবিউল এ রাজ্যের একাধিক স্টেশন, শপিং মল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান রেকি করে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিস্ফোরণ ছিল তাদের টার্গেট। সোশ্যাল সাইটের মাধ্যমে ফারুকের সঙ্গে পরিচয় হয় বাংলাদেশের আর এক লস্কর হ্যান্ডলার সইদুল ইসলামের। সইদুল তাকে জানায়, তামিলনাডুতে গারমেন্ট ফ্যাক্টরিতে ছদ্মবেশে রয়েছে লস্কর মডিউলের আরও আট জঙ্গি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কলকাতায় নিয়ে আসার কথা ছিল ফারুকের। হাতিয়াড়ার বাড়িতে লস্করের অন্যদের সঙ্গে বসে বড়ো নাশকতার প্ল্যানিং হত। তাদেরই ছ’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে নিউটাউনের বাড়িতে সাব্বির ঘুরে গিয়েছে কি না, তা এখনও জানা যায়নি। কলকাতায় ধৃত দুই জঙ্গি।