


সুকান্ত বসু, কলকাতা: ব্রিটিশ আমলের মুদ্রা? হ্যাঁ, থাকতে পারে। নামকরা কোনও জমিদারের মামলার নথি? হ্যাঁ, থাকতে পারে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কেস সংক্রান্ত কাগজপত্র? হ্যাঁ, তাও থাকতে পারে। চেনা ইতিহাস বদলে দিতে পারে এমন দলিল থাকাটাও আশ্চর্যের নয়। কিন্তু, ভিতরে কী আছে তা ঈশ্বরই জানেন।
ব্যাঙ্কশাল কোর্টের এক কোণে একটি সিন্দুক আছে। সেটি যে কত পুরনো তারও কোনও আন্দাজ মেলে না। ওজনে খুব ভারী। নড়ানো প্রায় অসম্ভব। লোহার তৈরি। কালচে গায়ের রং। যদিও রং চটেছে। সর্বাঙ্গে ধুলোর পুরু আস্তরণ। একটি কাঠের পাটাতনের উপর রাখা সিন্দুকটি কিন্তু অক্ষতই রয়েছে। তবে খোয়া গিয়েছে তার চাবি। ফলে কত যুগ ধরে যে সেটি খোলা হয়নি তা আদালতের কেউ জানেন না। অনুমান, দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে চাবির খোঁজ মেলেনি। ফলে সিন্দুকের কপাট খোলাও হয়নি। ব্যাঙ্কশাল কোর্টের বাড়িটি ইংরেজ আমলে তৈরি। এখন হেরিটেজ ঘোষিত। সিন্দুকটি সম্ভবত বাড়িটির মতোই পুরনো, আন্দাজ প্রবীণ আইনজীবীদের। দিনকয়েক আগে এক পুলিসকর্মী সিন্দুকটির গায়ে খোদাই লেখাটি পড়ার চেষ্টা করছিলেন। নিজের মনেই বললেন ‘ওরে বাবা।’ দেখা গেল লেখা রয়েছে, ‘ডব্লিউ লেসলি অ্যান্ড কোম্পানি ক্যালকাটা।’ লেসলি নামের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানটি ১৮৯০ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের কাজকর্ম করত। বাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। তারা বানাত সিন্দুক। পাশাপাশি অ্যালুমিনিয়াম, পিতল, স্টিলের জিনিসপত্রও তৈরি করত। আমদানির কাজও করত। সেই ডব্লিউ লেসলি’র কাছ থেকে সিন্দুকটি আদালতের কোনও কাজের জন্যই কেনা হয়েছিল বলে অনুমান। আর অনুমান, মূল্যবান নথিপত্র, আর্থিক জরিমানার টাকাপয়সা রাখা হতো সিন্দুকটিতে।
এ প্রসঙ্গে উঠে আসে আলিপুর জজ কোর্টের কথা। সেখানে বিশাল মাপের একটি লোহার আলমারি অনাদরে পড়েছিল বছরের পর বছর। বহু চেষ্টার পর ইংরেজ আমলের সে আলমারি খোলা সম্ভব হয়। তারপর উদ্ধার হয় কিছু ঐতিহাসিক সম্পদ। স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু ঐতিহাসিক মামলার নথিপত্র সামনে আসে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নথিটি হল কলকাতার মুরারিপুকুরের বোমা মামলার। যা আলিপুর বোমার মামলা নামে খ্যাত। সে মামলায় প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন বিপ্লবী ঋষি অরবিন্দ ঘোষ। সে নথি লোহার আলমারিতে ছিল। এছাড়া মিলেছিল কলকাতার তৎকালীন একাধিক জমিদার বাড়ির আইনি বিবাদের নথি। উইল। দলিল। দেওয়ানি মামলার নথিপত্র। পরে আরও দু-একটি আলমারি থেকে মেলে বেশ কিছু ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ নথি। পুলিসের হাতে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন জিনিসপত্র। সে সমস্ত ঐতিহাসিক সম্ভার রাখা হয় পরবর্তী সময় তৈরি আলিপুর জজ কোর্টের বিচার সংগ্রহশালায়। ব্যাঙ্কশালের প্রবীণ আইনজীবীদের অনেকের বক্তব্য, ‘এখানে থাকা সিন্দুকটি খোলা হলেও হয়ত বহু ঐতিহাসিক সম্পদ বেরিয়ে আসবে। তা দিয়ে গঠিত হতে পারে কোনও সংগ্ৰহশালা।’ আদালত প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, সিন্দুক খোলার সররকম চেষ্টা চলছে।
তাহলে কি অচিরেই সামনে আসতে চলেছে ইতিহাসের বহু অজানা মণিমুক্ত? সিন্দুকটা তো আগে খুলুক তারপর জানা যাবে এর উত্তর।