


শুভঙ্কর বসু, কলকাতা: এসআইআর পর্বে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছিল নির্বাচন কমিশন। তারপর একে একে রোল অবজার্ভার এবং সব শেষে কয়েক হাজার মাইক্রো অবজার্ভার। উদ্দেশ্য— বাংলায় একশো শতাংশ স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি। অন্তত এমনটাই বারবার জোর গলায় বলে এসেছেন জ্ঞানেশ কুমাররা। কিন্তু সেই দাবি কতটা সঠিক? প্রশ্ন উঠে গেল রাজ্য প্রশাসন সূত্রে সামনে আসা এক ছোট্ট পরিসংখ্যানে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিন ধার্য ছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে অবশ্য সেটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। রাজ্য প্রশাসন সূত্রে খবর, সেই সপ্তাহেই কোনো তথ্য যাচাই না করে অন্তত ২৩ লক্ষ ভোটারের নাম ‘বিচারাধীন’ তালিকায় ঠেলে দিয়েছেন রোল অবজার্ভাররা। কার নির্দেশে এই কাজ? কমিশনের? নাকি নেপথ্যে বিজেপি নেতাদের কলকাঠি? উঠছে প্রশ্ন।
কমিশনের পরিসংখ্যানই বলছে, ২৮ ফেব্রুয়ারির সাত দিন আগে পর্যন্ত মাইক্রো অবজার্ভারদের হাতে যাচাই না হওয়া নথির সংখ্যা ছিল ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৮১৯। আর রোল অবজার্ভারদের কাছে ২৩ লক্ষ ৩৭ হাজার ৭৬৮। প্রশাসন সূত্রে খবর, এই বিপুল সংখ্যক নথির অধিকাংশই যাচাই না করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল ইআরও-দের কাছে। জানা গিয়েছে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য— গত ২০ ফেব্রুয়ারি এক রোল অবজার্ভার নাকি একদিনে ৪০ হাজার নথি যাচাই করেছেন। আর এক সংখ্যালঘু প্রভাবিত জেলায় ২২ ফেব্রুয়ারি অন্তত ৯৭ হাজার নথি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যাচাই করে রিভিউয়ের জন্য পাঠিয়েছেন এক রোল অবজার্ভার। এমনকি মালদহের এক ইআরও তো এও জানিয়েছেন, মাত্র এক মিনিটের মধ্যে তাঁর কাছে রিভিউয়ের জন্য অন্তত ১ হাজার ১২২ জন ভোটারের নথি পাঠিয়েছেন রোল অবজার্ভার। আর ঠিক এই কারণেই শেষ এক সপ্তাহে ফুলেফেঁপে উঠে ৬০ লক্ষ অতিক্রম করে যায় ‘বিচারাধীন’ তালিকা। সেটির সিংহভাগই রাজ্যের সংখ্যালঘু প্রভাবিত জেলাগুলিতে ছড়িয়ে।
শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অবশ্য বরাবরের অভিযোগ, বাংলার ভোটারদের নাম বাদ দিতে এত আয়োজন আদতে গেরুয়া শিবিরের ‘মাস্টার প্ল্যান’। সেই কারণে রাজ্যের অফিসারদের মাথার উপর নিয়োগ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারি আধিকারিকদের। বিজেপির নির্দেশ কার্যকর করতেই যে রোল অবজার্ভাররা মাঠে নেমেছিলেন, তা এখন জলের মতো পরিষ্কার। এত দিন অভিযোগ উঠেছিল, তাঁরা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়ে ইআরও-দের প্রভাবিত করতে চাইছেন। একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ফাঁস করে এই চক্রান্ত সামনে এনেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সম্প্রতি দাবি করেছেন, বাংলায় অন্তত ১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দিতে উঠে পড়ে লেগেছে বিজেপি ও তাদের ‘বি টিম’ কমিশন। সেই অভিযোগ যে মোটেও ভিত্তিহীন নয়, আবার তার প্রমাণ মিলল। মাইক্রো অবজার্ভারদের পর আঙুল উঠল রোল অবজার্ভারদের দিকেও।
সূত্রের খবর, শনিবার পর্যন্ত আট লক্ষের কিছু বেশি ‘বিচারাধীন’ ভোটারের নথি নিষ্পত্তির কাজ শেষ করেছেন বিচারকরা। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত তালিকা কবে প্রকাশ করা হবে? জবাবে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছেন, এটা একটা প্রক্রিয়াগত বিষয়। এনিয়ে শীর্ষ আদালত রাজ্যস্তরে একটি কমিটি গঠন করছে। তারা আলোচনা করছে। বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্তে আসা গেলেই অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।