


ভারতের নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত এবং তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ভোটার তালিকায় নতুন নাম তোলার জন্য কয়েক মাস আগে ‘ফর্ম ৬’-এ পরিবর্তন আনা হয়েছিল। সম্প্রতি প্রবল চাপের মুখে কমিশন শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশের যে সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ হয়েছে, সেখানে ফের ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধির পুরানো ফর্ম ৬-কেই ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এই ঘটনাটি শুধু একটি প্রশাসনিক সংশোধনী নয়, বরং নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্য, সাংবিধানিক নিয়মনীতি লঙ্ঘন এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির লাগাতার প্রতিবাদের এক জটিল সমীকরণকে তুলে ধরেছে। ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ার শুরুতে নির্বাচন কমিশন ফর্ম ৬-এর সঙ্গে একটি অ্যানেক্সচার যুক্ত করে। সেই নিয়ম অনুযায়ী, নতুন ভোটারদের তালিকায় নাম তুলতে গেলে তাঁদের বাবা-মা, দাদু-দিদা বা পূর্বপুরুষদের নাম শেষ বার এসআইআরের সময়ে তালিকায় ছিল কি না, সেই তথ্য জানানো বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। এই বাড়তি তথ্যের বেড়াজালে পড়ে নতুন ভোটারদের একটা বড়ো অংশ চরম হেনস্তা ও আইনি জটিলতার মুখে পড়েন। অভিযোগ ওঠে, ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিতে যথাযথ আইনগত সংশোধন বা সংসদীয় অনুমোদন ছাড়া কমিশন সরাসরি এই নিয়ম পরিবর্তন করতে পারে না। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, কমিশনের অন্দরেই এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা হয়েছিল। সর্বভারতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের এই একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘ডিসেন্ট নোট’ বা ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন অপর দুই নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশি ও সুখবীর সিং সান্ধু। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভোটার আইনে কোনো সংশোধনী না এনে ফর্ম ৬-এর ফরম্যাট বদলানো সম্পূর্ণ ‘বেআইনি’ ও ‘অনুমোদনহীন’। কিন্তু সেই আপত্তিতে কান না দিয়ে নিয়ম বলবৎ করা হয়। পরবর্তীতে সর্বভারতীয় ওই সংবাদমাধ্যমে এই অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ও আপত্তির বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পরই দেশজুড়ে শোরগোল পড়ে যায়। বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি তোলে। ঘরে-বাইরে তৈরি হওয়া এই প্রবল রাজনৈতিক চাপ এবং আইনি প্রশ্নের মুখে শেষ পর্যন্ত ব্যাকফুটে যেতে বাধ্য হন জ্ঞানেশ কুমার।
কমিশনের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, কেরল, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, গুজরাত ও গোয়া সহ যে রাজ্যগুলিতে এসআইআর পর্ব ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে, সেখানে আর ওই অতিরিক্ত স্বঘোষণা জমা দিতে হবে না। একইসঙ্গে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, লাক্ষাদ্বীপ এবং পুদুচেরির মতো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিতেও পুরানো ফর্ম ৬ বহাল করা হয়েছে। তবে যে সমস্ত রাজ্যে বর্তমানে এসআইআর প্রক্রিয়া চালু রয়েছে, সেখানে আবেদনকারীদের ওই সেল্ফ ডিক্লারেশন জমা দেওয়ার নিয়মটি আপাতত বহাল রাখা হয়েছে।
এই গোটা ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক বড়ো প্রশ্নচিহ্ন ঝুলছে। প্রথমত, যে রাজ্যগুলিতে বহু আগেই এসআইআর শেষ হয়ে গিয়েছে, সেখানে হঠাত্ করে ফর্ম ৬-এ এই ধরনের বদল আনার যৌক্তিকতা কী ছিল—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দ্বিতীয়ত, দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিকে পাশ কাটিয়ে এককভাবে এমন একটি নীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কেন হল? তথ্য ফাঁসের পর কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের বৈঠকে পিছু হটার বিষয়টি প্রমাণ করে যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও ঐকমত্যের জায়গায় কোথায় যেন ফাটল ধরেছে। তাছাড়া, ‘ইসিআইনেট’ পোর্টালের কেন্দ্রীকরণ এবং বিভিন্ন রাজ্যে সময়সীমা বাড়ানো বা অনলাইন শুনানির মতো বিষয়েও কমিশনকে শেষ পর্যন্ত কমিশনারদের আপত্তি মেনে একাধিক পদক্ষেপ করতে হয়েছে। একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে নির্বাচন কমিশনের মূল দায়িত্ব হল ভোটারদের ভোটাধিকার সুরক্ষিত করার পাশাপাশি, প্রক্রিয়াটিকে সহজ ও সাবলীল রাখা। কিন্তু ফর্ম-৬ বদল ঘিরে যে অনভিপ্রেত বিতর্ক তৈরি হল, তা ভোটারদের মনে অনাস্থার জন্ম দিতে পারে। ভবিষ্যতে এই ধরনের স্পর্শকাতর নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও বেশি আইনি সতর্কতা, রাজনৈতিক শুভবুদ্ধি এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং প্রতিটা ভোটারের সমানাধিকার। সেই অধিকার প্রয়োগের পথ যেন কোনো জটিল প্রশাসনিক বেড়াজালে অবরুদ্ধ না হয়, এবারের বিতর্ক আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে গেল।