


প্রীতম দাশগুপ্ত: খ্রিস্টপূর্ব ৬২ অব্দ। রোমের ‘বোনা দেয়া’ উৎসব। পুরুষদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তারই মধ্যে পাবলিয়াস ক্লডিয়াস নামে এক যুবক মেয়েদের সাজে ঢুকে পড়লেন। ধরাও পড়লেন রোমান শাসক জুলিয়াস সিজারের স্ত্রী পম্পেইয়ার অন্দরমহলে। তদন্তে পম্পেইয়ার কোনো অসততা বা পরকীয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি। এমনকি ক্লডিয়াসও আদালতে খালাস পেয়ে যান। কিন্তু ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই সিজার বিবাহবিচ্ছেদ দেন পম্পেইয়াকে। কেন এমন চরম সিদ্ধান্ত? সিজারের সেই অমর উক্তিটি ছিল, ‘সিজারস ওয়াইফ মাস্ট বি অ্যাবাভ সাসপিশন।’। অর্থাৎ, সিজারের স্ত্রীকে শুধু নির্দোষ হলেই চলবে না। তাঁকে সমস্ত সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে একে বলে সিজারীয় নীতি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার এ এক চরম অলিখিত সনদ। ব্রিটিশ প্রধান বিচারপতি লর্ড হেওয়ার্ট ১৯২৪ সালের বিখ্যাত ‘রেক্স বনাম সাসেক্স জাস্টিসেস’ মামলায় এই দর্শনেরই আধুনিক রূপ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘ন্যায়বিচার শুধু হলেই চলবে না, ন্যায়বিচার যে স্পষ্টভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তা দৃশ্যমানও হতে হবে। ভারতীয় সংবিধানেও এই নীতির কথা বলা হয়েছে। ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের কথা বলেছে। সুপ্রিম কোর্টও একসময় স্পষ্ট করে দিয়েছিল, গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি ভোটারের চোখে হতে হবে ‘সিজারের স্ত্রীর মতো’। অর্থাৎ, কোনো পক্ষপাত, রাজনৈতিক প্রভাব ও সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। ব্যক্তি জ্ঞানেশ কুমার দোষী না নির্দোষ—তার বিচার করবে আইন-আদালত। কিন্তু ঘটনা পরম্পরা এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে, নির্বাচন কমিশন সিজারের নীতি মেনে চলেনি। তাই সন্দেহ বাড়ছে।
প্রথম সন্দেহ শুরু হয়েছিল, আজ থেকে প্রায় বছর তিনেক আগে। ২০২৩ সালের মার্চ। অনুপ বার্নওয়াল বনাম ভারত সরকার মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কে হবেন, তা ঠিক করবে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা ও সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের প্যানেল। কিন্তু সরকার সেই রায়কেই ঠুটো করে দিল। সংসদে পাশ করিয়ে নিল ‘চিফ ইলেকশন কমিশনার অ্যান্ড আদার ইলেকশন কমিশনার্স অ্যাক্ট, ২০২৩’। তাও ১০০ জনেরও বেশি বিরোধী সাংসদকে সাসপেন্ড করে। সেই আইনে প্রধান বিচারপতিকে ছাঁটাই করে বসানো হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে। অর্থাৎ, কমিটির সমীকরণ দাঁড়াল পরিষ্কার ২:১। শাসক দলের নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা। বিরোধী দলনেতার অভিমত আলঙ্কারিক হয়ে গেল। ধরুন, ইস্ট বেঙ্গল বা মোহন বাগানের খেলা হচ্ছে। আর রেফারি কে হবেন, সেটা আইএফএ বা ফেডারেশন ঠিক করছে না। করছে দু’দলের কোনো একটি। তাহলে ফল কী হবে সেটা কি আর বলতে হবে? সন্দেহ তাই বাড়ছে।
২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারায় আবার বলা হয়েছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনারদের সরকারি দায়িত্ব পালনকালে কোনো কাজ বা সিদ্ধান্তের জন্য আদালতে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যাবে না। এমনকি তাঁদের অবসরের পরেও। এত ‘ইমিউনিটি’ কেন দেওয়া হয়েছিল? যদি সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ সংবিধানসম্মত, স্বচ্ছ ও জাতীয় স্বার্থে হয়ে থাকে, তবে আইন-আদালতের এত ভয় কেন? সন্দেহ তাই বাড়ছে।
১৯৮৮ সালের কেরল ক্যাডারের আইএএস জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন কমিশনার হন ১৪ মার্চ, ২০২৪। সেই সময় তৎকালীন বিরোধী দলনেতা অধীর চৌধুরীর অভিযোগ ছিল, মধ্যরাতে মিটিংয়ের কিছুক্ষণ আগে কয়েকজন আমলার নাম দেওয়া হয়েছিল। সেই নাম যাচাই করার পর্যাপ্ত সময়ও দেওয়া হয়নি। এক বছর পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশানর পদে উন্নীত হন। তাঁর মেয়াদ ২০২৯ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। তাঁর নাম ঠিক করেছিল মোদি-শাহ ও রাহুল গান্ধীর প্যানেল। বৈঠক হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। রাহুলের ডিসেন্ট নোটের যথারীতি কোনো মূল্যই ছিল না। তিনি বলছিলেন, ২০২৩ সালের আইনের যৌক্তিকতা সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। মামলার শুনানিও রয়েছে। তাই কয়েকদিন অপেক্ষা করা হোক। তবুও তড়িঘড়ি জ্ঞানেশ কুমারের নাম চূড়ান্ত হয়ে যায়। তাই সন্দেহ বাড়ছে। এই মামলাটি চলছে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার বেঞ্চে। বিচারপতি শর্মার পুত্র সিদ্ধার্থ আবার মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে নির্বাচন কমিশনের প্যানেল আইনজীবী। মূল আবেদনকারী নমন শ্রেষ্ঠার অভিযোগ, এই মামলার শুনানির সময় বিচারপতি শর্মা ওই বিষয়টি একবারও উল্লেখ করেনি। শ্রেষ্ঠা জানান, ২৩ সেপ্টেম্বর দুই বিচারপতির দ্বিখণ্ডিত রায়ের পরই বিষয়টি তাঁর গোচরে আসে। জ্ঞানেশ কুমারের মেয়ে মেধা রূপম নয়ডার জেলাশাসক। সম্প্রতি এক বাঙালি ছাত্রীকে বেআইনিভাবে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক করায় মেধাকে পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যান মেধা। হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দেয় শীর্ষ আদালত। বিচারপতির নাম সতীশচন্দ্র শর্মা। সন্দেহ তাই বাড়ছে।
এখানেই নজরে এসেছে জ্ঞানেশ কুমারের অতীতের দিকে। ২০০৬ সালে জ্ঞানেশ কুমার ছিলেন কেরালার পূর্তদপ্তরের সচিব। সে সময় বিশ্বব্যাংকের টাকায় একটি রাস্তা তৈরির কাজ চলছিল। বরাত পেয়েছিল একটি মালয়েশীয় সংস্থা। প্রকল্পের প্রধান প্রযুক্তিবিদ লি সি বেন চরম মানসিক ও প্রশাসনিক হেনস্তার শিকার হয়ে দেশে ফিরে যান এবং আত্মহত্যা করেন। তাঁর সুইসাইড নোটে তৎকালীন পূর্তসচিব জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেলের উল্লেখ ছিল। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তৎকালীন বাম সরকারের ভিজিলেন্স তদন্ত মাঝপথেই থেমে যায়। এবং জ্ঞানেশ কুমার কেন্দ্রীয় ডেপুটেশনে চলে আসেন দিল্লি। এই আমলা ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ। দু’টি উদাহরণই এটা বোঝাতে যথেষ্ট। মোদি সরকার ২০১৯ সালের আগস্টে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ করে। সেই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জম্মু ও কাশ্মীর বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ছিলেন জ্ঞানেশ কুমার। ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর অযোধ্যা জমি বিরোধ মামলার ঐতিহাসিক রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সেই রায় বাস্তবায়নের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক একটি বিশেষ ‘অযোধ্যা ডেস্ক’ গঠন করে। সেই ডেস্কের দায়িত্বে কে? জ্ঞানেশ কুমার। এসব দেখেই সন্দেহ বাড়ছে।
এবার চোখ ফেরান সাম্প্রতিক ঘটনাবলির দিকে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়া একটি শোরগোল ফেলা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন, জ্ঞানেশ কুমারের একতরফা নীতির বিরোধিতায় অপর দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার আপত্তি তুলেছিলেন। এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হল, নতুন নাম তোলার ফর্মে (ফর্ম-৬) কিছু শর্ত আরোপ। দ্বিতীয়ত, ইআরও-দের ক্ষমতা খর্ব হওয়ায় কমিশনের বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থাটি কেন্দ্রীকরণে পালটে গিয়েছে। কেন্দ্রীভূত সফটওয়্যারের মাধ্যমে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে চলে এসেছে কমিশনের আইটি বিভাগে। কোনো ভোটারের নাম সহজেই বাদ দিতে পারছেন ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খান্না। এবং সবচেয়ে গুরুত্বুপূর্ণ যে আপত্তি সেটি হল, দেশজুড়ে শুরু হওয়া এসআইআর নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। এ প্রসঙ্গেই উঠে আসে অঞ্জলি ভরদ্বাজ নামে এক সমাজকর্মীর আরটিআই। তিনি একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছিলেন। বলেছিলেন, এই এসআইআর চালুর সিদ্ধান্ত কে বা কারা কীভাবে নিয়েছিল? কমিশন জানায় আবেদনকারী যে নথিপত্র চেয়েছেন, তা কমিশনের কাছে নেই। সোজা কথায়, কোটি কোটি ভোটারের ভাগ্য নির্ধারণকারী একটি প্রক্রিয়া চালু হয়ে গেল। অথচ কে অনুমোদন দিল, সে সংক্রান্ত কোনো ফাইল কমিশনের কাছে নেই। থাকবে কী করে? দুই কমিশনার তো আগেই অভিযোগ করেছেন, মাসের পর মাস কমিশনের কোনো বৈঠকই হয়নি। বৈঠক ডাকলে সান্ধু এবং যোশি তাঁদের লিখিত আপত্তি এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ‘অভ্যন্তরীণ অডিট’-এর দাবি তুলতেন। ফলে এই একতরফা ড্রাইভটি আটকে যেত। এই কারণেই কোনো আনুষ্ঠানিক ফাইল বা নথি না বানিয়ে সম্পূর্ণ অস্বচ্ছভাবে, আইটি সেলের নেপথ্য সহায়তায় এই এসআইআর প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল। কমিশনের তথ্যই বলছে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। এত বড়ো একটা ঘটনা ঘটল। এত ভোটারের নাম বাদ গেল, অথচ কেউ কিছু জানে না। তাহলে সিদ্ধান্ত কে নিল? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক নাকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর? ফলে সন্দেহ বাড়ছে?
সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কমিশন যদি সরকারি ফাইল ছাড়াই সরাসরি কেন্দ্রের নির্দেশ বাস্তবায়িত করে তবে তার সাংবিধানিক সার্বভৌমত্ব বলে কিছু থাকে না। সরকারের সঙ্গে কমিশনের এই নেক্সাসের সন্দেহ জোরালো কেন হচ্ছে? বিরোধী ও ককরোচরা জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে আন্দোলন করছে। অথচ সরকার এমন ভাব দেখাচ্ছে, যেন এটা সরকার বদলের জন্য আন্দোলন। আন্দোলন রুখতে আগাম ধরপাকড় হল। সরকার নিজেই অঘোষিত বন্ধ ডেকে দিল। রেল-সড়ক বন্ধ করে দিল। যাকে আরশোলারা বলছে, অঘোষিত ‘জরুরি অবস্থা’। প্রশ্ন হল, জ্ঞানেশ কি সরকারের অংশ?
স্বশাসিত কমিশনের শীর্ষে বসে থাকা কোনো ব্যক্তি নিঃশব্দে একপেশে চিত্রনাট্য লিখলে সন্দেহ তো বাড়বেই। কমিশন গণতন্ত্রের রক্ষক। কিন্তু সন্দেহ তাকে নিয়েই। এই সন্দেহ দূর করার দায়িত্ব কমিশনেরই। অথচ একের পর এক স্পষ্ট অসঙ্গতি ও আপত্তির পাহাড় সত্ত্বেও কমিশন আইনি ও প্রশাসনিক দায়মুক্তির আড়ালে আশ্রয় নিচ্ছে। সিজারের নীতির সঙ্গে এই বৈপরীত্যই সন্দেহের মূল কারণ।