


ভগবানকে ভক্তি দিয়ে বশ করা যায়। যেভাবে চুম্বক লোহাকে টানে, ঠিক সেভাবে ভক্তির টানে তিনি ভক্তের পিছু পিছু যান, ভক্তের আজ্ঞাধীন হন। এ শুধু কথার কথা নয়, জ্বলন্ত প্রমাণ রয়েছে শ্রীবৃন্দাবনে। সেখানে বিরাজ করছেন ভক্তপ্রাণ ঠাকুর বাঁকেবিহারী। কষ্টিপাথরের বিগ্রহ। নয়নাভিরাম। জাগ্রত। ভক্তের অপলক প্রেমময় দৃষ্টির সামনে তিনি স্থির থাকতে পারেন না, গর্ভমন্দির ছেড়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন! এটি গুজব নয়। কল্পকাহিনি নয়। ব্রজভূমির সকলেই জানেন, একবার জনৈকা ভক্তিমতী সাধিকা প্রেমপূর্ণ নয়নে একদৃষ্টে বাঁকেবিহারীজিকে দেখছিলেন। সেইসময় ভক্তের চুম্বক-দৃষ্টির আকর্ষণে বিহারীজির বিগ্রহ মন্দিরের বাইরে চলে আসতে শুরু করেছিল! আবার ভগবানের আকর্ষণও কম নয়। বাঁকেবিহারীর অদ্ভুত মোহিনীশক্তির প্রমাণ খাতায়-কলমে পেতে চাইলে ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ’ কিংবা ‘কথামৃত’ তো আছেই। শ্রীরামকৃষ্ণের বৃন্দাবনে বাঁকেবিহারী দর্শনকালে অদ্ভুত ভাবাবেশ হয়। তিনি আত্মহারা হয়ে বিগ্রহকে আলিঙ্গন করবার জন্য ছুটে যান। ‘বঙ্কুবিহারীকে দেখে ভাব হয়েছিল, আমি তাঁকে ধরতে গিছিলাম।’ (কথামৃত) এমনই তাঁর ভুবনভোলানো রূপ!
বাঁকেবিহারী মন্দিরে বহুকাল ধরে চলে আসছে ‘ঝাঁকি দর্শন’ প্রথা। অর্থাৎ ভক্তদের দর্শন চলাকালীন কিছুক্ষণ অন্তর গর্ভগৃহের দরজার পর্দা টানা হয়, পরক্ষণেই সরিয়ে দেওয়া হয়। ভক্তের ভগবানদর্শনের সময় কয়েক মুহূর্তের ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হল, যাতে ভক্তের নয়নানন্দের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে ব্রজবাসীর আদরের নন্দলালা মন্দির ছেড়ে না যান।
এই প্রেমপিয়াসী ঠাকুরের প্রতিষ্ঠাতা সঙ্গীতসাধক প্রেমিক-ভক্ত হরিদাস স্বামী। কথিত আছে, তিনি পূর্বজন্মে ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের অষ্টসখীর অন্যতম ললিতা। হরিদাস স্বামী ১৪৭৮ খ্রিস্টাব্দে আলিগড়ের রাজপুর (অধুনা হরিদাসপুর) গ্রামে রাধাষ্টমীর দিন জন্মগ্রহণ করেন। সম্ভবত ১৫০৩ খ্রিস্টাব্দে পঁচিশ বছর বয়সে।
বিপত্নীক বৈরাগী হরিদাস বৃন্দাবনে আসেন এবং নিধুবনে অবস্থান করে সাধন-ভজনে মগ্ন হন। নিধুবন বৃন্দাবনের শ্রেষ্ঠ বনগুলির অন্যতম। ব্রজবাসীদের বিশ্বাস আজও প্রতিরাত্রে শ্যামসুন্দর রাধারানির সঙ্গে নিধুবনে অপ্রাকৃত রাসবিহার করেন। তাই সন্ধের পর এই বনে কেউ থাকতে পারে না। এমনকী বনচর বাঁদররা পর্যন্ত সূর্যাস্তের পর বন ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
পরমবৈষ্ণব হরিদাসজি রাধারানির ‘সখী’ ভাবে সাধন করতেন। ভাবচক্ষে রাধামাধবের দিব্য লীলাবিলাস দর্শন করে সেই বিষয়ক সঙ্গীত রচনা করতেন এবং ইষ্টদেবতাকে সে গীত গেয়ে শোনাতেন। এটিই ছিল তাঁর সাধনপন্থা। আর এভাবেই রচিত হয় অপূর্ব ভক্তিভাবসমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘কেলিমাল’। তাঁর প্রবর্তিত সম্প্রদায় ‘সখী সম্প্রদায়’ নামে পরিচিত। তাঁর ছাত্র ছিলেন বিশ্ববিশ্রুত তানসেন। জনশ্রুতি, স্বয়ং আকবর তানসেনের সঙ্গে বৃন্দাবনে গিয়ে হরিদাস স্বামীর সঙ্গীত শুনে মুগ্ধ হয়ে তানসেনকে বলেন, ‘তোমার গান তো এত মিষ্টি হয় না।’ তানসেন হেসে সম্রাটকে উত্তর দেন, ‘আমি দিল্লীর ঈশ্বরকে গান শোনাই, আর স্বামীজি অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডের ঈশ্বরকে গান শোনান।’
হরিদাস স্বামী নিধুবনে বাঁকেবিহারীজিকে কীভাবে পেয়েছিলেন সে কাহিনি প্রাণে চমক জাগায়। হরিদাসজির প্রথম শিষ্য বিঠল বিপুলের অন্তরে প্রবল বাসনা ছিল নওলকিশোর ও রাইকিশোরীর সাক্ষাৎ দর্শনলাভ করবেন। একদিন এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
১৫১৫ খ্রিস্টাব্দের অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথি, সেদিন ছিল বিঠল বিপুলের জন্মদিন। হরিদাসজি তাঁর শিষ্যকে ডেকে বললেন, ‘এই শুভ দিনে তোমার শুদ্ধ মনোবাসনা পূর্ণ হতে চলেছে! আজই ব্রজবিহারীজি ও রাধারানি তোমাকে দর্শন দেবেন! এসো, এই নিধুবনের নিভৃতে আমরা তাঁকে ব্যাকুল হয়ে ডাকি।’
এই বলে তিনি শিষ্যকে নিধুবনের উত্তর-পূর্ব কোণের একটি স্থানে নিয়ে গেলেন। তারপর ভাববিহ্বল কণ্ঠে রাধামাধবের লীলাকীর্তন করতে লাগলেন। যিনি জগৎ সংসারকে আকর্ষণ করেন, সেই সর্বাকর্ষক শ্রীকৃষ্ণ হরিদাসজির অভূতপূর্ব সঙ্গীতের আকর্ষণ এড়াতে পারলেন না। অকস্মাৎ যেন কালো মেঘের বুকে বিদ্যুৎ ঝলকে উঠল। শ্রীগোবিন্দ তাঁর হ্লাদিনীশক্তি রাধার সঙ্গে তাঁদের সামনে আবির্ভূত হলেন। যুগলমূর্তির অধরে মধুর হাসি, পরস্পর নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ। তাঁরা হরিদাসজিকে বললেন, ‘আমরা এই যুগলরূপে এখানে থেকে তোমার সেবা গ্রহণ করব।’
হরিদাসজি আনন্দে শিহরিত। তিনি বললেন, ‘কিন্তু এ যুগলরূপ তো নিকুঞ্জবিহারী বিগ্রহ। নিকুঞ্জের বাইরে এই রূপের সেবা আমি কী করে করব? আমার প্রার্থনা, তোমরা দুজনে এক দেহ ধরে চিরকাল এখানে লোককল্যাণের জন্য বিরাজ কর।’
তাঁর ঐকান্তিক প্রার্থনায় যুগল মূর্তি এক ও অভিন্ন রূপ ধারণ করলেন। যেখানে রাধাগোবিন্দের যুগল মূর্তি প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানেই মাটির ভেতর থেকে পাওয়া গেল বর্তমান বাঁকেবিহারীর বিগ্রহ। এই বিগ্রহ রাধাকৃষ্ণের মিলিত রূপ। শ্রীরামকৃষ্ণের মহাসমাধির পর শ্রীশ্রীমা বৃন্দাবনে এসে বাঁকেবিহারীর রূপ দেখে তাঁর কাছে প্রার্থনা করেন, ‘তোমার রূপটি বাঁকা, মনটি সোজা। আমার মনের বাঁকটি সোজা করে দাও।’
সত্যি, বড় বাঁক আছে এই বিগ্রহে—প্রেমের তিনটি বাঁক; প্রেমে-ভক্তিতে তিনি ত্রিভঙ্গ হয়েছেন। তাঁর চোখের চাহনিও বাম দিকে বাঁকা, সর্বক্ষণ রাধারানিকে দেখবার আশায়। যে তিথিতে বাঁকেবিহারীজি নিধুবনে প্রকাশিত হয়েছিলেন সে তিথি ব্রজে ‘বিহার পঞ্চমী’ নামে খ্যাত। হরিদাসজির সময়ে বাঁকেবিহারী নিধুবনেই সেবিত হতেন। পরে নিধুবনের বাইরে তাঁর মন্দির তৈরির পর সেই মন্দিরে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয়। বাঁকেবিহারী বিগ্রহের আরও একটি বিশেষত্ব হল, তাঁকে বৃন্দাবনের অন্যান্য প্রাচীন বিগ্রহর মতো বিধর্মীদের আক্রমণে ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কায় বৃন্দাবন থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়নি।
বাঁকেবিহারীজির নিত্যসেবা বড়ই মনোমুগ্ধকর, ব্যতিক্রমীও বটে। এই মন্দিরে ভোরে মঙ্গলারতির নিয়ম নেই। কথিত আছে, বাঁকেবিহারী এবং রাধারানি প্রতিদিন মধ্যরাত্রে মন্দির থেকে বেরিয়ে নিধুবনে রাসবিহারে যান। আবার রাসকেলির সমাপ্তিতে শেষ প্রহরে মন্দিরে ফিরে আসেন। সেজন্য হরিদাস স্বামী এই নিয়ম চালু করেন যে, ভোরবেলায় মঙ্গলারতির নামে বিহারীজি ও রাধারানির ঘুম ভাঙিয়ে তাঁদের কষ্ট দেওয়া যাবে না। এই মন্দিরে দিনের প্রথম আরতি হয় সকাল আটটা নাগাদ। তাঁর শৃঙ্গারেও আছে অভিনবত্ব।
যেহেতু ইনি রাধাকৃষ্ণ মিলিত তনু, তাই বিহারীজিকে পায়জামা, ঘাগরা, চোলি, জামা ও অলঙ্কার পরানো হয়। বিগ্রহের হাতে বংশী নেই। একমাত্র আশ্বিনের কোজাগরী পূর্ণিমার দিন তিনি বংশীধারী হন। দিনে দু’বার তাঁর আতরসেবা করা হয়। বিহারীজিকে শুধুমাত্র দেশি ঘিয়ের তৈরি জিনিসই নিবেদন করা হয়। তাঁর ভোগে লাল রঙের সব্জি নিষিদ্ধ। ‘গো’ শব্দ আছে বলে গোবি বা কপিও তাঁকে দেওয়া হয় না। কুলের বীজ ফেলে তার মধ্যে খোয়া ভরে খেতে দিলে তিনি খুশি হন। তাঁর নিত্যভোগে ভাত, রুটি, ডাল, তিন-চার রকমের পুরি, কড়ি, মিষ্টি প্রভৃতি থাকে।
তবে প্রতিদিন দইবড়া না হলে তাঁর একেবারেই চলে না। কথিত আছে, দইবড়া খাওয়ার জন্য তিনি এক দোকানদারের কাছে গিয়ে তাঁর হাতের বালা বন্ধক রেখেছিলেন। মুখশুদ্ধি হিসেবে তাঁকে নিবেদন করা হয় কেশর, খয়ের দেওয়া পান। রাত্রে শয়নের সময় তাঁর সমস্ত সাজপোশাক খুলিয়ে শুধু কৌপীন পরানো হয়। তার পরে চলে আতর মালিশ। বিহারীজির চরণের কাছে মুকুটশোভিত একটি গোমুখী আকৃতির শিলা রয়েছে। সেটি আসলে রাধাযন্ত্র। বিহারীজিকে শয়ন দেওয়ার পরে এই শিলা তাঁর বুকের ওপর রেখে দেওয়া হয়।
অক্ষয় তৃতীয়ার দিন এই মন্দিরে অক্ষয় প্রাপ্তি ঘটে। অক্ষয়-তৃতীয়ায় বৃন্দাবনের অন্যান্য মন্দিরের দেববিগ্রহের সর্বাঙ্গ যখন শ্বেতচন্দনের প্রলেপে ঢেকে দেওয়া হয়, তখন এই মন্দিরে আলাদা চিত্র দেখা যায়। একমাত্র সেদিনই বিহারীজির শ্রীচরণ এবং অনাবৃত অঙ্গের দর্শনলাভ হয়। বছরের অন্যান্য দিনে তাঁর চরণযুগল কোঁচা দিয়ে তা ঢেকে রাখা হলেও অক্ষয় তৃতীয়ার সকালে ভক্তেরা তাঁর অপরূপ শ্রীচরণযুগল দর্শন করে ভগবানের পাদপদ্মে অক্ষয় শুদ্ধভক্তিলাভের অধিকারী হন। আবার সন্ধেয় বিগ্রহের সমস্ত বেশ ছাড়িয়ে শুধু কোমরে একটি ধুতি জড়ানো থাকে। এই দর্শনকে সর্বাঙ্গ দর্শন বলে। সেই উপলক্ষ্যে মন্দিরে শয়ে শয়ে ভক্তের সমাগম হয়।