


সংবাদদাতা, পতিরাম: মফস্সলের নাটক কলকাতায় কল্কে পায় না— একসময়ে এটাই ছিল দস্তুর। মাত্র একজনের ক্ষেত্রেই এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়েছিল। তিনি হরিমাধব মুখোপ্যাধ্যায়। বস্তুত তাঁরই কৃতিত্বে কলকাতা থেকে প্রায় সাড়ে চারশো কিলোমিটার দূরের বালুরঘাট ঠাঁই করে নিয়েছিল বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের মানচিত্রে। সোমবার রাত সাড়ে ন’টায় কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়াত হন সেই হরিমাধব মুখোপাধ্যায়। রাতেই খবরটা ছড়িয়ে পড়েছিল ঝড়ের বেগে— ‘মাধবদা আর নেই’। পশ্চিমবঙ্গের নাট্যপ্রেমীদের কাছে এই নামেই পরিচিত ছিলেন তিনি। গভীর রাতেও সোশ্যাল মিডিয়া উপচে পড়ে একের পর এক শোকবার্তায়। প্রবীণ এই নাট্য ব্যক্তিত্বের প্রয়াণে শোক জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বালুরঘাটের এমপি সুকান্ত মজুমদার, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অন্য রাজনীতিকরা।
২০১৭ সালে রাজবংশী ভাষায় ‘রক্তকরবী’ নাটকে শেষবার অভিনয় করেছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে ‘বন্দুক’নাটকের পর ইতি টেনেছিলেন নির্দেশনাতেও। তাঁকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে মঙ্গলবার সকাল থেকেই ত্রিতীর্থ নাট্যসংস্থায় ভিড় বাড়তে শুরু করে। মঙ্গলবার দুপুরে কলকাতা থেকে বালুরঘাটে তাঁর বাড়িতে আনা হয় হরিমাধববাবুর দেহ। সেখান থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বালুরঘাট কলেজে। এরপর এক সুদীর্ঘ শোকমিছিল করে তাঁর মরদেহ আনা হয় ‘বালুরঘাট ত্রিতীর্থ’-এর মহলাঘরে। চোখে জল নিয়ে শেষ যাত্রায় পা মেলান একঝাঁক বিশিষ্ট নাট্যকার, নাট্যপ্রেমী থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিরা। এদিন ত্রিতীর্থে তাঁকে শেষশ্রদ্ধা জানান জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণা সহ অতিরিক্ত জেলাশাসক ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলেন জেলাপরিষদের সহকারী সভাধিপতি অম্বরীশ সরকার, পুরসভার চেয়ারম্যান অশোক মিত্র, বালুরঘাট পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি অরূপ সরকার সহ পুরসভার কাউন্সিলাররা। বিশিষ্ট নাট্যকার অর্পিতা ঘোষ বলেন, মাধবদার নাটক দীর্ঘদিন আগেই দেখেছিলাম। যদি পরজন্ম থাকে, তাহলে তিনি ফের বালুরঘাটেই জন্মাবেন। এই শহরের বিশিষ্ট নাট্যকার প্রদ্যোষ মিত্রের কথায়,বালুরঘাটের নাটক পরিচিতি পেয়েছিল হরিমাধব মুখোপাধ্যায়ের জন্য।
ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে নাটকের জগতে এসেছিলেন। ১৯৫৪ সালে কয়েকজন মিলে ‘তরুণ তীর্থ’ নামে দল তৈরি করেন হরিমাধববাবু। ১৯৬৯ সালে বালুরঘাটে হরিমাধববাবু ও অন্যদের চেষ্টায় জন্ম হয় ত্রিতীর্থের। এরপর ত্রিতীর্থের প্রয়োজনায় নিজের লেখা একের পর এক নাটক পরিচালনা করে বাংলা তো বটেই, রাজ্যের বাইরেও সুনাম অর্জন করেন হরিমাধববাবু। তাঁর লেখা ও নির্দেশনায় ‘জল’, ‘দেবাংশী’, ‘অসমাপিকা’, ‘কনন’, ‘বিছন’, ‘গ্যালিলিও’ সহ বহু নাটক জনপ্রিয়তা লাভ করে। পেয়েছেন অজস্র পুরস্কার ও সম্মান। -নিজস্ব চিত্র