


প্রীতেশ বসু, কলকাতা: ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল থেকে শুরু করে হাওড়া স্টেশন— সব জায়গা মুড়ে গিয়েছে বরফের চাদরে! আবার আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিশেষ বিমানে যাত্রা করছেন আপনি নিজে! এমনই সমস্ত অবিশ্বাস্য ছবি তৈরি হয়ে যাচ্ছে চোখের পলকে। নিমেষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে সমাজ মাধ্যমেও। এর সম্পূর্ণ কৃতিত্বই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই)। তবে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম-এক্সের গণ্ডি পেরিয়ে তা এবার সাধারণের কর্মজীবনেও জোর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। কর্মক্ষেত্রে সহজেই কষে ফেলা যচ্ছে জটিল হিসাব। চোখের পলকের মধ্যে তৈরি হয়ে যাচ্ছে প্রেজেন্টেশন থেকে অ্যানিমেশন ভিডিও। ফলে এই সমস্ত কাজের সঙ্গে জড়িত দক্ষ কর্মীদের আর প্রয়োজন পড়ছে না। এই পরিস্থিতিতে সবথেকে হাড়হিম করা পরিসংখ্যান পেশ করেছে দেশের শীর্ষ নীতি নির্ধারক সংস্থা, নীতি আয়োগ। তাদের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, ‘এআই’-এর ধাক্কায় ভারতে প্রতিদিন কাজ হারিয়েছেন গড়ে ৫০০ জন। আর অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে ২০৩১ সালের মধ্যে কাজ খোয়াতে পারেন তথ্য-প্রযুক্তি ও বিভিন্ন পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার ১৫ লক্ষ কর্মী। নীতি আয়োগের জানুয়ারি মাসের নিউজলেটার ছাড়াও এব্যাপারে অশনিসংকেত মিলেছে ‘রোডম্যাপ ফর জব ক্রিয়েশন ইন দি এআই ইকোনমি’ নামাঙ্কিত রিপোর্টে।
‘এআই’-এর কারণে দেশে বেকারত্বের জ্বালা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা এড়িয়ে যেতে পারেননি স্বয়ং নীতি আয়োগের সিইও বি ভি আর সুব্রহ্মণ্যম। এই সংক্রান্ত রিপোর্টের মুখবন্ধে তিনি সাফ লিখেছেন, ‘এআই যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে, তখন ভারত একটি সংকটজনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা হয় এই ঢেউয়ে জোর ধাক্কা খাব, নয়তো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নেতৃত্ব দেব।’
আগামী দিনে এভাবে চাকরি হারানো এড়াতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরতদের জন্য ‘এআই স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিন’ গড়ে তোলা, স্কুল ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষাক্রমে ‘এআই’ অন্তর্ভুক্ত করার মতো একগুচ্ছ পরামর্শও দেওয়া হয়েছে নীতি আয়োগের তরফে। এতেই মোদি সরকারের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে প্রবল সমালোচনা। তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, মুখে ডিজিটাল ইন্ডিয়া নিয়ে বড়ো বড়ো কথা বলা সত্ত্বেও চাকরি যাওয়া আটকাতে আগে ভাগে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি কেন? সঠিক সময় সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে, ‘এআই’-এর ট্রেনিং দিতে পারলে বহু মানুষের চাকরি বাঁচানো যেত। তৃণমূলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী সাফ বলছেন, ‘পুঁজিবাদী কর্পোরেটকে লাগাম ছাড়া লাভের লাইসেন্স দিতেই এব্যাপারে উদাসীন মনোভাব বজায় রেখেছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। শিক্ষিত যুব সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।’
নীতি আয়োগের রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চাকরি গিয়েছে ৭৮ হাজারের বেশি আইটি কর্মীর। ভারতের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে প্রযুক্তি পরিষেবা সেক্টরের। এই ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত দেশের মোট কর্মশক্তির ১৩ শতাংশ এবং ‘হোয়াইট কলার ট্যালেন্টের’ ৩০ শতাংশই এআই ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। একটি বিশেষজ্ঞ সংস্থার তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়েছে, দেশের ২৫ শতাংশ চাকরির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এআই প্রযুক্তি।
তবে নতুন প্রজন্মের জন্য সুখবরও রয়েছে নীতি আয়োগের এই রিপোর্টে। এআই প্রযুক্তিতে দক্ষদের জন্য বেশ কয়েক লক্ষ কর্মসংস্থান সৃস্টি হবে। তবে বর্তমানে লক্ষাধিকের চাকরি যাওয়ায় দেশের বেকারত্বের গ্রাফ আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সম্ভাবনা এড়াতে পারছেন না প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরাও।