


ইন্দ্রজিৎ রায়, বোলপুর: সতীপীঠ কঙ্কালীতলায় মা-কে উৎসর্গ করেই রথযাত্রা হয়। তবে এই রথে মা কঙ্কালীর ছবির পাশাপাশি, জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের মূর্তিও রাখা হয়। তাঁদের একসঙ্গে বসিয়ে রথ পরিক্রমা করে। এই রথ ঠিক কত বছরের পুরনো সেবিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। এখানে জাঁকজমকপূর্ণভাবেই রথ ও উল্টোরথ আয়োজন করা হয়। এই রথ ঘিরে রয়েছে নানান ইতিহাস। ঐতিহ্য মেনে কঙ্কালীতলা মন্দির ট্রাস্ট, কঙ্কালীতলা পঞ্চায়েত ও গ্রামবাসীরা যৌথ উদ্যোগে রথযাত্রার আয়োজন করেন। যা দেখতে আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা ভিড় করেন। ছোট আকারে মেলাও বসে। তাই রথযাত্রা উপলক্ষ্যে কঙ্কালীতলায় পুণ্যার্থী ও ভক্তরা উন্মাদনার মেতেছেন।
সতীপীঠ কঙ্কালীতলার রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বীরভূমের বিভিন্ন লোকসংস্কৃতিও চোখে পড়ে। এই রথ উপলক্ষ্যে মন্দির চত্বরজুড়ে অন্যরকম আবহ তৈরি হয়। সকালে ধর্মীয় আচারে পুজোপাঠের পর যজ্ঞ আয়োজন করা হয় বলে জানিয়েছেন মন্দিরের অন্যতম সেবায়ত জয়ন্ত চৌধুরী। তিনি বলেন, আগে বাঁশের তৈরি রথ ছিল। ২০০৬ সালে সেটি কাঠ ও লোহার কাঠামো দিয়ে নির্মাণ করা হয়। রথযাত্রার পর সেটিকে কান্তিশ্বর শিব মন্দিরের উল্টোদিকে রাখা হয়। রথের ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কথিত আছে একবার রথের দিনই আমাদের বংশের এক সেবাইত রামদাস চৌধুরীর মেয়ের মৃত্যু হয়। তাই শোকের আবহে রথযাত্রা স্থগিত রাখা হয়। কিন্তু রথ নিজেই বেরিয়ে গোটা এলাকা পরিক্রমা করে। এই অলৌকিক ঘটনার পর থেকে অত্যন্ত ভক্তির সঙ্গে ফি বছর রথযাত্রা করা হয়। রথের দিন বিকেলের দিকে শুরু হয় রথ টানার অনুষ্ঠান। রথ ও উল্টোরথ ঘিরে রয়েছে নানা আচার-অনুষ্ঠান। গ্রামের পুরোহিত ও সেবাইতরা মায়ের রথ বেরনোর আগে নানা মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পুজো করেন। মা কঙ্কালীর বিকল্প বিগ্রহটি রথে স্থাপন করে তাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় শোভাযাত্রা। হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় রথ ঘোরানো হয়। সেই রথের দড়ি টানার জন্য গ্রামবাসীদের মধ্যে কার্যত হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। এমনকী, সেই রথযাত্রার উন্মাদনায় শামিল হতে কঙ্কালীতলা পার্শ্ববর্তী রাউতারা, গোপালপুর, আদিত্যপুর, খোসকদমপুর, দোনাইপুর, বোলপুর, সিহালায়, গোয়ালপাড়া প্রভৃতি এলাকার মানুষজনও যোগদান করেন। এই রথযাত্রাক ঘিরে শুধু ধর্মীয় উন্মাদনা নয়, বরং জেগে ওঠে বীরভূমের লোকসংস্কৃতির প্রাণবন্ত রূপ। রথের দিন মন্দির চত্বরে বসে লোকশিল্পীদের পালা, বাউল গান, ঝুমুর নৃত্য।
বহুক্ষেত্রে দেখা যায়, এলাকার বৃদ্ধরা পূর্বপুরুষদের রথস্মৃতি স্মরণ করে নতুন প্রজন্মকে সেই কাহিনী শোনান। মন্দির প্রাঙ্গণে বসে মেলা। সেখানে স্থানীয় হস্তশিল্প, জিলিপি, পাঁপড় সহ গ্রামীণ খাদ্যসামগ্রীর স্টলও বসে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণে কঙ্কালীতলার রথ উৎসব এক সামাজিক মিলনের মেলায় পরিণত হয়। ধর্ম, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে কঙ্কালীতলার রথযাত্রা এক ব্যতিক্রমী মাত্রা পায়। -নিজস্ব চিত্র