


জলপ্লাবনে সর্বত্র প্লাবিত হলে যেমন কূপ প্রভৃতি ক্ষুদ্র জলাশয়ের স্নান পানাদি রূপ সমস্ত প্রয়োজন প্লাবনের প্রভূত জলরাশিতে সিদ্ধ হয় সেরূপ অন্ধ পুরুষের ব্রহ্মানন্দরূপ যে আনন্দ, যে ফল লাভ হয় তাহাতে বেদোক্ত সকল কাম্য কর্মের ফলও আনন্দ অনুভূত হয়। (হে অর্জুন) কর্মে কেবলমাত্র তোমার অধিকার। ফলে নহে। ফলের প্রতি যেন তোমার আসক্তি বা তৃষ্ণা না জন্মায়। কর্মফলের কারণ হয়ো না, অর্থাৎ কর্মফলের আকাঙ্ক্ষী হয়ো না। কিন্তু তাই বলে যেন কর্মত্যাগী হয়ো না। অর্থাৎ কর্ম করবে নিষ্কামভাবে। কোনো কামনাবাসনা না রেখে। হে ধনঞ্জয়, (অর্জুনের আর-এক নাম, যার অর্থ যিনি ধন ও সম্পদকে জয় করেছেন। যোগস্থ হয়ে অর্থাৎ ঈশ্বর অনুরাগী হয়ে কর্ম করো। আসক্তি ত্যাগ করে কর্ম করো। সফলতা ও বিফলতাতে সম মনোভাব রেখে কাজ করো। কেননা, ফলাফলে চিত্তের নির্বিকারত্বই হলো ‘যোগ’। হে ধনঞ্জয়, কামনাযুক্ত কর্ম নিষ্কাম কর্ম অপেক্ষা নিকৃষ্ট, অতএব তুমি কামনাশূন্য হও। সমত্ব (ফলাফলে নির্বিকার) বুদ্ধির আশ্রয় গ্রহণ করো। যারা ফলাকাঙ্ক্ষী তারা হীনবুদ্ধি। নিষ্কাম কর্মযোগী ইহলোকে পাপ-পূণ্য উভয়কেই পরিত্যাগ করে। সেইহেতু নিষ্কাম কর্মযোগ অনুষ্ঠান করো। কর্মের এই কৌশলকেই ‘যোগ’ বলে।
নিষ্কাম কর্মযোগী মনীষীগণ কর্মজাত ফল ত্যাগ করে জন্মমৃত্যুর বন্ধনমুক্ত হন এবং সর্বপ্রকার উপদ্রবরহিত ব্রহ্মপদ লাভ করেন। যখন তোমার বুদ্ধি মোহাত্মক, অবিবেচক রূপ মলিনতা অতিক্রম করবে তখনই তোমার শ্রুত ও শ্রোতব্য কর্মফল বিষয়ে বৈরাগ্য ও বিতৃষ্ণা লাভ হবে। নানা কর্মফলের শ্রবণে ও প্রলোভনে বিক্ষিপ্ত তোমার মন যখন পরমাত্মাতে স্থির ও অচঞ্চল হবে তখন তুমি তত্ত্বজ্ঞান লাভে সমর্থ হবে।
মুমূর্ষ হতচেতন রোগীকে যেমন অভিজ্ঞ ডাক্তার ধীরে ধীরে চেতনে আনেন। বিপথগামী শিষ্যকে যেমন জ্ঞানবান গুরু শনৈ শনৈ উপদেশ দিয়ে পথে ফেরান, তাড়াহুড়ো করেন না, চটজলদি কোনো নিদানের কথা ভাবেন না, দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য সাময়িক শ্রমকে বরণ করেন, ধৈর্যকে ধারণ করেন, শ্রীকৃষ্ণ তেমনি করে লক্ষ্য করছিলেন অর্জুনের সমস্ত চিত্তচাঞ্চল্য। হৃদ্স্পন্দন। শারীরিক বিভঙ্গ। লক্ষ্য করছিলেন তাঁর বাচন ক্রিয়ায় অর্জুনের প্রতিক্রিয়া। তাঁর জ্ঞানগর্ভ বাণীতে অর্জুনের মনের অভ্যন্তরে জারণ ক্রিয়া।
পার্থসারথি গায়েন-এর ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও দিব্যজীবন’ থেকে