


ঢাকা: বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বর্ষপূর্তিতে বুধবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান গোপালগঞ্জে পদযাত্রা ও সভা করতে গিয়ে প্রবল বিক্ষোভ-প্রতিরোধের মুখে পড়লেন ছাত্র নেতারা। তাঁদের কর্মসূচি ঘিরে কার্যত রণক্ষেত্র হয়ে উঠল গোপালগঞ্জ। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দফায় দফায় পুলিস ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াল আওয়ামি লিগ ও তার সংগঠনের কর্মী-সমর্থকরা। সেনার গুলিতে রাত পর্যন্ত চারজনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। যদিও আওয়ামি লিগের দাবি, মৃতের সংখ্যা আরও বেশি। আহতের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ। মৃতদের মধ্যে স্থানীয় ছাত্রলিগ নেতা দীপ্ত সাহাও রয়েছেন। সকাল থেকে বিভিন্ন উস্কানিমূলক কথা বললেও শেষ পর্যন্ত সেনার সাঁজোয়া গাড়িতে গোপালগঞ্জ ছেড়ে ‘পালিয়ে’ যেতে বাধ্য হন সারজিস আলম, নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহের মতো এনসিপি নেতারা। সন্ধ্যা থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত গোপালগঞ্জে কার্ফু জারি করেছে প্রশাসন। এদিনের ঘটনার জন্য পুলিসের নিষ্ক্রিয়তাকেই দায়ী করেছেন ছাত্র নেতারা। পাল্টা আওয়ামি লিগের অভিযোগ, সেনা এদিন অতিসক্রিয় হয়ে গুলি চালিয়েছে। ১৬ জুলাইকে ‘গোপালগঞ্জ গণহত্যা দিবস’ আখ্যা দিয়েছে তারা। রাতের দিকে শেখ হাসিনা এক বিবৃতিতে জানান, বঙ্গবন্ধুর ধানমান্ডির বাসভবন ভাঙার কায়দায় শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিও ভাঙার ছক কষেছিল এনসিপি। যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাত্র নেতাদের পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছে, নিষিদ্ধ ছাত্রলিগ ও আওয়ামি লিগ কর্মীদের জঘন্য কর্মকাণ্ড বিনা বিচারে ছেড়ে দেওয়া হবে না।
জুলাইয়ের শুরু থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে পদযাত্রার আয়োজন করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অন্য জায়গায় সাধারণ পদযাত্রা হলেও গোপালগঞ্জ জেলার ক্ষেত্রে কর্মসূচির নাম দেওয়া হয় ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লেও এখনও ওই জেলা আওয়ামি লিগের শক্ত ঘাঁটি। তাই সেখানে পদযাত্রাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন এনসিপি নেতারা। কয়েকদিন ধরেই সারা দেশের মানুষকে গোপালগঞ্জে আসার আহ্বান জানাচ্ছিলেন তাঁরা। যদিও পদযাত্রার আড়ালে এনসিপি ও জামাত শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর সমাধি ভাঙচুর করতে পারে বলে জল্পনা ছড়াচ্ছিল। পাল্টা আওয়ামি লিগের নেতা-কর্মীরাও জানিয়ে দেন, প্রাণ দিয়ে হলেও তাঁরা মুজিবুরের সমাধি রক্ষা করবেন। বুধবার বেলা এগারোটায় এনসিপির কর্মসূচির কথা থাকলেও সকাল থেকেই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। গাছের গুঁড়ি ফেলে রাস্তা বন্ধ করে দেন গোপালগঞ্জের বাসিন্দারা। উলপুর গ্রামে পুলিসের গাড়িতে ভাঙচুর করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। তারপর পৌরপার্কে এনসিপির সভাস্থলেও ভাঙচুর চলে। নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে পুলিস, সেনা ও র্যাবের বিরাট বাহিনীর নিরাপত্তায় সেখানে পৌঁছান সারজিস, হাসনাত, নাহিদ সহ এনসিপি নেতারা। যদিও সভায় সাধারণ মানুষ কেউ ছিলেন না।
সভার শেষে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। পার্ক থেকে কোনওমতে এনসিপি নেতাদের গাড়িতে তুলে দেয় পুলিস। সভাস্থলে আগুন লাগিয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা। দফায় দফায় বিক্ষোভ দেখানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিস। ওই নেতাদের শহরের বাইরে বের করার চেষ্টা করা হলেও ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে গাড়ি ফিরিয়ে এনে পুলিশ সুপারের দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর রাস্তায় নামে বাংলাদেশি সেনা। বিক্ষোভকারীদের সরাতে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে তারা। সেই সময় বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ আওয়ামি লিগের। ঘণ্টাখানেক পরে সেনার দুটি সাঁজোয়া গাড়িতে চেপে গোপালগঞ্জ ছেড়ে যান এনসিপি নেতারা। প্রথমে ঘটনার প্রতিবাদে সারা দেশে ‘ব্লকেড’ কর্মসূচির ডাক দেয় এনসিপি। পরে দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে সেই কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়।