


পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট ২৯ এপ্রিল। তার চারদিন আগে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে গিয়ে দেশের অন্যতম সেরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যাদবপুরের গায়ে কার্যত ‘দেশবিরোধী’ তকমা লাগিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি! গত বারো বছর ধরে তিনি যে সরকারের প্রধানমন্ত্রী, তার শিক্ষামন্ত্রকই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্যতম সেরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে যাদবপুর রয়েছে প্রথম দশে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং-২৬’-এর ৬৭৬ তম স্থান দখল করেছে যাদবপুর। মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের আগে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করা চন্দ্রযান তৈরির নেপথ্যে ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ জন গবেষক। এই সাফল্যকে নিজের বিজ্ঞাপনী প্রচারে ব্যবহার করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এও মনে রাখা ভালো, দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রক, ইসরো কিংবা ডিআরডিও-এর অনেক গোপন ও উচ্চপর্যায়ের গবেষণা হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়েই। দেশের এই গর্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভোট প্রচারের মঞ্চ থেকে নিন্দনীয় ভাষায় আক্রমণ করলেন যিনি, তিনি ‘এন্টায়ার পলিটিক্যাল সায়েন্স’ নামক এমন এক বিষয়ের স্নাতক, যা দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় তা অনেকেই জানেন না।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে দেশবিরোধী স্লোগান লেখা হচ্ছে। ছাত্ররা পড়াশোনা না করে রাস্তায় নামছে। ক্যাম্পাসে মেকি সংস্কৃতি চালু হয়েছে। পড়াশোনার বদলে অরাজকতা চলছে। একথা ঠিক যে, অভ্যন্তরীণ নানা জটিলতা, সমস্যা ও বিতর্ককে কেন্দ্র করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বহু সময় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। কিন্তু হাজার হাজার কৃতী ও সফল ছাত্রছাত্রীর আঁতুড়ঘর যাদবপুরে পড়াশোনার বদলে অরাজকতা চলে, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে কার্যত দেশবিরোধিতার চাষ হয়— প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে রীতিমতো অপমানিত পড়ুয়া ও শিক্ষকমহল। তাঁরা তো বটেই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এর বিরুদ্ধে সঙ্গত কারণেই ফুঁসে উঠেছেন। একটা ‘সেন্টার ফর এক্সেলেন্স’-কে অপমান করতে প্রধানমন্ত্রী কেন এতটা নীচে নামলেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। যাদবপুরের শিক্ষক সমিতি জুটা-ও মোদির বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছে, প্রধানমন্ত্রী অহেতুক বিতর্ক না বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের দিকে নজর দিন। কেউ কেউ বলেছেন, যাদবপুরে অনেক প্রান্তিক, দুঃস্থ মেধাবী ছেলেমেয়ে পড়তে আসেন। তাঁদের আক্রমণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। অনেকের মতে, শিক্ষায় বেসরকারিকরণের যে নীতি নিয়ে এগচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার, তাতে নজর পড়েছে যাদবপুরের উপর। অনেকের মতে আবার, বিজেপি নেতা হিসাবে একথা বলেছেন মোদি। তাই এর থেকে ভালো আর কী আশা করা যায়?
আসলে যাদবপুর বরাবরই বিজেপির কাছে এক ভিন্ন গ্রহের প্রতিষ্ঠান। এখানে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ঠাঁই হয়নি কোনোদিন। দশকের পর দশক ধরে যাদবপুর বাম ও অতি বাম ছাত্রদের চারণক্ষেত্র। যা বিজেপির না-পসন্দ। ইতিহাস বলছে, বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপি বারবার এখানে ঢুকতে গিয়ে প্রবল বাধার মুখে পড়েছে। কখনো গেরুয়াপন্থী সিনেমা দেখানোকে কেন্দ্র করে বিরোধ বেধেছে। কখনো রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। এনআরসি-র বিরোধিতা হোক বা ২০২১-এর বিধানসভা ভোট—যাদবপুরের পড়ুয়াদের ‘নো ভোট টু বিজেপি’ স্লোগান দিয়ে রাস্তায় নামতে দেখা গিয়েছে। মোদি সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী (এখন তৃণমূলে) বাবুল সুপ্রিয়কে ঘেরাও করে হেনস্তা করার অভিযোগ— তাতেও সেই যাদবপুরের পড়ুয়ারা। সাম্প্রতিক অতীতে ক্যাম্পাসের মধ্যে ‘আজাদ কাশ্মীর’-এর দেওয়াল লেখা নিয়ে পদ্মশিবির ও অতিবাম শিবিরের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। বিভিন্ন মাওবাদী নেতার নামে দেওয়াল লেখাকে কেন্দ্র করেও একই পরিস্থিতি হয়। অনেকের মতে, প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত এইসব তথ্যের উপর ভিত্তি করেই যাদবপুরকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। কিন্তু ঘটনা হল, যাদবপুরের ছাত্র-রাজনীতিতে রাজ্যের শাসকদলের ছাত্র সংগঠনও এখনও বিশেষ দাগ কাটতে পারেনি। সদ্য অতীতে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে ছাত্রদের প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীকে। তাই নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা হলেও মুখ্যমন্ত্রী কিংবা রাজ্যের শাসকদল কখনো যাদবপুরকে অরাজক, দেশবিরোধী বলে দেগে দেননি। বরং উচ্চমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য গর্বের কথা শুনিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী দলীয় আদর্শ মেনে সেই কাজটাই করলেন, যা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় বা দিল্লির জামিয়া-মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বলে থাকেন বিজেপি নেতারা। অর্থাৎ মুখ খুললেই ‘দেশদ্রোহী’! প্রধানমন্ত্রীর এই দোষারোপে যাদবপুরের চরিত্র বদলাবে, সেই আশা কম। গোটা বিশ্বে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ছড়িয়ে রয়েছে সেই সেন্টার ফর এক্সেলেন্সের পড়ুয়াদের নিয়ে মন্তব্য করার আগে প্রধানমন্ত্রী একবারও ভাবলেন না যে আর যাই হোক ওরা ছাত্র। ঠিক হোক বা ভুল, ওদের বুদ্ধিমত্তাই প্রশ্ন করতে শেখায়। এবং তারা নিজেদের মেধা ও যোগ্যতায় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়া হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে যে, এক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে পারলেন না!