


কাজলকান্তি কর্মকার, ঘাটাল: প্রশ্নপত্রের উপরে বড় হরফে লেখা ‘পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ’। তার নীচে খানিক ছোট হরফে—দ্বিতীয় পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন-২০২৬। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শতাধিক প্রাথমিক স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ুয়ারা এই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষাও দেয়। পরে প্রকাশ্যে আসে, ‘প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ’ লেখা থাকলেও শিক্ষাদপ্তর এমন কোনো প্রশ্নপত্র স্কুলে স্কুলে সরবরাহ করেইনি। বিষয়টি নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হতেই উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য! পর্ষদের নাম ভাঁড়িয়ে প্রশ্নপত্রটি আসলে ছাপিয়েছে আরএসএস-এর শিক্ষকদের একটি সংগঠন। শুধু ছাপিয়েই থেমে থাকেনি। ওই সব স্কুলে সেগুলি বিক্রিও করা হয়েছে বলে অভিযোগ। কিছু স্কুল নিতে অস্বীকার করলে সংঘ-সংগঠন জোর খাটায় বলেও অভিযোগ। বিষয়টি জানার পরই তদন্ত শুরু করেছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্ষদ। প্রাথমিক শিক্ষাদপ্তরকে এভাবে অন্ধকারে রেখে পর্ষদের নামে প্রশ্নপত্র বিক্রিকে ভালোভাবে দেখছে না শিক্ষামহল। শিক্ষাক্ষেত্রে সংঘের এমন অনভিপ্রেত প্রভাব খাটানো নিয়েও সরব সংশ্লিষ্ট সকলেই। আরএসএসের শিক্ষক সংগঠনের জেলা নেতা অঞ্জন দণ্ডপাঠ বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলে মন্তব্য করব।’
ঘটনার গুরুত্ব বুঝে নড়েচড়ে বসেছে জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্ষদ। ৪ আগস্ট সচিবের স্বাক্ষরিত এক নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, জেলার কয়েকটি সার্কলের অধীন বহু স্কুলে দ্বিতীয় সামষ্টিক মূল্যায়নের এমন প্রশ্নপত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যার শীর্ষে ‘পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ’-এর নাম মুদ্রিত। স্কুলগুলি এইসব প্রশ্নপত্র কোথা থেকে সংগ্রহ করেছে, তার রিপোর্ট দপ্তরের কাছে পেশ করুক। প্রশ্নপত্র পাওয়ার নেপথ্য ঘটনার বিবরণ লিখিত আকারে জমার নির্দেশও দিয়েছেন সচিব।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রাথমিকে পরীক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষাদপ্তর থেকে কোনো প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে দেওয়া হয় না। উল্লেখযোগ্য হারে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় স্কুলগুলির পক্ষেও নিজেদের খরচে বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন ছাপানো যথেষ্ট ব্যয়বহুল। সুযোগ বুঝে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রশ্ন তৈরি করে। সেগুলি স্কুল কর্তৃপক্ষ ফটোকপির খরচের চেয়েও কম দামে কিনে নেয়। ওইসব প্রশ্নপত্রে প্রকাশক সংস্থার নাম থাকে না। কেবল কোন পর্যায়ের পরীক্ষা, শ্রেণি, পূর্ণমান এবং সময় উল্লেখ থাকে।
পালাবদলের পর আরএসএসের শিক্ষক সংগঠন গা-জোয়ারি করে প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে স্কুলে স্কুলে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ। শিক্ষাদপ্তরকে এড়িয়েই সেখানে ‘অনৈতিকভাবে’ নাম ব্যবহার করা হয়েছে ‘পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ’-এর। অথচ, সেই প্রশ্নেই পরীক্ষা চলছে। দাসপুর থানার নাড়াজোল-২ চক্রের অভিরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তথা এবিপিটিএ’র জোনাল সম্পাদক শঙ্খশুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আরএসএস শিক্ষাক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে শুরু করেছে। তাদের প্রশ্নপত্র জেলার বহু স্কুল কার্যত বাধ্য হয়ে এবং ভয়ে কিনেছে। আশ্চর্যের বিষয়, ওরা শিক্ষা পর্ষদের নাম ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র ছাপিয়েছে। যা আইনত অপরাধ।’