


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, মাস্টারদা সূর্য সেন কিংবা ক্ষুদিরাম বসু-দেশলাই বাক্সে জ্বলজ্বল করছে ভারতের বীর সন্তান-স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি। পাশাপাশি ব্রিটিশ যুগ থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত বদলাতে থাকা ভারতের পতাকার ছবিও আছে। ভারতীয় সেনা থেকে যুদ্ধাস্ত্র ইত্যাদির ছবিও রয়েছে। এমন ছবি দেওয়া প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি দেশলাই বাক্স নিয়ে চমকপ্রদ সংগ্রহ গড়েছেন বাঘাযতীনের সৃজন দে সরকার। যাদবপুর থেকে বাংলায় পিএইচডি করে বর্তমানে এশিয়াটিক সোসাইটিতে ভার্নাকুলার সোসাইটি (বঙ্গ ভাষানুবাদক সমাজ) নিয়ে গবেষণা করছেন।
কলকাতার বাসিন্দা সৃজনবাবু খুঁজে পেয়েছেন ভারতের প্রাণ বাঁচিয়ে রাখার এক অনন্য উপায়— দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দেশাত্মবোধ, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ম্যাচবক্সের মাধ্যমে সংরক্ষণ করছেন। স্কুলজীবনে একদিন হঠাৎ চার্লি চ্যাপলিনের ছবি যুক্ত বিরল এক ম্যাচবক্স হাতে পাওয়া থেকে শুরু হয় এই অসাধারণ যাত্রা। ক্ষুদ্র অথচ শক্তিশালী এই দেশলাই বাক্সগুলি হয়ে উঠেছে ভারতের অতীতের কাহিনির বাহক। তাঁর বাবা গোপী দে সরকার দেশলাই বাক্স জমাতেন। তাঁর কথায়, কবে কিভাবে এই শখ জন্ম নিয়েছিল বলতে পারব না। কিন্তু আমার কাছে পৃথিবীর সবথেকে ছোট দেশলাই বাক্স থেকে শুরু করে সব থেকে বড় দেশলাই বাক্স পর্যন্ত রয়েছে। বাবার সেই শখ এগিয়ে নিয়ে চলেছেন ছেলে সৃজন। তাঁর অনুপ্রেরণায় গড়ে তুলেছেন দশ হাজারেরও বেশি ম্যাচবক্সের এক চমকপ্রদ সংগ্রহ। এর মধ্যে তিন হাজারেরও বেশি ‘দুষ্প্রাপ্য রত্ন’ সম দেশলাই বাক্স রয়েছে, যা ভারতের স্বাধীনতার আগে থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নানা ইতিহাস বর্ণনা করছে। বাবা-ছেলের এই অদ্ভুত শখ এখন রূপ নিয়েছে দেশের ঐতিহ্যকে সম্মান জানানোর এক মিশনে।
বীর বিপ্লবী থেকে শুরু করে ভারতীয় সেনা, নানা দ্রষ্টব্য দেশলাই বাক্সজুড়ে রয়েছে। সৃজনের কথায়, ম্যাচবক্স একসময় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতিকৃতি, ঐক্যের প্রতীক, এবং আত্মনির্ভরতার বার্তা বহন করত। আজ এগুলিতেই গর্বের সঙ্গে দেখা যায় ভারতীয় সেনা, নৌবাহিনী, বায়ুসেনা, এমনকি রাফাল জেটের মতো আধুনিক নিদর্শন। সৃজন এবং তাঁর বাবার কালেকশনে রয়েছে অপারেশন সিন্দুরের মতো সামরিক অভিযানের ছবি দেওয়া দেশলাই বাক্স। গোপীবাবু বলেন, ‘প্রতিটি বাক্সই সাহস, ত্যাগ আর জাতীয় গৌরবের গল্প বলে।’ দেশলাই বাক্সের এই বিবর্তন এবং সংস্কৃতিগত ঐতিহ্য রক্ষায় জাদুঘর তৈরির স্বপ্ন দেখেন সৃজন। তাঁর কাছে এই ম্যাচবক্সগুলি ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষুদ্র ক্যানভাস, যেখানে একসঙ্গে মিশেছে শিল্প, ইতিহাস ও দেশপ্রেম। তাঁর স্বপ্ন, কলকাতায় একটি দেশলাই বাক্সের জাদুঘর গড়ে তোলা। যেখানে দর্শকরা দেখতে পাবেন স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে আধুনিক গণতন্ত্রে ভারতের পথচলা।
সৃজন বলেন, ভারতীয় জাদুঘরে ম্যাচবক্সের জন্য একটি ছোট্ট কক্ষ আছে। কিন্তু আমাদের ইতিহাসে দেশলাই বাক্স এর চেয়েও অনেক বড় স্থান পাওয়ার দাবিদার। এই জাদুঘরের মাধ্যমে আমি চাই প্রত্যেক দর্শক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, অনুভব করুক সেই গর্ব, সেই ঐক্য, সেই অদম্য স্পিরিট, যা আমাদের দেশকে গড়ে তুলেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ত্যাগ থেকে শুরু করে আধুনিক ভারতের এগিয়ে চলার প্রতিটি অধ্যায় ধরা রয়েছে দেশলাই বাক্সগুলিতে। প্রতিটি লেবেলে, প্রতিটি স্ফুলিঙ্গে, সৃজন ধরে রাখছেন স্বাধীনতার আগুন—যে আগুন কখনওই নিভে যাবে না।
সৃজনের সংগ্রহ।- নিজস্ব চিত্র