


বিশেষ নিবন্ধ, সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: নেপাল। হিমালয়ের কোলের আপাত দৃষ্টিতে ‘শান্ত’ দেশটির রাজনীতিতে গত কয়েক দশক ধরে ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছিল একটা একঘেয়ে স্থবিরতা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের রক্তক্ষয়ী ‘জেন জি’ সেই স্থবিরতার পানা পুকুরে যেন ছুড়তে থাকে ‘প্রতিবাদ’, ‘বিদ্রোহ’ নামের একের পর এক সুবিশাল পাথর। আর সেই আন্দোলনের গর্ভ থেকেই জন্ম হয় গাঢ় নীল চশমা পরা এক তরুণের। যাঁর ঝুলিতে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিগ্রি, গলায় হিপ-হপ মিউজিকের সুর আর হাতে মাইক্রোফোন। নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বালেন্দ্র শাহের অভিষেক পর্বকে আর পাঁচটা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে এক করে দেখলে ভুল হবে। এটা আসলে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন ‘পপুলিস্ট’ যুগের সূচনা-পর্ব।
বালেন্দ্র শাহের এই জয়ের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর সুবিশাল ‘ফ্যান বেস’। যাঁরা একসময় ‘র্যাপার’ বালেনের প্রেমে পাগল ছিলেন, তাঁরাই এখন বদলে গিয়েছেন রাজনৈতিক ভোটব্যাংকে। অবশ্য তা এমনি এমনি হয়নি। বর্তমান সময়ে নেপালের প্রায় ৫২ শতাংশ ভোটারের বয়স ৩০ বছরের কম। এই ‘জেন-জি’ ভোটাররা বয়স্ক নেতাদের একঘেয়ে রাজনৈতিক কচকচানি আর ভাঙা রেকর্ডের মতো প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এমন একটা দমবন্ধকর সময়ে প্রথাগত রাজনীতির বাইরে থাকা একজন শিল্পী যখন তাঁর র্যাপ গানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন, তখন তা যে যুব সমাজের কাছে রাজনৈতিক ইস্তাহারের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠবে, তা বলাই বাহুল্য। আর সেই কারণে সুদান গুরুং বা বালেন শাহের মতো তরুণদের সংসদে পাঠাতে এই জেন-জি ফ্যাক্টরই অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে। কারণ এই নব প্রজন্মের ভোটাররা কোনো তাত্ত্বিক গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নন। তাঁরা চান ‘ইনস্ট্যান্ট অ্যাকশন’ ও ‘ডিজিটাল ট্রান্সপারেন্সি’। কাঠমান্ডুর মেয়র হিসাবে বালেন্দ্রর জবরদখল উচ্ছেদ অভিযান বা ‘বুলডোজার পলিটিক্স’ একদিকে যেমন প্রশংসিত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে বিতর্কও কম হয়নি। কিন্তু এই বিতর্কই তাঁকে জেন-জি’দের কাছে এক ‘অ্যাকশন হিরো’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁদের কাছে বালেন শুধুমাত্র একজন নেতা নন, তিনি এক মসিহা—যিনি ফেসবুক লাইভ আর টিকটকে এসে সরাসরি আমলাতন্ত্রের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন। এই ইমেজই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে দেশের ক্ষমতার শীর্ষপদে।
ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো যতটা সহজ, সিংহাসন টিকিয়ে রাখা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। সেই সার সত্য ধীরে ধীরে বুঝবেন (বা বুঝতে শুরু করেছেন) বালেন্দ্র। আর এবারে শুরু হবে তাঁর আসল লড়াই। বালেন্দ্রর প্রথম লড়াইটি তাঁর নিজের ইমেজের সঙ্গে। নেপালের মানুষ তাঁকে একজন ‘ত্রাতা’ বা ‘সুপারহিরো’ হিসাবে দেখে এসেছে। কিন্তু গণতন্ত্রে কোনো ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই শেষ কথা। বালেন যদি নিজেকে ‘অল-পাওয়ারফুল সেভিয়ার’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তবে তা হবে গণতন্ত্রের জন্য আত্মঘাতী। তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি শুধু একজন র্যাপার বা মেয়র নন, একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কও বটে। তার জন্য যেমন দল ও ব্যক্তিসত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, তেমনই নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থেকে গোটা নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে। খাপ খাইয়ে নিতে হবে দলের সাংগঠনিক কাঠামো, শৃঙ্খলা এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও।
আর এখানেই গাঢ় হচ্ছে দুশ্চিন্তার ছায়া। কারণ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বালেনের প্রথম ১০০ দফা পরিকল্পনার মধ্যে সবথেকে বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি হল—শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ছাত্র রাজনীতি’ নিষিদ্ধ করা। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি রাজনৈতিক দলগুলোর ‘লাঠিয়াল বাহিনী’র আখড়া হতে পারে না। তার বদলে পড়ুয়াদের জন্য দলীয় ছাত্র সংগঠনগুলির জায়গায় ক্যাম্পাসে থাকবে ‘স্টুডেন্ট কাউন্সিল’ বা ‘ভয়েস অফ স্টুডেন্টস’ নামে নতুন ব্যবস্থা। এখানেই শেষ নয়। কোনো শিক্ষক, অধ্যাপক, সরকারি কর্মী বা দেশসেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরাও কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না। আগামীতে নেপালের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতেও আর কোনো রাজনৈতিক দলের শ্রমিক সংগঠন থাকবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বালেন্দ্রের সরকার। পাশাপাশি অক্সফোর্ড, পেন্টাগন বা সেন্ট জোসেফস বা সেন্ট জেভিয়ার্সের মতো বিদেশি নাম মুছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে দেশীয় নাম নেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। অনেকে তাঁর এই পদক্ষেপে ‘বালেন-মার্কা’ জাতীয়তাবাদী সত্তাকে দেখতে পেয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যে জেন-জি আন্দোলন তাঁকে ক্ষমতায় আনল, সেই তরুণদের রাজনৈতিক কণ্ঠরোধ করা নৈতিকভাবে সঠিক কি না।
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বালেন এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও চর্চা চলছে। তিনি নেপালের পরিবেশ রক্ষায় কঠোর আইন এনেছেন। হিমালয়ের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রে পর্যটন নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি করেছেন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, তাঁর এই ‘বুলডোজার স্টাইল’ অনেক সময় আইনি প্রক্রিয়াকে তোয়াক্কা করে না। কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালীন ‘বুলডোজার পলিটিক্স’ বা জবরদখল উচ্ছেদ অভিযান বালেন্দ্রকে বিপুল জনপ্রিয়তা দিয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পদে বসার পর নদী তীরের সুকুনবাসী (বস্তি) উচ্ছেদ বা ফুটপাত হকারদের উপর তাঁর অনমনীয় মনোভাব একই থাকলে বিপদ বাড়বে বই কমবে না। কারণ আইনি প্রক্রিয়ার বদলে গায়ের জোর খাটিয়ে বা সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়ালকে বেশি গুরুত্ব দিলে তা ভবিষ্যতে বড়ো আইনি জটিলতার জন্ম দিতে পারে। বস্তি উচ্ছেদ বা ছোটো ব্যবসায়ীদের উপর তাঁর কঠোর মনোভাবের ফলে ইতিমধ্যে জেন-জি’র একটি অংশ বালেনের উপর অসন্তুষ্ট হতে শুরু করেছে। সমর্থকরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে—পরিবর্তন মানে কি শুধুই চুনকাম করা ঝকঝকে রাস্তা, নাকি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার রক্ষা করা? বালেন্দ্রকে ভুললে চলবে না যে, তিনি সংবিধানের পথ ধরেই ক্ষমতায় এসেছেন। কিন্তু তিনি যদি অনেক পপুলিস্ট নেতার মতো আবেগের জোয়ারে ভেসে সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কথা ভাবেন, তাহলে তাঁর পতনও হবে উল্কার মতো দ্রুত। ভুললে চলবে না, নেপালে অর্ধেকেরও বেশি ভোটার বয়সে তরুণ। এই বিশাল যুবসমাজ যেমন তাঁকে মাথায় তুলে রেখেছে, প্রত্যাশা পূরণ না হলে তাঁকে ছুড়ে ফেলতেও দ্বিধা করবে না।
চ্যালেঞ্জ আরও আছে। আর তা হল নেপালের ইতিহাস। গত কয়েক দশক ধরেই হিমালয়ের কোলের এই রাষ্ট্র রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯০ সাল থেকে নেপালে ৩২ বার সরকার পরিবর্তন হয়েছে। পাশাপাশি, কমিউনিস্ট পার্টি বা নেপালি কংগ্রেসের মতো দলগুলির পুরানো নেতারা দল ভাঙিয়ে সরকারের পতন ঘটাতে যথেষ্ট পটু। তার প্রমাণ অতীতে একাধিকবার মিলেছে। বালেন্দ্র অবশ্য এই ‘রাজনৈতিক’ লড়াই লড়ছেন তাঁর ‘ডিজিটাল অপারেশন ইউনিট’ দিয়ে। বালেন্দ্রর রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে ৬৬০ জনের এক শক্তিশালী ডিজিটাল টিম। সোশ্যাল মিডিয়ায় ন্যারেটিভ তৈরি করার ক্ষেত্রে বালেন কার্যত অপরাজেয়। এই প্রচারের সামনে বিরোধী দলগুলো কার্যত দিশেহারা। বালেন্দ্র জানেন, ঠিক কোন শব্দে যুবসমাজকে উত্তেজিত করা যায়। তাঁদের মন জয় করা যায়। টিকটক এবং ফেসবুকের মাধ্যমে তিনি যেভাবে যুবসমাজকে সংগঠিত করেছেন, তা নেপালের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। কিন্তু দেশের শাসনভার তো শুধুমাত্র ডিজিটাল ক্যাম্পেইন দিয়ে চালানো সম্ভব নয়। নেপাল আজ বৈদেশিক ঋণের বোঝায় জর্জরিত। পর্যটন শিল্প ধুঁকছে। শিক্ষিত যুবসমাজ দলে দলে দেশ ছাড়ছেন। ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা দিয়ে মানুষের পেট ভরে না। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেকারত্ব দূরীকরণ ও ধুঁকতে থাকা পর্যটন শিল্পকে চাঙ্গা করাই বালেনের আসল ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড’। আর এই লড়াইয়ে তিনি যদি শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার সেনাপতি হয়েই থেকে যান, তাহলে এই জেন-জি’রা বালেনকে সিংহাসন থেকে নামাতে সময় নেবে না।
বালেন্দ্র শাহ আজ নেপালের সেই সব মানুষের কণ্ঠস্বর, যাঁরা স্বপ্ন দেখতে ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি নেপালের সেই সব মানুষের প্রতীক, যাঁরা পুরানো সিস্টেমের উপর বীতশ্রদ্ধ। তিনি যখন সংসদে দাঁড়িয়ে র্যাপের ছন্দে ঐক্যের কথা বলেন, তখন তা এক নতুন আশার জন্ম দেয়।
বালেন সফল হলে দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন রাজনৈতিক মডেল তৈরি হবে—যেখানে তারুণ্যই হবে সবচেয়ে বড়ো শক্তি। আর নেপাল হবে দক্ষিণ এশিয়ার ‘গভর্নেন্স ল্যাবরেটরি’। আর যদি তিনি জনপ্রিয়তার নেশায় সংবিধান ও গণতন্ত্রকে অবজ্ঞা করেন, তবে নেপাল আবার সেই পুরানো অস্থিরতার আবর্তে হারিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে নেপালের একটি গোটা প্রজন্মের স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটবে। বালেন শাহ কি পারবেন সেই ভারসাম্য বজায় রাখতে? নাকি তাঁর নীল চশমার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাবে সাধারণ মানুষের আর্তনাদ? উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর আগামীর পদক্ষেপে। তবে একটা কথা নিশ্চিত—কাঠমান্ডুর রাজপথ থেকে আজ যে পরিবর্তনের আওয়াজ উঠছে, তা হিমালয় ছাড়িয়ে পুরো উপমহাদেশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। জেন জি’র এই আইকন আজ নিজেই এক ইতিহাসের মুখে দাঁড়িয়ে।