


শুভজিৎ অধিকারী: প্রাচীন ভারতের এক রাজকন্যার ছিল বড্ড অহংকার। দেখতে অতীব সুন্দরী। লেখাপড়ায় তুখোড়। অতঃপর, তিনি পণ করে বসলেন, তর্কে তাঁকে যিনি হারাতে পারবেন, তাঁর গলাতেই বিয়ের মালা পরাবেন। মহীয়সী রাজকন্যার পাণি-গ্রহণ কে না চান! প্রতিদিন রাজসভায় অনেক পণ্ডিত, রাজকুমার আসেন। রাজকন্যা তাঁদেরকে সামনে বসিয়ে তর্ক জুড়ে দেন। কিন্তু কেউই আর তর্কে জয়ী হতে পারেন না। বাঘা বাঘা পণ্ডিতরাও হার মেনে নিরাশ হয়ে ফিরে যান। একদিন কয়েকজন পণ্ডিত মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন রাজকন্যার অহংবোধকে দুরমুশ করবেন। ঠিক করলেন, ভারতের সর্বসেরা এক মূর্খের সঙ্গে রাজকন্যার বিয়ে দেবেন। পণ্ডিতগণ বেরিয়ে পড়লেন সেই আকাট মূর্খের খোঁজে। পথে-প্রান্তরে ঢুঁ মারতে মারতে পণ্ডিতদের নজরে পড়ল, একটি যুবক গাছের ডাল কাটছে। কাটতেই পারে। কিন্তু, পণ্ডিতরা আচমকা লক্ষ্য করলেন, যুবকটি যে ডালটিতে বসে রয়েছে, সেটাই কাটছে! পণ্ডিতদের তখন আনন্দ আর ধরে না। চিৎকার করে বলে উঠলেন, পেয়ে গিয়েছি...পেয়ে গিয়েছি। রাজকন্যাকে জব্দ করার এমন বোকা, মূর্খ পাত্র ভূ-ভারতের কোথাও আর মিলবে না! সবিনয়ে যুবককে গাছ থেকে নামিয়ে এনে নিয়ে চললেন রাজ দরবারে। গল্পটার উল্লেখ করা গাছের ডাল কাটার প্রসঙ্গে।
এখন গনগনে গ্রীষ্ম। রাস্তায় বেরোলেই আগুনের হলকা। দহন জ্বালায় পুড়ছে গোটা শরীর। নিস্তার নেই ঘরে, বাইরে কোথাও। গ্রীষ্মের এমন আকষ্মিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে মোটেও ভালো চোখে দেখছেন না আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা। তাঁদের সতর্কবার্তা, সুপার এল নিনো কড়া নাড়ছে বসুন্ধরার দুয়ারে। তার আগমন হেতু ছাব্বিশের গ্রীষ্মে এইসব উপসর্গ। সামনের বছর আরও কিছু ভয়ানক উপসর্গ নিয়ে সে দাপট দেখাবে চৈত্র-বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ মাসে। বৈশ্বিক তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে আগামীর গ্রীষ্মকাল। আর সেটা সত্যি হলে বিশ্বের অঞ্চলভেদে কোথাও প্রবল বৃষ্টিপাত। আবার কোথাও ভয়ঙ্কর খরা সহ একাধিক বিধ্বংসী প্রলয় ঘটাতে পারে সুপার এল নিনো। অথচ, আমরা সকলেই জানি ওই রাজকন্যার বোকা ও মূর্খ পাত্র কালিদাসের গল্প। যদিও তিনি পরবর্তীকালে মহাকবি হন। আজকের গাছ কাটার প্রেক্ষাপটে আমরা কিন্তু বসুন্ধরার ভয়ানক আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছি না। কিংবা শুনেও না শোনার ভান করছি। তা না হলে সুপার এল নিনোর সভ্যতা-সংহারী হুংকার মাথায় নিয়ে মধ্যপ্রদেশের সিঙ্গরৌলিতে বনাঞ্চল ধ্বংস করে বৃহৎ কয়লা খনি প্রকল্প, আরাবল্লী পর্বতমালার ভূ-বৈচিত্র পালটে দেওয়া কিংবা আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের মতো সংবেদনশীল একটা বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করে মেগা উন্নয়ন প্রকল্প গড়ে তোলার সাহস দেখায় কেউ? নিন্দুকেরা বলাবলি করছেন, স্নিগ্ধ সুন্দরী বসুন্ধরার দম্ভকে দুরমুশ করতে তো কালিদাসের মতো লোকদেরকেই প্রয়োজন। অতএব, আমরা সবাই কলিকালের কালিদাস! বিশ্ব উষ্ণায়ন রুখতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় অংশ নিয়ে, প্যারিস চুক্তিকে পালন করার শপথ নিয়েও আমাদের ‘মূর্খ’ কালিদাস থেকে জ্ঞানী কালিদাস হয়ে ওঠা আর হল না!
এবার দেখা যাক, এল নিনো এবং লা নিনো আসলে কী? এটি হল ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সংঘটিত জলবায়ুগত অবস্থার উষ্ণ ও শীতল একটি পর্যায়ের নাম। চক্রাকারে আবর্তিত এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠলে সেটাকে বলা হয় ‘সুপার এল নিনো। এর মূল বৈশিষ্ট্য হল, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমপক্ষে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়া। ১৯৫০ সাল থেকে এটি মাত্র কয়েকবার ঘটেছে। একবারই তাপমাত্রা ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। তবে, এল নিনো সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর ঘটে। এটি নয় থেকে বারো মাস স্থায়ী হতে পারে। আবার সেই স্থায়িত্ব দীর্ঘায়িত হতে পারে কয়েকবছর পর্যন্ত। তখন বছরের পর বছর আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন হতে পারে। শীত-বর্ষা-বসন্ত বলে কোনো ঋতু থাকবে না। স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক অ্যাট আলবানির বায়ুমণ্ডলীয় ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডঃ পল রাউন্ডির আশঙ্কা, গত ১৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ঘটার প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে এবার। মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী বিজ্ঞানী ডঃ অ্যান্ডি হ্যাজেলটন তাঁর একটি গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্ত মডেল পর্যবেক্ষণ করে মনে হচ্ছে, চলতি বছর বিশ্ব জলবায়ুর উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো।’ বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘২০২৪ সালে আমরা যে রেকর্ড পরিমাণ বৈশ্বিক তাপমাত্রা দেখেছি, তাতে শক্তিশালী এল নিনোর ভূমিকা ছিল।’
এসব শুনলে আমরা যতটা কম্পিত, ততটা বিচলিত বা ভাবিত নই। তাই, দীর্ঘবছর ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ব উষ্ণায়নের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে নানা নীতি-নির্ধারণ হলেও সেগুলি কার্যকর করার সদিচ্ছা উন্নত দেশগুলির মধ্যে নেই। প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করেও গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমাতে টেকসই কোনো পরিকল্পনা নেই। উলটে উন্নত নগর সভ্যতার বিকাশে প্রকৃতির উপর নিরন্তর ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে সবাই। মধ্যপ্রদেশের সিঙ্গরৌলি জেলার ধিরাউলির কথাই ধরা যাক। সেখানে কয়লাখনি প্রকল্প গড়তে চলেছে দেশের একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প। বাস্তবায়ন করতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ হেক্টর জমির বনভূমি স্রেফ ধ্বংস করে দিতে হবে। কাটা হবে আনুমানিক ৬ লক্ষ গাছ। প্রকল্পের বিরুদ্ধে পরিবেশ আন্দোলনকারী অজয় দুবে প্রথমে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল (এনজিটি), পরে সুপ্রিম কোর্টে মামলা ঠুকেছিলেন। তাতে লাভের লাভ কিছু হয়নি। ধিরাউলির সবুজ ধ্বংস একপ্রকার নিশ্চিত।
আরাবল্লী পর্বতমালার বাস্তুতন্ত্র রক্ষা বনাম উন্নয়ন দ্বন্দ্ব এখন তুঙ্গে। সেখানকার খনন ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। সম্প্রতি, ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এফএসআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্র সেই বিধিনিষেধকে নতুন আঙ্গিকে নিয়ে আসতে চাইছে। বলা হয়েছে, স্থানীয় ভূমিরূপ থেকে শুধুমাত্র ১০০ মিটার বা তার বেশি উচ্চতার ভূমিকেই আরাবল্লী হিসেবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ, নিচু পাহাড়ি এলাকা, পাদদেশ এবং পাথুরে জমি—যা এ যাবৎকাল আরাবল্লীর অংশ ছিল, সেগুলি আর আইনি সুরক্ষা পাবে না। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে আরাবল্লীর প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকাতেই সভ্যতার বুলডোজার চলবে। একশো কোটি বছরের পুরানো আরাবল্লী শুধুমাত্র পর্বতমালা নয়, এটি প্রকৃতি সৃষ্ট দুর্ভেদ্য দেওয়াল। গুজরাত, রাজস্থান, হরিয়ানা এবং দিল্লিজুড়ে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই পর্বতমালা প্রাক-ক্যামব্রিয়ান যুগে টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষে তৈরি হয়েছিল। আরাবল্লীর সবচেয়ে বড়ো অবদান হল, থর মরুভূমির থেকে উত্তর ভারতের সমতল অংশকে আড়াল করা। কেন্দ্রের ‘আত্মঘাতী’ প্রস্তাব এখন আদালতের বিবেচনাধীন।
এবারে আসা যাক, আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে সভ্যতার মেগা প্রকল্পের কথায়। তার আগে মনে করিয়ে দিই, এই দ্বীপ বিশ্বের অন্যতম জীববৈচিত্র সমৃদ্ধ ও সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। ঘন উষ্ণমণ্ডলীয় অরণ্য, নিকোবরের ‘সিগনেচার’ প্রবালপ্রাচীর, ম্যানগ্রোভ বন, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র এবং প্রাচীন উপজাতি সমাজ—সব মিলিয়ে অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য বহমান সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে। এমন এক বাস্তুতন্ত্র ভেঙে মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের বুলডোজার নামিয়েছে কেন্দ্র। প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে একটি আন্তর্জাতিক কনটেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর, একটি গ্রিনফিল্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, গ্যাস ও সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, কর্পোরেট কালচার নির্ভর নতুন টাউনশিপ ইত্যাদি। সে এক বিশাল রাজসূয় যজ্ঞ! সেই যজ্ঞে আহূতি পড়বে বিশাল বনভূমি। সরকারেরই তথ্য বলছে, ১৬৬ বর্গকিমি জমি প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩১ বর্গকিমি বনাঞ্চল। বিভিন্ন প্রজাতি মিলিয়ে ৯ কোটি ৬৪ লক্ষ গাছ কাটা পড়বে। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে প্রকৃতির ভারসাম্যের উপর। নিকোবরের সমৃদ্ধশালী বায়োডাইভার্সিটির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হবে। কার্বন শোষণ কমে যাবে। তাপমাত্রা বাড়বে হু হু করে। নিকোবরে রয়েছে লেদারব্যাক সামুদ্রিক কচ্ছপের মতো বিপন্ন প্রজাতির প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র। মেগাপড, কাঁকড়া-খেকো বানর, নিকোবর ট্রি শ্রু সহ বহু স্থানীয় প্রাণী এই দ্বীপেই সীমাবদ্ধ। বন্দর নির্মাণ, সমুদ্র খনন, রাতের কৃত্রিম চড়া আলো ও যন্ত্রপাতির কর্কশ আওয়াজ এসব প্রাণীর জীবনচক্রের স্বাভাবিক ছন্দকে বিনষ্ট করবে। বাসা হারাবে কয়েক শো প্রজাতির পাখি।
আমরা আধুনিক সভ্যতার মানুষ। আরও আধুনিক হতে চাই। সেক্ষেত্রে বনাঞ্চল, পশু-পাখির যন্ত্রণা গায়ে মাখলে সভ্যতার চাকা গড়াবে না। অতঃপর, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর ভয়ানক বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা নিয়েও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লেগেছে কেন্দ্র। আজ, ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। সর্বত্র জলদগম্ভীর আলোচনা হবে। সুপার এল নিনোর ভয়াবহতা ও প্রতিকার নিয়ে বিদগ্ধজনেরা নানা কথা বলবেন। নানা পরামর্শ দেবেন। আমরা হয় সরাসরি, না হয় একাধিক জার্নালে তাঁদের কথা শুনব কিংবা পড়ব। তীব্র দহন জ্বালায় পুড়তে পুড়তে বলব, অনেক হয়েছে, আর নয়। এবার অন্তত নিজ নিজ কর্তব্য পালন করতে হবে। অথচ, বাড়ির পাশে মাঠে নাড়া পোড়ালে প্রতিবাদ করি না। দীঘার সৈকতে কংক্রিটের নির্মাণে ঝাউবন সাফ হয়ে গেল! গর্জে উঠতে পারিনি। জঙ্গলে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে কাঠ মাফিয়ারা। জ্বলন্ত বৃক্ষরাশির আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছি না! আসলে উন্নয়নের বহর আমাদের বোবা করে দিচ্ছে ক্রমেই।
কালিদাস গাছের একটি ডালে বসে সেই ডালটাই কেটেছিলেন। আর আমরা আজ সভ্য-শিক্ষিত মানুষ সবাই গাছে চড়ে বিকাশের বুলডোজারকে বলছি, সমূলে গাছটাকে উপড়ে ফেল!