


সমৃদ্ধ দত্ত: বাংলা এবং ভারতে একটি আশ্চর্য রাজনৈতিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিগত ৮০ বছরে মূল স্রোতের জাতীয় দলগুলি ভেঙে বহু নতুন দল তৈরি হয়েছে। অনেকেই সাফল্য পেয়েছে। আবার কেউ ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু বিশেষ করে বহু চড়াই এবং উতরাই পেরিয়ে এতগুলি বছরের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের ইতিহাসে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, একমাত্র কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হওয়া দলগুলি কোনো না কোনো সময় মুখ থুবড়ে পড়ছে সংসদীয় রাজনীতিতে। এমনকি গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। তাদের মধ্যে অনেকের মধ্যেই ভাঙন ধরেছে। দুই ভাগে বিভাজিত হয়ে গিয়েছে। দল অস্তিত্ব সংকটেই পড়েছে। একঝাঁক দলকে আর কেউ মনেই রাখেনি। বহু জনপ্রিয় নেতা কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে এসে নিজেদের নতুন দল গঠন করেছিলেন। কিন্তু অধিকাংশই দলের নামের সঙ্গে কংগ্রেস শব্দটা রেখেছিলেন। কংগ্রেসের ব্র্যান্ডভ্যালুর জন্য। এবং এই বার্তা দিতে যে, তারাই প্রকৃত কংগ্রেস। তাদের আশা ও দাবি ছিল, আমরাই আসল কংগ্রেস। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তারা ২০২৬ সালের ভারতে কোথাও ক্ষমতাসীন নয়। বরং দলের অস্তিত্ব রক্ষা করতেই নাজেহাল। বহু দলের অস্তিত্বই নেই। স্বতন্ত্র পার্টি, কেরল কংগ্রেস, বাংলা কংগ্রেস, উৎকল কংগ্রেস, অরুণাচল কংগ্রেস, তামিল মানিলা কংগ্রেস, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস, ওয়াইএসআর কংগ্রেস ইত্যাদি। শেষতম আঘাত এসেছে তৃণমূল কংগ্রেসের উপর।
অথচ হিন্দুত্ববাদী জনসংঘ নিজেরা বড়োসড়ো সাফল্য না পেলেও সেই নীতি আদর্শেই তৈরি হওয়া ও সেই দলের নেতাদেরই তৈরি করা ভারতীয় জনতা পার্টি স্বমহিমায় ক্রমোত্তরণের পথে অগ্রসর হয়ে গেল। একই কথা প্রযোজ্য কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রে। এই বামপন্থী দল ভেঙে বহুবার নতুন নতুন দলের জন্ম হয়েছে। কিন্তু একটি মূল শাখা চরম দুর্বল হয়ে গেলেও সম্পূর্ণ ধুয়েমুছে সাফ হয়নি এখনও। সেটি হল সিপিএম। এমনকি অন্য বামপন্থীরাও টিকে আছে সীমিত ক্ষমতা নিয়ে। বাংলা, ত্রিপুরায় সিপিএম সংসদীয় সংখ্যায় নগণ্য। কিন্তু কেরলমে এখনও প্রধান বিরোধী দল।
জনতা দলের নীতি ও আদর্শকে সামনে রেখে বহু দলের জন্ম হয়েছে। রাষ্ট্রীয় জনতা দল, সমাজবাদী দল, সংযুক্ত জনতা দল, বিজু জনতা দল। এই প্রতিটি দল কিন্তু বিজেপির সঙ্গে লড়াই করতে না পেরে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত টুকরো টুকরো হয়ে যায়নি। এখনও বিহারে তেজস্বী যাদব কমবেশি তাঁর দল ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। অখিলেশ যাদবের দল যথেষ্ট শক্তিশালী। তাঁর কাকা বিদ্রোহ করে দল ভাঙার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়েছেন। নবীন পট্টনায়ক বয়সোচিত কারণে অত্যন্ত দুর্বল ও দলের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। কিন্তু এখনও অন্তত আস্ত রয়েছে দল।
বিজেপির আগ্রাসী এই তালিকায় বিস্ময়কর ব্যতিক্রম কংগ্রেস থেকে তৈরি হওয়া দলগুলি। অর্থাৎ শারদ পাওয়ারের এনসিপিকে ভেঙে ছত্রভঙ্গ করে দিতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। মহারাষ্ট্রে এখন দুটো এনসিপি। সুতরাং তাদের কারও আর কখনো বিরাট কিছু শক্তিসঞ্চয় সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের এক মাসের মধ্যেই এই দল যে এভাবে ভেঙে যাওয়ার মতো খাদের কিনারায় এসে দাঁড়াবে, এটা কেউ কল্পনাই করেনি। এই বিদ্রোহীদের পিছনে বিজেপির সবরকম সাহায্য ও প্ররোচনা আছে কি না সেটা তর্কের বিষয়। কিন্তু আসল কথা হল, নিজের হাতে গড়া তৃণমূল কংগ্রেসকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অটুট রাখতে সক্ষম হলেন না। যাঁদের তিনি বিশ্বাস করেছিলেন,তাঁদের বড়ো অংশই বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। সবেমাত্র শুরু হয়েছে দুঃসময়। আগামী দিনে আরও কী কী অপেক্ষা করে আছে সেটিও আন্দাজ করা যায় না এই ঝোড়ো বঙ্গ রাজনীতির আবহে।
বঙ্গবাসী প্রথম একটি নতুন দলের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করেছিল ১৯৫১ সালে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কলকাতায় তৈরি করেছিলেন পিপলস পার্টি। যদিও মে মাসে প্রস্তাবিত হওয়া ওই দলের উদ্দেশ্য ছিল রাজ্যস্তরের আঞ্চলিক পার্টি। অন্যান্য রাজ্যেও এরকম রাজ্যস্তরের দল গঠিত হয়। কিন্তু এই দলগুলির প্রতিনিধি নিয়ে সেই বছরের ২১ অক্টোবর দিল্লির রাখো মল আর্য কন্যা উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে তৈরি হয় ভারতীয় জনসংঘ। সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। স্বাভাবিকভাবেই বাংলায় একটি কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির বিকল্প তৈরি হল। সুতরাং এই দলটি হল সর্বভারতীয়। আঞ্চলিক নয়। প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জনসংঘ দেশের মধ্যে তিনটি মাত্র আসনে জয়ী হয়েছিল। তার মধ্যে দুজন পশ্চিমবঙ্গ থেকে। কলকাতা দক্ষিণ পূর্ব কেন্দ্র থেকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং মেদিনীপুর কেন্দ্র থেকে দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজস্থানের কেন্দ্র থেকে উমাশংকর ত্রিবেদী। আর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় জনসংঘ জয়ী হয়েছিল ৯টি আসনে। কিন্তু এই দল চরম দুর্বল হয়ে যায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অকাল মৃত্যু হওয়ায়। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতি বিশেষ করে হিন্দিভাষী ভারতের যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে রয়ে যায়। ১৯৮০ সালে এই দলের নেতারাই তৈরি করলেন নতুন দল, বিজেপি।
১৯৬৪ সালে বঙ্গবাসী দ্বিতীয়বার নতুন একটি দলের সন্ধান পায়। সিপিএম। এই দল কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া ভেঙে দুভাগ হয়ে যাওয়ার জেরে তৈরি হয়। সিপিআই ভেঙে সিপিএম দল তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ হল নীতি, অভিমুখ, আদর্শগত মতানৈক্য। এই মতান্তরের সূত্রপাত আরও আগেই। অন্ধ্রপ্রদেশে নির্বাচনি বিপর্যয়ের পর সিপিআই দলের মধ্যে মতান্তর তৈরি হয়। কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকারের শ্রেণিচরিত্র মূল্যায়ন ও তাদের সম্পর্কে পার্টির মনোভাব কী হবে, এই নিয়েই মতপার্থক্য। পরবর্তীকালে চীন ভারত যুদ্ধ ও তৎপরবর্তী মতানৈক্য বৃদ্ধি পেয়ে চরম তিক্ততা। ১৯৬৪ সালে তেনালি কনভেনশনে স্পষ্ট হয় যে দল ভাঙছে। সেই বছরই নভেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে সিপিএম দল গঠিত হয়।
কংগ্রেসের কামরাজ প্ল্যান ছিল সরকারের মন্ত্রীদের পদত্যাগ করে পাঠানো হবে সংগঠনের কাজে। মূলত সেটি কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য হলেও কিছু রাজ্যেও মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেন। পশ্চিমবঙ্গে এরকমই দুই মন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় ও শংকরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়রা পদত্যাগ করেন মন্ত্রিত্ব থেকে। অজয়বাবু আশা করেছিলেন তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হবে না। অথচ সেটি গ্রহণ করা হল। তিনি কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি হলেন। কিন্তু প্রতি ক্ষেত্রেই বিরোধ সৃষ্টি হল অতুল্য ঘোষের সঙ্গে। ক্ষুব্ধ অজয়বাবু মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের দ্বারস্থ হলেন। কিন্তু কোনো সুরাহা হল না। গেলেন ইন্দিরা গান্ধীর কাছে। সেখানেও লাভ হয়নি। ১৯৬৬ সালে অজয় মুখোপাধ্যায় নতুন দল গঠন করলেন। সেই দলের নাম বাংলা কংগ্রেস। তাঁর সঙ্গে কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের একাংশ দলত্যাগ করেন। ১৯৬৭ সালে মাত্র তিন বছর আগে তৈরি হওয়া সিপিএম এবং এক বছরের দল বাংলা কংগ্রেস একজোট হয়ে বাংলায় প্রথম অকংগ্রেসি সরকার গঠন করল। কিন্তু এই দল দু দফায় যুক্তফ্রন্ট সরকারে শামিল হলেও শেষরক্ষা হয়নি। ১৯৭১ সাল ও ১৯৭২ সালের ভোটে পর্যুদস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলা কংগ্রেস আবার কংগ্রেসেই মিশে গিয়েছিল।
১৯৯৮ সালে ঠিক একই কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে সিংহভাগ নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে নতুন দল তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। অজয় মুখোপাধ্যায় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উভয়েই দাবি করেছিলেন তাঁরাই আসল কংগ্রেস। অজয়বাবুর দাবি সেভাবে সাফল্য পায়নি। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকৃতই আসল কংগ্রেস হয়ে যান। অর্থাৎ তাঁর উত্থানে সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কংগ্রেস। এমনকি শূন্য হয়ে যায়। তৃণমূল তিনবার সরকার গঠন করে।
কিন্তু দেখা গেল ১৯৯৮ সালে তৈরি হওয়া তৃণমূল কংগ্রেস ২০২৬ সালে শুধু যে ভোটে পরাজিত হয়েছে তাই নয়, দলের অস্তিত্ব পর্যন্ত ধরে রাখতে সংকটে পড়ছে। ভবিষ্যতে কী হবে সেটি অনিশ্চিত। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর পর কংগ্রেস নেতারা দল ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন। এবং রাজ্য স্তরে নিজস্ব একটি দল গঠন করেছেন। এই দলগুলি প্রত্যেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত কংগ্রেসকে ক্ষতি করেছে। কারণ কংগ্রেসের ভোটব্যাংকই এইসব দলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
অথচ দেখা যাচ্ছে, সর্বত্রই এই কংগ্রেস থেকে তৈরি হওয়া দলগুলি কোণঠাসা হয়ে গিয়েছে। শারদ পাওয়ারের দল দু টুকরো। তৃণমূল কংগ্রেস এখন দু টুকরো হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশে জগনমোহন রেড্ডি পরাজিত হয়ে বিশেষ শক্তি সঞ্চয় করতে পারছেন না। বরং তাঁর বোন শর্মিলার নেতৃত্বে কংগ্রেস আবার ওই রাজ্যে শক্তি অর্জন করেছে।
পশ্চিমবঙ্গে কি আগামী দিনে নতুন কোনো দলের আবির্ভাব হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে? নাকি সিপিএম ফের শক্তি বাড়িয়ে ফিরবে? দুই শাখার তৃণমূল এবং কংগ্রেসের মধ্যে সম্পর্ক কী হবে? তৃণমূল কংগ্রেস এই দুর্দিনেও ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। বিজেপি বিরোধী এই ভোট কোনদিকে যাবে আগামী ভোটগুলিতে? বাংলার রাজনীতিতে সবথেকে চিত্তাকর্ষক ভূমিকা হতে চলেছে ভোটারদের। এই সম্পূর্ণ ধোঁয়াশামাখা রাজনীতিতে বাঙালি ভোটাররা ভবিষ্যতে কী করবেন?