


মৃণালকান্তি দাস: হলিউডে আলো কখনও নিভে যায় না!ক্যামেরার সামনে তারকারা হাসেন। লাল গালিচায় ঝলসে ওঠে ফ্ল্যাশ। স্টুডিয়োর বিশাল দরজার ওপারে জন্ম নেয় প্রেম, যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র আর মৃত্যুর গল্প। কিন্তু হলিউডের আরও একটি গল্প আছে। সেটি ক্যামেরার সামনে বলা হয় না। যতটা সম্ভব গোপন রাখা হয়। সেই গল্পে নায়করা সবসময় নায়ক নন। প্রযোজক কখনও কখনও প্রযোজক নন। আর কোনো কোনো অভিনেতার অতীতের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে যুদ্ধ, গুপ্ত অভিযান কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার গোপন ফাইল। এই গল্পের একেবারে সাম্প্রতিক চরিত্রদের একজন আরনন মিলচান। আজ তিনি বিলিয়নিয়ার প্রযোজক। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফাইট ক্লাব, প্রিটি ওম্যান, হিট-এর মতো জনপ্রিয় ছবি। হলিউডের ঝলমলে জগতে তাঁর পরিচয় একজন সফল প্রযোজক হিসাবে। কিন্তু একসময় তাঁর আরও একটি পরিচয় ছিল। ইজরায়েলি গুপ্তচর।
২০১৩ সালে ইজরায়েলি টেলিভিশনে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে মিলচান তাঁর অতীতের সেই অন্ধকার অধ্যায়ের বহু গুজবের সত্যতা স্বীকার করেন। জানা যায়, তাঁর কর্মজীবনের এক পর্যায়ে তিনি ইজরায়েলি সরকারের হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় তিরিশটি কোম্পানি পরিচালনা করতেন। ব্যবসার আড়ালে চলত অন্য খেলা।
কিন্তু মিলচান একা ছিলেন না। হলিউডের ইতিহাস একটু গভীরভাবে খুঁড়লে দেখা যায়, এই শহরের ঝলমলে পর্দার পিছনে বহুদিন ধরেই ঘোরাফেরা করেছে গোয়েন্দা সংস্থার ছায়া। প্যারামাউন্টের সেই অদৃশ্য মানুষগুলি কারা?
১৯৫০-এর দশকের গোড়ার কথা।
ঠাণ্ডা যুদ্ধ তখন পৃথিবীকে দুটো শিবিরে ভাগ করে দিয়েছে। একদিকে আমেরিকা, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। যুদ্ধের ময়দান শুধু ইউরোপের সীমান্তে নয়— লড়াই চলছে মানুষের মগজেও। আর সেই যুদ্ধে সিনেমা হয়ে উঠেছে এক শক্তিশালী অস্ত্র। প্যারামাউন্ট স্টুডিয়োর বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ সেন্সরশিপ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন লুইজি লুরাস্কি। বাইরের জগতের কাছে তিনি ছিলেন একজন স্টুডিয়ো কর্তা। কিন্তু তাঁর আরও একটি পরিচয় ছিল। তিনি ছিলেন সিআইএ-র কর্মী। হলিউডের পর্দায় কোন গল্প দেখা যাবে, কোন চরিত্র কীভাবে উপস্থাপিত হবে— এসব বিষয় নিয়ে তাঁর কাজ ছিল নিছক সেন্সরশিপের চেয়ে অনেক গভীর। তাঁর অন্যতম গোপন সাফল্য ছিল আমেরিকান চলচ্চিত্রে সুশ্রী, সুসজ্জিত, সম্ভ্রান্ত কৃষ্ণাঙ্গ চরিত্রের উপস্থিতি বাড়ানো। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—আমেরিকায় জাতিগত সম্পর্ক নিয়ে সোভিয়েত প্রচারের প্রভাবকে দুর্বল করা। অর্থাৎ পর্দায় একটি চরিত্রের পোশাক, আচরণ কিংবা সামাজিক অবস্থানও হয়ে উঠতে পারে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অস্ত্র। দর্শক সিনেমা দেখছে। কিন্তু কেউ হয়তো জানেই না— সেই সিনেমার ভিতর দিয়ে আরেকটি যুদ্ধ চলছে।
১৯৫০ সালে সিআইএ জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এর চলচ্চিত্র স্বত্ব কিনে নেয়। কয়েক বছর পরে, ১৯৫৪ সালে, বইটির অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র সংস্করণ তৈরি হয়। কিন্তু অরওয়েলের গল্পে একটি বিশেষ পরিবর্তন আনা হয়েছিল। গল্পটির রাজনৈতিক বার্তাকে আরও কঠোরভাবে
সোভিয়েত-বিরোধী করে তোলা হয়। শিশুদের
জন্য তৈরি একটি অ্যানিমেশনও তাই হয়ে উঠতে পারে ঠাণ্ডা যুদ্ধের প্রচারের মাধ্যম।
আরেকটি ঘটনা আরও বিস্ময়কর। গ্রাহাম গ্রিনের বিখ্যাত উপন্যাস The Quiet American। ১৯৫৮ সালে উপন্যাসটির চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় সিআইএ-র পরামর্শে গল্পের চরিত্র ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় পরিবর্তন আনা হয়। উপন্যাসে নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ আমেরিকান চরিত্রটি চলচ্চিত্রে প্রায় নিষ্কলঙ্ক নায়কে পরিণত হয়। গ্রাহাম গ্রিন এই পরিবর্তন মেনে নেননি। কারণ, তিনি নিজেও জানতেন গুপ্তচরবৃত্তির জগতটা কেমন। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্স-এর সঙ্গে যুক্ত। তাই যখন চলচ্চিত্রটির রূপ দেখলেন, তাঁর রায় ছিল তীক্ষ্ণ— এটি যেন আমেরিকার জন্য তৈরি একটি প্রচারমূলক চলচ্চিত্র। একজন গুপ্তচরের লেখা গল্প। আর অন্য গুপ্তচরদের প্রভাবিত করা চলচ্চিত্র। বাস্তবতা আর কল্পনার সীমারেখা যেন ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল।
বছর পেরলো। ঠাণ্ডা যুদ্ধ শেষ হল। কিন্তু সম্পর্ক শেষ হল না।
২০০২ সাল। টম ক্ল্যান্সির উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হচ্ছে The Sum of All Fears। ছবির প্রযোজকদের দেওয়া হল এক অদ্ভুত সুযোগ— সিআইএ সদর দপ্তর ঘুরে দেখার। ছবির প্রধান অভিনেতা বেন অ্যাফ্লেকও চরিত্রটি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সংস্থার বিশ্লেষকদের সঙ্গে কাজ করেন। সিনেমা তখন আর শুধু সিনেমা নয়। বাস্তব গোয়েন্দা জগতের সঙ্গে হলিউডের দূরত্ব যেন ক্রমশ কমে আসছে।
এরপর আসে ‘আর্গো’। ২০১২ সালের সেই চলচ্চিত্রে ইরানে সিআইএ-র ভূমিকা তুলে ধরা হয়। মার্কিন শিক্ষাবিদ ট্রিসিয়া জেনকিন্স তাঁর বই The CIA in Hollywood: How the Agency Shapes Film and Television-এ ছবিটিকে সিআইএ-র প্রচারমূলক কাজ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং অভিযোগ তোলেন, চলচ্চিত্রটি ইরানে সংস্থাটির যুক্ত থাকার কিছু দিক আড়াল করেছে। ইরানে অবশ্য ছবিটির প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র ছিল। সেখানে কিছু সংবাদমাধ্যম এমনও অভিযোগ তোলে— বেন অ্যাফ্লেক নিজেই একজন গুপ্তচর। অভিযোগটি সত্যি ছিল কি না— তার উত্তর মেলেনি। কিন্তু অভিযোগটি একটি পুরানো প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এল। হলিউডের অভিনেতা আর গুপ্তচরের মধ্যে সীমারেখাটা আসলে কোথায়?
অ্যাফ্লেক যদি সত্যিই গুপ্তচর হতেন, তবে তিনি অবশ্যই প্রথম অভিনেতা হতেন না, যাঁর জীবন সিনেমার চেয়েও অদ্ভুত। ২০০৮ সালে মার্কিন প্রশাসনের পুরানো গোয়েন্দা নথি প্রকাশ্যে আসে। সেখান থেকে জানা যায়, স্টার্লিং হেডেন, যিনি Dr. Strangelove-এ সেই উন্মাদ জেনারেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন গোপন অভিযানে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এমনকি তিনি ক্রোয়েশিয়ায় প্যারাসুটে নেমে গোপন মিশনে অংশ নিয়েছিলেন। অর্থাৎ পর্দায় তিনি একজন পাগল জেনারেল। আর বাস্তব জীবনে? তিনি সত্যিই ছিলেন একজন গোপন যোদ্ধা। হলিউডের গল্প তখন আর অবিশ্বাস্য মনে হয় না!
কিন্তু কিছু গল্প সত্যি আর কিংবদন্তির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকে। গ্রেটা গার্বো এমনই এক নাম। রূপালি পর্দার রহস্যময়ী তারকা। তাঁর চোখ, তাঁর নীরবতা, তাঁর ব্যক্তিত্ব— সবকিছুতেই যেন একটা গোপন সংকেত লুকিয়ে ছিল। তাঁর সাম্প্রতিক এক জীবনীতে দাবি করা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্যক্তিগতভাবে অ্যাডলফ হিটলারকে হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আরও বলা হয়, তিনি ডেনিশ পদার্থবিজ্ঞানী নিলস বোরকে নাৎসিদের হাত থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার কাজে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু এখানেও রহস্য। সম্ভবত গার্বো নিজে এই কাজগুলি করেননি। তাঁর নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। ডাবল এজেন্ট হুয়ান পুহোল গার্সিয়া— যিনি নাৎসি গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিখ্যাত—গার্বোর নামকে একটি সাংকেতিক পরিচয় হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন বলে দাবি রয়েছে। তাহলে গার্বো কি গুপ্তচর ছিলেন? নাকি একজন কিংবদন্তি অভিনেত্রীর নামকে ব্যবহার করেছিল গুপ্তচরদের অদৃশ্য জগৎ? উত্তর আজও অস্পষ্ট।
এরল ফ্লিনের কথাই ধরুন। হলিউডের অন্যতম বিখ্যাত তারকা। তাঁকে ঘিরে এমন একটি গুপ্তচর কাহিনি তৈরি হয়েছিল, যা সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। চাঞ্চল্যকর জীবনীকার চার্লস হাইয়াম তাঁর বই Errol Flynn: The Untold Story-তে দাবি করেন, ফ্লিন ছিলেন নাৎসি গুপ্তচর। এমনকি তিনি একবার অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশটি এখনও বাকি। হাইয়ামের দাবি অনুযায়ী, ফ্লিনের উপর পালটা নজর রাখছিলেন আরেক হলিউড তারকা— ক্যারি গ্র্যান্ট। অর্থাৎ একই শহরের দুই তারকা। একজন নাকি নাৎসি গুপ্তচর। অন্যজন নাকি ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের হয়ে তাঁর উপর নজর রাখছেন। হলিউডের পর্দায় এমন গল্প লিখলে দর্শক হয়তো বলত—এটা অসম্ভব! কিন্তু গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে অসম্ভব বলে কোনো শব্দ নেই। অথবা, সবকিছুর সত্যতা যাচাই করা এত সহজ নয়। কারণ হাইয়ামের দাবিগুলির সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর বর্ণনার কিছু অংশকে গবেষকেরা সন্দেহের চোখে দেখেছেন। তাহলে কোনটা সত্যি? কোনটা বানানো? আর কোনটা এমন এক গল্প, যা এতবার বলা হয়েছে যে শেষ পর্যন্ত সত্যির মতো শোনাতে শুরু করেছে?
হলিউডের সবচেয়ে বড়ো রহস্য সম্ভবত কোনো নির্দিষ্ট গুপ্তচরের পরিচয় নয়। রহস্যটা হল—গল্প আর সত্যির মাঝখানের সেই পাতলা পর্দা। একদিকে অভিনেতারা। তাঁরা মানুষের সামনে অন্য মানুষের জীবন অভিনয় করেন। অন্যদিকে গুপ্তচরেরা। তাঁরা নিজেদের আসল পরিচয় লুকিয়ে অন্য কারও জীবন অভিনয় করেন। দু’জনেই মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করতে পারে। দু’জনেই দর্শককে বিশ্বাস করাতে পারে এমন কিছু, যা আসলে সত্যি নয়।
তাই হলিউডের ইতিহাসে যখনই কোনো গুপ্তচরের গল্প সামনে আসে, প্রশ্ন ওঠে— লোকটি কি সত্যিই গুপ্তচর ছিল? তার চেয়েও বড়ো প্রশ্ন— গল্পটি কে লিখেছিল? কারণ গুপ্তচরের পৃথিবীতে সত্য
কখনও সরাসরি সামনে আসে না। আর হলিউডে তো আরও নয়।
ক্যামেরা বন্ধ হয়ে যায়। আলো নিভে যায়। দর্শকরা বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু স্টুডিয়োর অন্ধকার করিডরে তখনও হয়তো কেউ অপেক্ষা করছে। হাতে একটি ফাইল। ফাইলের উপর কোনো সিনেমার নাম নেই। শুধু লেখা— CLASSIFIED.