


গেরুয়া রং ত্যাগের রং। আমাদের কাছে গেরুয়া বললেই প্রথমে সামনে আসে স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীচৈতন্য নিমাই সন্ন্যাসী, স্বামী প্রণবানন্দের নাম। তাঁরা হিন্দুধর্মের স্বরূপ নির্ধারণ করে দিয়ে গিয়েছেন। এবং বাঙালি যুগ যুগ ধরে সেই পথেই চলবে। স্বামী বিবেকানন্দ বলে গিয়েছেন, গীতা পড়ার চেয়ে ফুটবল খেলা যুব সম্প্রদায়ের চরিত্র গঠনে অধিক সহায়ক। বাঙালি সেই কথাই আমৃত্যু মনে রাখবে। আজও রামকৃষ্ণ মিশনে মাছ মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ নয়। ভাণ্ডারা হলে, নানা পার্বণে আমিষের আয়োজন থাকে। স্বামীজি মাংস খান বলে ঠাকুরের কাছে অভিযোগ জমা পড়েছিল। সে অনেক কাল আগের কথা। বাবাজির জানা নেই। তার উত্তরে শ্রীরামকৃষ্ণ কী বলেছিলেন তা সকলের জানা। আসলে স্বামী বিবেকানন্দ এবং শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শের মূল আদর্শ প্রোথিত রয়েছে একটা মাত্র বাক্যে: জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। হিন্দু ধর্ম দখলদারি, ক্ষমতা দখল, কুরসি কেড়ে নেওয়ার যন্ত্র কিংবা অস্ত্র হতে পারে না। লুণ্ঠন তার ডিনএ তে কোনোদিন ছিল না। এই ধর্মের মূলে প্রেম ভাইচারা এবং সব পথ আর মতের মিলন। যার কেন্দ্রে ত্যাগ এবং সহাবস্থান। সহনশীলতার আর্দশ।
তেমনি পুজোয় বাঙালি কী করবে, কী পরবে, কী খাবে তা ভিনদেশি কোনো বাবার উপদেশ শুনে ঠিক হবে না। বলপূর্বক এসব চাপাতে গেলে জনসমর্থন নিমেষে ধসে যাবে। বিজেপি যেন একথা মনে রাখে। আর কেউ জানুন আর নাই জানুন শমীকবাবু জানেন, বাঙালিকে বাঙালির ধর্মকে বেড়া দিয়ে ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে বাঁধা কঠিন। পুজোতেও সে মাছ খাবে নাকি মাংস খাবে, কাঁকড়া খাবে না ইলিশ নাকি চিংড়ি সেটা তার মরজি। এখানে কারও দখলদারি, উপদেশ অবাঞ্ছিত এবং অনভিপ্রেত। আসলে আমাদের মায়ের পুজো শাক্ত মতেই হয়। শক্তি পুজো এবং অধর্মের বিনাশ এই পুজোর মূল মন্ত্র। বহু জায়গায় পশুবলি তাই পুজোর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামে তো বটেই। বলির মাংস প্রসাদ মনে করে ভক্তরা গ্রহণ করেন। এটাই যুগ যুগ ধরে রীতি। সনাতনী ঐতিহ্য। যাঁরা পুজোয় আমিষ খান তাঁরা ‘পাখন্ডি’ হয়ে যান না। আবার নিরামিষ খেলেই কেউ হিন্দুধর্মের পথপ্রদর্শক হতে পারেন না। পবিত্রতা ঠিক করার তুমি কে হে! বাঙালির হিন্দু ধর্ম স্বামীজির দেখানো পথেই উচ্চ সুরে বাঁধা। স্বামীজি ঠাকুরকে পদে পদে পরখ করেছিলেন। আজকের হিন্দুধর্মও তাই। ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে শমীকবাবু ১২৪ বছর আগে ইহলোক ত্যাগ করা মানুষটিকেই তাই ঢাল করেছেন। যদি উতরোতে পারেন। মধ্যপ্রদেশ থেকে আগত বাবা ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্যকে নস্যাৎ করে তাঁর সাফ কথা, কোন সাধু এসে কী বলল তার জন্য বাঙালি আমিষ খাবে না? বাঙালি অষ্টমীতে লুচি আর নবমীতে পাঁঠার মাংস খাবেই। পুজো পর্বে মাছ মাংসের দোকান বন্ধ রাখার যে নিদান ভিনরাজ্যের বাবাজি দিয়েছেন তা কার্যকর হলে সরকার যে চরম বিপদে পড়বে তা আঁচ করেই শমীকবাবুর তড়িঘড়ি মাঠে নামা। শুধু শমীকবাবু নন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ডঃ সঞ্জীব সান্যালও বাবাজির ফতোয়া উড়িয়ে দিয়েছেন।
আসলে বাঙালির পুজো আসলে শক্তি আরাধনারই শক্তিশালী সোপান। সেখানে মাছ মাংস পবিত্র ধর্মীয় উপাদান। সনাতনীদের কেউ কেউ কুকথা বললেও ওসব ছাড়া বাঙালির পুজো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। নটরাজের নৃত্যের তালে তালে সেই শক্তিকেই আমাদের নমন বারে বারে। বাইরে থেকে এসে কেউ যদি হঠাৎ হিন্দু ধর্মকে অন্যপথে চালিত করতে চায় প্রগতিশীল বাঙালি সমাজ মেনে নেবে না। কেউ যেন সেই চেষ্টাও না করে। শাক্ত হিন্দুদের সঙ্গে বৈষ্ণব বা অন্যান্য সনাতনীদের মেলাতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। শমীকবাবু বিপদ বুঝেই স্বামী বিবেকানন্দের উক্তি ধার করেছেন। ‘এদেশে সেই বুড়ো শিব বসে আছেন, মা কালী পাঁঠা খাচ্ছেন আর বংশীধারী বাঁশি বাজাচ্ছেন’। ঠিকই তো, স্বামীজির উপর কে আছেন। স্বামীজি এবং গুরু রামকৃষ্ণ সারাজীবন সেই বহুত্ববাদ আর সহাবস্থানের জয়গান গেয়ে গিয়েছেন। বাঙালির আর কোনো বাবার দরকার নেই। পুজোয় বাঙালি আমিষ খাবেই। বাঙালির পুজো মানেই শক্তিরূপেন সংস্থিতা। আর ধর্ম মানেই যত মত তত পথ। এর বাইরে সব শূন্য আর ফাঁকি।