


সংবাদদাতা, মানকর: প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নিয়েছেন কুড়ি বছর আগে। কিন্তু স্কুলে যাওয়া থামেনি অন্ধ রবিলাল গড়াইয়ের। থামেনি পড়ানোও। কচিকাঁচাদের কাছে আশি ছুঁইছুঁই এই জনপ্রিয় শিক্ষক এখন ‘দাদু স্যার’। এলাকার মানুষের কাছে তিনি ‘রবি মাস্টার’।
কাঁকসার জঙ্গলমহল এলাকার বিষ্ণুপুর ফ্রি প্রাইমারি স্কুল থেকে রবিলালবাবু ২০০৬ সালে অবসর নেন। কিন্তু তারপর দুই দশক কেটে গিয়েছে। আজও নিয়মিত স্কুলে এসে পড়ান তিনি। ২০০৪ সালে চিকিৎসার ভুলে রবিলালবাবু দু’ চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। তখনও তাঁর অবসর হয়নি। কিন্তু এই আকস্মিক অন্ধকারেও তিনি হাল ছেড়ে দেননি। নতুন ভাবে তৈরি করেছেন নিজেকে। সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন হওয়ায় তিনি ব্ল্যাকবোর্ডে লিখতে পারেন না। তবে স্মৃতিশক্তির জোরে নিখুঁতভাবে ক্লাস নেন। পড়ুয়ারা তাঁর হাতে কোনো বই তুলে দিলে তিনি অনায়াসে মুখস্থ বলে যান কবিতা, গল্প, এমনকী অঙ্কও করে দেন মুখে মুখে।
পড়ুয়ারা বলে, দাদু স্যার হাঁটার সময় লাঠি নিতে পছন্দ করেন না। আমাদের কাঁধে হাত রেখে তিনি ক্লাসে আসেন। রবিবাবুর মতে, লাঠি তাঁকে অসুস্থতার অনুভূতি দেয়। পড়ুয়াদের কাঁধে হাত রেখে পথ চললে আত্মবিশ্বাস পান। তিনি বলেন, ওদের সাফল্যই আমার কাছে গর্বের। একদিন এই পড়ুয়ারা বড় হয়ে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হবে। ওদের আমি ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করছি। কীসের টানে স্কুলে আসেন? তিনি বলেন, ছেলেমেয়েদের পড়াতে আমার খুব ভালো লাগে। বাড়িতে বসে থাকতে পারি না। চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়া অঙ্কুশ খয়রা বলে, ‘দাদু’র ক্লাস করতে আমাদের খুব ভালো লাগে। গল্প শোনান। চকোলেট দেন। দাদুকে ছাড়া স্কুল ভাবতেই পারি না। অন্য এক পড়ুয়া বলে, দাদুর ক্লাসের জন্য মুখিয়ে থাকি। রবিলালবাবু স্কুল গেটে হাজির হলেই পড়ুয়ারা এক দৌড়ে তাঁর কাছে হাজির হয়ে যায়। কার কাঁধে হাত দিয়ে তিনি আসবেন তা নিয়ে খুদেদের মধ্যে চলে প্রতিযোগিতা। বিদ্যালয়ে এখন পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। টিচার-ইন-চার্জ বাপি হাজরা বলেন, স্কুল দরদি মানুষ উনি। আমাদের খুব ভালোলাগে উনি এখানে আসেন। অভিভাবকরা বলেন, পড়ানোটা ওঁর নেশা। ছাত্রছাত্রীদের ছাড়া থাকতে পারেন না। বনস্পতির মতো ছায়া দিয়ে যাচ্ছেন এখনও। রবিলালবাবুর নাতনি একাদশ শ্রেণির ছাত্রী অঙ্কিতা গড়াই বলে, এই বয়সে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দাদু পড়াচ্ছেন, এটা আমাদের কাছে গর্বের।
• নিজস্ব চিত্র