


সুকোমল দালাল, বোলপুর: বিকেল ৪টে বাজলেই বই-খাতা নিয়ে মাঠে হাজির হয় একদল শিশু। কেউ প্রি-প্রাইমারিতে পড়ে, কেউ ষষ্ঠ শ্রেণিতে। পাকা ঘর নেই, বেঞ্চ নেই, লাগে না টিউশনের ফি। খোলা আকাশের নীচেই চলে পড়াশোনা। আর পড়ান গ্রামেরই ৫৩ বছরের রবি দাস। সকলের কাছে তিনি ‘রবি মাস্টার’।
পাড়ুই থানার শ্রীচন্দ্রপুরে ঘোষালডাঙা দুর্গামন্দিরের মাঠে এভাবেই চলছে একটি ‘অন্যরকম পাঠশালা’। ২০০০ সালে শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগ। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গিয়েছে প্রায় ২৫ বছর। বর্তমানে প্রায় ৬০ জন পড়ুয়া এখানে আসে। তাদের মধ্যে রয়েছে আদিবাসী শিশুরাও।
কোপাই নদী পেরিয়ে আঁকাবাঁকা পথ ধরে শ্রীচন্দ্রপুরে পৌঁছতে হয়। গ্রামের বহু পরিবারেরই ভরসা চাষবাস। আর্থিক সামর্থ্য কম। সন্তানদের আলাদা করে টিউশন পড়ানোর সুযোগ নেই অনেকের। সেই জায়গাতেই ভরসা রবি মাস্টারের পাঠশালা।
মাধ্যমিকের পর শারীরিক কারণে কলেজে পড়া হয়নি রবিবাবুর। এখন নিজের জমিতে চাষ করেন। তার মধ্যেই প্রতিদিন বিকেলে সময় দেন পড়ুয়াদের। স্কুলের পড়ার পাশাপাশি ড্রয়িং, পরিচ্ছন্নতা, প্রার্থনা এবং সচেতনতার পাঠও দেন। তবে বৃষ্টি হলে বন্ধ থাকে মাঠের ক্লাস। রবিবাবু বলেন, এলাকার মানুষ যাতে পড়াশোনা শিখতে পারে, সেই জন্যই এই উদ্যোগ। কোনো পারিশ্রমিক নিই না। সমস্ত বিষয় পড়াই। পাশাপাশি অন্য বিষয়গুলিও শেখাই। রবীন্দ্রনাথের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ এই ভাবনাতেই কাজ করে চলেছি। এই পাঠশালার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে গ্রামের একাধিক প্রজন্ম। স্থানীয় বাসিন্দা ছোটন দাস বলেন, আমরাও ছোটোবেলায় মাস্টারমশায়ের কাছে পড়েছি। এখন আমার সন্তানও এখানে পড়ে। এত বছর ধরে বিনা পয়সায় তিনি যে কাজ করছেন, তা সত্যিই প্রশংসার।
রবি মাস্টারের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য সবুজকলি সেন। তিনি বলেন, এরকম মানুষ আজকের দিনে বিরল। নিজের দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষা দেওয়ার কাজে কতজন এগিয়ে আসেন? নিঃসন্দেহে এটি পবিত্র কাজ। তাঁকে সাধুবাদ জানাই। খুশি পড়ুয়াদের মায়েরাও। তাঁদের কথায়, স্কুলের পর সন্তানরা এখানে এসে আরও পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। প্রাইভেট টিউশন দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার আগ্রহটা ধরে রাখা যাচ্ছে। ২৫ বছরের এই পথচলায় অবশ্য সরকারি বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সাহায্য মেলেনি। নিজের সামর্থ্য এবং গ্রামবাসীর সহযোগিতাতেই চলছে পাঠশালা। সন্ধ্যা নামার আগে বই-খাতা গুছিয়ে বাড়ি ফেরে শিশুরা। পরদিন বিকেল ৪টে বাজলেই আবার সেই মাঠে বসবে ক্লাস। পাকা শ্রেণিকক্ষ নেই, বেতন নেই, আছে একজন মানুষের শিক্ষাদানের জেদ। আর রয়েছে প্রায় ৬০টি শিশুর শেখার আগ্রহ। কোপাইয়ের তীরে এই পাঠশালাই হয়ে ওঠে শিক্ষক দিবসে অন্যরকম এক শ্রদ্ধার্ঘ্য। নিজস্ব চিত্র