


মৃণালকান্তি দাস: বছরের সেপ্টেম্বর মাস। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একটি ব্রিফকেস খোলেন। পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ব্রিফকেসের মধ্যে চকচকে কিছু বিরল খনিজ সম্পদ। ওটাই ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে পাকিস্তানের লোভনীয় টোপ। ওয়াশিংটনকে কাছে টানার পাকিস্তানি ‘গাজর’। মার্কিন বিনিয়োগের জন্য পাকিস্তান নিজেদের খনিজ সম্পদের দুয়ার খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে লাফিয়ে উঠেছিলেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই কালো মেঘের ছায়া ঘিরে ফেলেছে সেই প্রতিশ্রুতিকে!
পাকিস্তানের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি কয়েক বছর ধরে টানা চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে শেষ মুহূর্তের বেলআউট বা জরুরি ঋণসহায়তা পেয়ে কোনোমতে দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা পায় দেশটি। এই নিয়ে ২৫ বার আইএমএফের দ্বারস্থ হয়ে ৭০০ কোটি ডলারের তহবিল নিশ্চিত করেছে ইসলামাবাদ। কিন্তু তাতে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়া ছাড়া লাভের লাভ কিছুই হয়নি। পাকিস্তানকে একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে সরকারি নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) চিত্র এখনও হতাশাজনক। সম্প্রতি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত তথ্যে দেখা গিয়েছে, গত বছর জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিনিয়োগে বড়ো ধরনের ধস নেমেছে। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে দেশটি মাত্র ৮০ কোটি ৮০ লাখ ডলারের এফডিআই পেয়েছে। অথচ, আগের বছরের একই সময়ে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
ধূর্ত আসিম মুনির ভেবেছিলেন, হাল ফেরাতে খনিজ সম্পদকে ‘গাজর’ হিসেবে ব্যবহার করবেন। এই খনিজ সম্পদের লোভ দেখিয়ে আমেরিকাকে একবার বালুচিস্তানের মাটিতে টেনে নিয়ে আসতে পারলে ইসলামাবাদ অনেকটা দায় মুক্ত হতে পারবে। বালোচ বিদ্রোহীদের ঠেকাতে তখন ইসলামাবাদের কাছে কাঁড়ি কাঁড়ি সামরিক সাহায্য পাঠাবে অথবা মার্কিন সেনাবাহিনী উড়ে আসবে বালুচিস্তানের মাটিতে। এতে একদিকে বালোচ বিদ্রোহীরা পালাতে বাধ্য হবে আর ইসলামাবাদও আমেরিকার কাছ থেকে যতটা সম্ভব ফায়দা লুটতে পারবে। এক ঢিলে দুই পাখি মরবে। কিন্তু তাতে সবচেয়ে লাভবান হবে চীন। এই অঙ্কটা আসিম মুনির ধরতে না পারলেও, ওয়াশিংটনের বুঝতে অসুবিধে হয়নি। তবে বালুচিস্তানের জালে আমেরিকাকে আটকে ফেলার কৌশল ইসলামাবাদের নাকি বেজিংয়ের— তা এখনও স্পষ্ট হয়নি।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড়ো প্রদেশ বালুচিস্তান। আবার এই প্রদেশেই দেশটির জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে কম। পাকিস্তানের ২৪ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র দেড় কোটির বাস এখানে। পাকিস্তানের সবচেয়ে সমৃদ্ধ খনিজ ভাণ্ডারগুলি মূলত বালুচিস্তানেই। সাধারণত, সমুদ্র উপকূলবর্তী ও খনি সংবলিত এলাকাগুলির দ্রুত আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটে। কিন্তু বালুচিস্তানের ক্ষেত্রে সেই হিসাব একেবারেই মেলেনি। বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ বালুচিস্তান। বর্তমানে এখানকার ৭০ শতাংশ বাসিন্দা দারিদ্রসীমার নীচে। আর ১৫ শতাংশ বালোচ ভুগছেন হেপাটাইটিস বি এবং সি-তে। অথচ, এই প্রদেশেই তেল, কয়লা, সোনা, তামা ও গ্যাসের বড়ো মজুত রয়েছে। যা পাক সরকারকে বিপুল রাজস্ব এনে দেয়। বালুচিস্তানের সুই এলাকায় রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস। পাইপলাইনে লাহোর, মুলতান, ইসলামাবাদ বা রাওয়ালপিন্ডিতে ওই গ্যাস সরবরাহ করে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ কামায় পাক সরকার। সেই প্রাকৃতিক সম্পদের কানাকড়িও পৌঁছায় না বালোচদের কাছে।
আয়তনে জার্মানির চেয়েও বড়ো বালুচিস্তান আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রদেশ এখন চীনা বিনিয়োগের প্রাণকেন্দ্র। এখানে জড়িয়ে আছে ইরানের রাজনীতি। আমেরিকার কৌশল। আফগানিস্তানের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ কম নয়। পাকিস্তান বালুচিস্তানের সম্পদের একাংশ তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন এবং গত বছর স্বাক্ষরিত এক ঐতিহাসিক চুক্তির ভিত্তিতে আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এরপরই ইসলামাবাদের খনি প্রকল্পে লগ্নি বৃদ্ধি করে ওয়াশিংটন। মুনিরের এই পদক্ষেপে ক্ষোভ বেড়েছে বালোচ বিদ্রোহীদের। তাঁদের দাবি, এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করার ফন্দি রয়েছে রাওয়ালপিন্ডির ফিল্ড মার্শালের। এরপরই শুরু হয় একের পর এক বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলা।
চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে ফের রক্তাক্ত হয়েছে বালুচিস্তান। সেখানকার বিদ্রোহী গোষ্ঠী বালোচ লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়েছে ইসলামাবাদের ফৌজ। বিভিন্ন প্রদেশের সেনাঘাঁটি ও পুলিশ চৌকিতে অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়েছে বিএলএ। বিশ্লেষকদের দাবি, বালোচিস্তানের বিদ্রোহের জন্য ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। সেনাবাহিনী থেকে রাজনৈতিক দল, ইসলামাবাদে যে সরকারই থাকুক না কেন, তার প্রতি বালোচদের মনে বাড়ছে বিদ্বেষ। বিদ্রোহের সেই আগুনকে বুটে পিষে নিভিয়ে দিতে বার বার তৎপর হতে দেখা গিয়েছে রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলদের। পালটা আঘাত হানছে বালোচ লিবারেশন আর্মিও। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের তথ্য জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে এই প্রদেশে অন্তত ২৫৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। এসব হামলায় ৪০০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছেন। গত বছর শুরু করা ‘অপারেশন হেরফ’এখনও বন্ধ করেনি বালোচ লিবারেশন আর্মি।
পয়লা ফেব্রুয়ারি পর পর বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছে বালুচিস্তান। একযোগে প্রদেশটির অন্তত ১২টি জায়গায় হামলা চলেছে। তার কোনোটি আত্মঘাতী, কোনোটি মুখোমুখি। এই সমস্ত হামলার অধিকাংশের নেপথ্যে ছিলেন দুই তরুণী হামলাকারী। তাঁদের ছবি প্রকাশ্যে এনেছে বালোচ বিদ্রোহীরা। তাঁদের মধ্যে একজন ২৪ বছরের আসিফা মেঙ্গল। দ্বিতীয় জনে নাম হাওয়া বালোচ। আত্মঘাতী হামলার ঠিক আগে দ্বিতীয় তরুণীর একটি ভিডিয়ো রেকর্ড করে বিএলএ। সেখানে অন্য একজনের সঙ্গে তাঁকে কথা বলতে দেখা গিয়েছে। হাতে বন্দুক নিয়ে হাসতে হাসতে তিনি বলেছেন, ‘ওরা (পাক সরকার) আমাদের মা-বোনেদের দমিয়ে রাখতে শুধু গায়ের জোর দেখায়। সরাসরি আমাদের মুখোমুখি হতে পারে না। সেই ক্ষমতা নেই। আমাদের জাগতে হবে।’ সূত্রের খবর, তাঁদের এ বারের আক্রমণ অনেক বেশি প্রাণঘাতী হওয়ায় পাক সেনার মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ স্বীকার করেন, বালুচিস্তানের বৃহৎ আয়তন এবং সেখানকার সন্ত্রাসবাদীদের উন্নত অস্ত্রসম্ভারের কারণে তাদের সঙ্গে পেরে ওঠা পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে বড়ো চ্যালেঞ্জ। আল জাজিরার সাংবাদিক ওসামা বিন জাভাইদ বলছেন, বহুদিনের প্রশাসনিক অবহেলা, নির্মম বিদ্রোহ, ছায়াযুদ্ধ এবং উচ্চমাত্রার ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের ফলে সম্প্রতি সেখানে হিংসার বিস্ফোরণ ঘটেছে। এই হিংসা থামার নয়!
হিংসার এই সর্বশেষ ঢেউ এমন এক সময়ে এসেছে, যার মাত্র কয়েক দিন আগেই চীনা কোম্পানিগুলিকে আকৃষ্ট করতে খনিজ সম্মেলন আয়োজন করেছিল পাকিস্তান। গ্বদর সমুদ্রবন্দরের উন্নয়নসহ এই প্রদেশে ইতিমধ্যে বিপুল বিনিয়োগ করেছে চীন। এটি পাকিস্তানের একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দর। ৬ হাজার কোটি ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (সিপিইসি) প্রধান কেন্দ্র এই বন্দর। যার লক্ষ্য দক্ষিণ-পশ্চিম চীনকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা। মলাক্কা প্রণালীকে পাশ কাটিয়ে পশ্চিম এশিয়া থেকে চীনের জ্বালানি আমদানির পথগুলিকে সুরক্ষিত এবং সংক্ষিপ্ত করার জন্য সিপিইসি গড়ে তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের খনিজ সম্পদ উত্তোলনে বিনিয়োগের লক্ষ্যে আমেরিকার খনি কোম্পানি ‘ইউএসএসএম’৫০ কোটি ডলারের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান অশান্তি দুই রাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই ক্রমশ প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে মাথায় হাত সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের।
গোটা ঘটনার নেপথ্যে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করে ভারতের দিকে আঙুল তোলে পাকিস্তান, যা পত্রপাঠ উড়িয়ে দিতে সময় নেয়নি নয়াদিল্লি। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি পাকিস্তানের নিজস্ব ‘অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা’থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার একটি অপচেষ্টামাত্র। আসলে, বালুচিস্তানে হামলার জবাবে ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া এখন অনেকটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিদ্রোহীদের নতুন নামে ডাকা হচ্ছে— ‘ফিতনা আল হিন্দুস্তান’। যার অর্থ ভারতের উপদ্রব। ‘বিদেশি হাত’ তত্ত্ব এখন পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা বয়ানের মূল স্তম্ভ। প্রায় প্রতিটি হামলাকেই ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এতে বালোচদের স্থানীয় ও বাস্তব ক্ষোভের বিষয়গুলি আড়ালে চলে যায়। তার জায়গা নেয় সহজ ও দায় এড়ানোর একটি গল্প— প্রতিবেশী দেশগুলি নাকি তাদের বড়ো অর্থনৈতিক প্রকল্প নস্যাৎ করতে চায়। এই বয়ানের ভিত্তিতেই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিজেদের দেশের অখণ্ডতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে চায়। যা মানতে নারাজ বালোচরা।
স্বাভাবিকভাবেই বছরের পর বছর বিদ্রোহের আগুনে পুড়ছে বালুচিস্তান। মুহুর্মুহু আক্রমণ শানিয়ে পাকিস্তানের সরকার এবং সেনাকে নাকানিচোবানি খাওয়াচ্ছে বালোচ বিদ্রোহীরা। সশস্ত্র গোষ্ঠীটির অভিযোগ, দিনের পর দিন বালুচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করছে ইসলামাবাদ। জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের দাবি, পাকিস্তানের থেকে আলাদা হতে বালোচরা যে কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে একের পর এক ঘটনাতেই তার প্রমাণ মিলছে। ফলে বালুচিস্তান নিয়ে আবারও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকাঠামোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে পাক মিডিয়া। আলোচনা চলছে বালোচদের হতদরিদ্র জীবনমান, দেনা-পাওনা নিয়ে। কিন্তু কিছুদিন পরই, ঠিক আগের মতোই ইসলামাবাদের ক্ষমতাকেন্দ্র ও সংবাদমাধ্যম বালুচিস্তানকে ভুলে যাবে। দূর থেকে বিশ্লেষণ চলবে। এই নীরবতা কি স্থায়ী শান্তির দিকে যাবে, নাকি পরবর্তী ঝড়ের আগের বিরতি হবে, তা নির্ভর করবে পরের অধ্যায় কে লিখছে, তার উপর।