


অয়নকুমার দত্ত: দৃশ্য এক: শীতের দুপুর। কলকাতা ময়দান। ধুলো ধূসরিত মাঠে সারি সারি বইয়ের স্টল। উপচে পড়া পাঠকের ভিড়। বই দেখা, বই পড়া, বই কেনা চলছে জোর কদমে। সেই সঙ্গে রয়েছে চা-কফিতে গলা ভিজিয়ে নেওয়া, খাওয়াদাওয়া।
কাট টু: বইয়ের স্টল, উপচে পড়া পাঠকের ভিড় একইরকম। তবে, উধাও বইমেলার চেনা ধুলো। চেকার্স টাইলসে ঢেকে মেলা চত্বর। আসলে সল্টলেক স্টেডিয়াম, মিলন মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে ময়দান থেকে কলকাতা বইমেলার এখন স্থায়ী ঠিকানা সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্ক।
গত পাঁচ দশকে বইমেলার স্থান যেমন বদলেছে, বদলেছেন লেখক ও পাঠককুল। লেখার বিষয়বস্তু থেকে পাঠকের স্বাদ বদল ঘটলেও বইয়ের প্রতি বাঙালির টান আজও অটুট। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, রিলস, ব্লগ, ভ্লগ এখনকার প্রজন্মকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। অ্যান্ড্রয়েড ফোনের জাদুদণ্ডের ছোঁয়ায় পাল্টে গিয়েছে প্রৌঢ়ত্বের সংজ্ঞা। বাড়ির গৃহবধূটিও নিজের কাজ সামলে অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে চোখ বুলিয়ে নেয় নিজের পছন্দের সিরিয়ালে। বিনোদনের এখন হরেক মাধ্যম। সেখানে বই যেন খানিকটা ‘প্রবীণ’। বইপড়ার রেওয়াজ নাকি অনেকটা কমে গিয়েছে। তবুও বাঙালি যে আজও বই পাগল, তা কলকাতা বইমেলায় না এলে বিশ্বাস করা কঠিন। বারো মাসে তেরো পার্বণ পালন করা বাঙালির চোদ্দো নম্বর পার্বণ অবশ্যই বইমেলা। এ মেলা লেখক ও পাঠকের মেলা। ৩৬৫ দিন যাঁদের লেখা পাঠককে মুগ্ধ করে, এই মেলার ক’দিন তাঁদের হাতের নাগালে পাওয়ার আনন্দ সকলকে অভিভূত করে। বইয়ের উপর অটোগ্রাফ করানোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাল ফ্যাশনের সেলফি।
কতটা পাল্টেছে কলকাতা বইমেলা? স্মৃতি হাতড়ে বর্ষীয়ান সাহিত্যিক অমর মিত্র বলছিলেন, ‘প্রথমবার বইমেলা হয়েছিল অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের উল্টো দিকে। সে তো পাঁচ দশক আগের কথা। প্রথম বইমেলা থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যেকটি মেলাতে আমি এসেছি। শুধু ব্যক্তিগত উপলব্ধিই নয়, এই বর্ষীয়ান কথাসাহিত্যিক বইমেলা ঘিরে নানান মজার ঘটনার সাক্ষী। ‘এত বড় একজন লেখক টিকিটের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে! সেদেশে কিছু হবে!’ সবাই বলাবলি করছেন, কে লেখক, কে লেখক? বিকাশ দূরে আমাকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। তখন তো টিভি-ইন্টারনেটের যুগ নয় যে, সাধারণ মানুষ সবার মুখ চিনবে! তারা লাইন ছেড়ে দিতে বিকাশ আমাদের জন্য টিকিট কেটে নিয়ে চলে এল।’’ এমনই ঘটনা ঘটেছিল প্রয়াত সাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনেও। সেই প্রসঙ্গে ‘ধ্রুবপুত্রে’র স্রষ্টা বলছিলেন, ‘‘এই ঘটনাটি আমার সামনে ঘটেনি। পরে শুনেছিলাম। এটাও বেশ মজার ঘটনা। যেসময়ের কথা, তখন প্রফুল্ল রায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, বরেন গঙ্গোপাধ্যায় ও শিল্পী সুবোধ দাশগুপ্ত একসঙ্গে যুগান্তর পত্রিকায় চাকরি করতেন। তখন লেখকদের বাড়িতে গিল্ডের কার্ড পাঠানো হত। কিন্তু গিল্ডের কার্ড পৌঁছতে দেরি হত। কার্ড ছাড়াই শ্যামলদা সাদা প্যান্ট, সাদা শার্ট পরে পুরো বাহিনী নিয়ে বইমেলার গেটে হাজির। এদিকে, কার্ড নেই সঙ্গে। টিকিট কাউন্টারেও বিশাল লাইন। কী করা যায়। শ্যামলদা বুদ্ধি খাটিয়ে মেলার গেটে কলকাতা পুলিশের যে কর্মী মোতায়েন ছিলেন, তাঁকে গিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এদিকে সব ঠিকঠাক তো? কোনও সমস্যা নেই? ভট্টচাজ এসেছে?’ আসলে হাওয়া থেকে একটা পদবি নিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছেন। সেই পুলিশকর্মী তো শ্যামলদাকে লালবাজারের সাদা পোশাকের অফিসার ঠাওরেছেন। তিনি তাড়াতাড়ি বললেন, ‘হ্যাঁ, স্যার এদিকে সব ঠিকঠাক। ভট্টচাজবাবুকে দেখিনি।’
শ্যামলদা পাল্টা বললেন, ‘দেখনি! কী যে কর! যাইহোক, খুব ভিড় গেটে যেন কোনও গণ্ডগোল না হয়। অ্যাই প্রফুল্ল, এইদিকে আয় তো। সবাই ভিতরে চ।’’ এই বলে সকলকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়েছিলেন ‘শাহজাদা দারাশুকো’র লেখক। অমর মিত্রের বইমেলার গল্পের ঝুড়ি যেন অফুরন্ত, শেষ হতে চায় না। বলছিলেন, ‘‘বইমেলায় সাহিত্যিক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে রণপা চড়ে ঘুরতে দেখেছি। বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী হাঁটছেন, তাঁদের ঘিরে রেখেছেন তরুণ লেখকরা।
(১৩) পাতার পর
সেবার সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ‘হালকা হাসি চোখের জল’ প্রকাশিত হয়েছে। সেই বই কেনার জন্য হইহই ব্যাপার। বই শেষ। স্টল থেকে বলা হচ্ছে, ‘আজ আর পাওয়া যাবে না, কাল আসতে হবে।’ তখন এক বৃদ্ধাকে বলতে শুনেছি, ‘বই না পাই, লেখককে একবার দেখব।’ সঞ্জীববাবু ভিতরেই ছিলেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে হয়েছিল।’’
বইমেলা মানে লেখক-পাঠকের মতের আদান-প্রদান। ছাপার অক্ষরের মাধ্যমে পাঠকের সঙ্গে যাঁর সম্পর্ক, তাঁকে হাতের কাছে পাওয়ার সুযোগ করে দেয় কলকাতা বইমেলা। প্রথম মেলার স্মৃতি ঘিরে রেখেছে সাহিত্যিক অভিরূপ সরকারকেও। বলছিলেন, ‘অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের উল্টো দিকে প্রথম বইমেলা যেখানে হয়েছিল, জায়গা ছোট হওয়ায় খুব ভিড় হয়েছিল। এর কয়েক বছর পর বইমেলা ময়দানে সরে যায়। যাইহোক, যখন কলকাতা বইমেলা শুরু হয় তখন আমি কলেজ ছাত্র। বইমেলা নিয়ে বইপ্রেমীদের মধ্যে বিরাট উৎসাহ। শেষ দু’দিন অনেক স্টলে পুরনো বই পাওয়া যেত। তখন ছাত্রজীবন, পকেটে বেশি পয়সা থাকত না। তাই ওই শেষ দু’দিন বই কেনার খুব উৎসাহ থাকত। এরপর বছর পাঁচেক আমি কলকাতায় ছিলাম না। ফিরে এসে ’৮৫ সালের বইমেলায় আবার গেলাম। সেখানেই কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর সঙ্গে প্রথম আলাপ হল। এই সময় আমি টুকটাক কবিতা লেখার চেষ্টা করি। আমার একটা ছোট কবিতার বই বেরিয়েছিল। বইমেলায় আলাপের সূত্রে ওই বইটি পড়ে ভাস্করদা আমাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। সেই পোস্টকার্ডটা এখনও আমার কাছে আছে।’
সাহিত্যিক দেবারতি মুখোপাধ্যায় ছোটবেলার বইমেলার স্মৃতি ভাগ করে নিলেন। বলছিলেন, ‘যখন স্কুলে পড়ি, তখন ময়দানে বইমেলা হতো। বাবার সঙ্গে শেষ শনিবার বইমেলা যেতাম। ট্রেনে করে দমদম পৌঁছতাম, সেখান থেকে মেট্রো ধরতাম। তখন বইমেলা মানেই ছিল প্রচুর ধুলো। বাবা এগিয়ে গিয়েছেন, বই দেখতে গিয়ে আমি পিছিয়ে পড়েছি, এমনটা অনেকবার ঘটেছে। ২-৩ বার হারিয়েও গিয়েছে। শেষে অ্যানাউনসমেন্ট করিয়ে বাবা আমাকে খুঁজে পেয়েছেন। তার জন্য বকুনিও খেয়েছি। ছোটবেলায় কলেজ স্ট্রিট আসার এতটা চল ছিল না। তাই কলকাতা বইমেলা থেকেই সারা বছর বই পড়ার রসদ জোগাড় করতাম।
বইমেলার স্মৃতিচারণা করতে বসে নিজের স্কুল জীবনে ফিরে গেলেন সাহিত্যিক হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত। বলছিলেন, ‘‘আমার বাড়ি মফস্সল শহর কাঁচরাপাড়ায়। তাই ছেলেবেলায় কলকাতা আমার কাছে স্বপ্নের শহর। মনে আছে প্রথম বইমেলায় এসেছিলাম পিসির হাত ধরে। পিসি বই পড়তে খুব উৎসাহ দিতেন। সেই সময় উৎসব-অনুষ্ঠানে বই উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। এখন তো বই উপহার দেওয়ার রীতি প্রায় উঠে যেতে বসেছে। যাইহোক, যখন ক্লাস টেন-ইলেভেনে উঠলাম, তখন বন্ধুরা দল বেঁধে কলকাতা বইমেলায় আসতাম। পকেটে তেমন পয়সা থাকত না, তাই এক-একজন বন্ধু এক-একটা বই কিনতাম, আর পাল্টে পাল্টে পড়তাম। মনে আছে, দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুরন্ত ঈগল’ কিনব, কারও পকেটে অত টাকা নেই। সবাই মিলে টাকা দিয়ে একটা বই কিনেছিলাম। একবার তো শিয়ালদা থেকে হেঁটে ময়দানে বইমেলায় গিয়েছিলাম। হেঁটেই ফিরেছিলাম। পরের দিন পায়ের ব্যথায় স্কুলে যেতে পারিনি।’’
‘আমরা যাঁরা লেখালিখি করি, তাঁদের কাছে কলকাতা বইমেলা একটা প্রবল আকর্ষণ। বইপ্রেমীদের দুর্গাপুজো এই বইমেলা,’ বলছিলেন সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯৭ সালে ভস্মীভূত হয় বইমেলা। সেই ঘটনার স্মৃতি রোমন্থন করে ‘বীরবল’-এর লেখক বললেন, ‘মেলার ষষ্ঠ দিনের ঘটনা। মহাকরণে গিয়েছি একটি সরকারি কাজে। হঠাৎ শুনলাম, বইমেলায় আগুন লেগেছে। ছুটে গেলাম। দাউ দাউ করে মেলা জ্বলছে। প্রকাশক-লেখকরা হাহাকার করছেন। প্রচুর টাকার বই পুড়ে গিয়েছিল। তিনদিনের মাথায় আবার মেলা বসানো হয়েছিল।’
বইমেলায় বসে একরাশ নস্টালজিয়া ঘিরে ধরল লেখক জয়ন্ত দে-কে। বলছিলেন, ‘যখন থেকে বইমেলা যেতে শুরু করি, তখন আমি লেখক নই, নিতান্ত পাঠক। মেলায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, রমাপদ চৌধুরীর মতো প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের দূর থেকে দেখার সুযোগ হত। পরবর্তী সময়ে লেখালিখির সূত্রে এঁদের কাছে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। তাঁদের স্নেহ পেয়েছি। কিন্তু প্রথম দেখার যে স্মৃতি, তা মনের মণিকোঠায় রয়ে গিয়েছে।’
লেখিকা বিনতা রায়চৌধুরী। বলছিলেন, ‘পাবলিশার্স গিল্ড একসময় দুটো করে পুরস্কার দিত। একটি লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট এবং অন্যটি দেওয়া হত প্রতিশ্রুতিবান নতুন লেখককে। যে বছর এই বইমেলায় দ্বিতীয় পুরস্কারটি পেয়েছিলাম, সেই দিনটির কথা খুব মনে পড়ে। যখন লেখালিখি শুরু করি, তখন এই মেলায় নবনীতা দেব সেন, সুচিত্রা ভট্টাচার্যদের মতো সিনিয়রদের সান্নিধ্য পেয়েছি। সেই স্মৃতি আজও তাজা।’ দেখতে দেখতে ৪৯ বছর পার করে ফেলল কলকাতা বইমেলা। বহু বছর আগেই পেয়েছে ‘আন্তর্জাতিক’ শিরোপা। আগামী বছর সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ। আরও বড় আয়োজনের অপেক্ষায় লেখক ও পাঠকরা।