


সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: দীঘা থেকে কলকাতায় আসার বাস। একদিকে পাশাপাশি তিনটি সিট। অন্যদিকে দু’টি। দুর্ভাগ্যক্রমে দেখা গেল আসন বরাদ্দ হয়েছে তিন সিটের মধ্যবর্তীতে। নির্দিষ্ট আসনে বসে বাস ছাড়ার অপেক্ষা। দু’পাশের দুই সহযাত্রী ততক্ষণে মগ্ন নিজেদের মোবাইলে। একজনের ফোনে খোলা ফেসবুক। সেখানে একটা ভিডিও চলছে। বিষয় রাজ্য রাজনীতি। ওই বিষয়ে পর পর ভিডিও এসেই চলেছে। অন্য সহযাত্রী মজে ইনস্টাগ্রামে। যন্ত্রের মতো ফিড স্ক্রল করে চলেছেন। তাতে সম্ভবত মন ভরছে না। তাই সুইচ করে গেলেন রিলস সেকশনে। কখনও দক্ষিণী সিনেমার ক্লিপ, কখনও পুষ্টিকর স্যালাড তৈরির রেসিপি, কখনও বা বাতিল জিনিসপত্র দিয়ে ঘর সাজানোর উপকরণ তৈরি—একের পর এক ভিডিও এসেই চলেছে। বিষয়ের সাযুজ্য না থাকলেও ভদ্রলোক হাঁ করে রিল দেখে যাচ্ছেন। হেডফোন নেই। ফলে আশপাশের সহযাত্রীদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই ভিডিওর জ্ঞান শুনতে হচ্ছিল। শেষে একজন হেডফোন ব্যবহারের পরামর্শ দিলে কিছুটা বিরক্ত হয়ে তিনি সাউন্ড অফ করে রিল দেখতে থাকলেন। তখন স্ক্রিনে একটি পরিচিত হিন্দি সিনেমার দৃশ্য চলছে। অক্ষয় কুমার হাত-পা নাড়িয়ে হেসে চলেছেন। মিউট করা সেই ভিডিও দেখে ভদ্রলোকের মুখেও হাসি। বাকি রাস্তাটা ওইভাবেই কাটিয়ে দিলেন তিনি। জানলার ধারের সহযাত্রী ততক্ষণে রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে পা রেখেছেন প্রতিবেশী দেশে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিষয়ক একটি খবর চলছে তাঁর ফেসবুক ভিডিওতে। এরপর পদ্মাপারের একের পর এক ভিডিও চলছেই। আচমকা বাস থেকে সবাই নামছে দেখে নড়েচড়ে বসে পর্দা সরালেন জানলার। চোখের সামনে ধর্মতলা। চিৎকার করে কনডাক্টরকে ডাকলেন। বাস যখন হাওড়ায় ছিল, তখন কেন তাঁকে ডাকা হয়নি, বলে রীতিমতো চোটপাট শুরু করলেন ভদ্রলোক। কনডাক্টর নির্বিকার মুখে বললেন, ‘ডেকেছিলাম, আপনি শুনতে পাননি বোধহয়। কিন্তু বাইরেটাও দেখলেন না একবার! জানলার পাশেই তো বসেছেন...।’ কান থেকে ওয়্যারলেস হেডফোন খুলে বক্সে ভরে গজগজ করতে করতে নেমে গেলেন ভদ্রলোক। উল্টো পথের বাস ধরতে হবে। মোবাইলে তখনও একটা ভিডিও চলছে। সাদা শার্ট, নীল স্যুট পরিহিত এক যুবক অ্যাঙ্কর রীতিমতো যুদ্ধের মেজাজে মৌলবাদীদের একের পর এক সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে চলেছেন।
অদ্ভুত এক নেশা। স্টেশনে বসে থেকেও ট্রেনে ওঠা হয় না, নির্দিষ্ট স্টপে নামতে ভুলে যাই আমরা, তবু হুঁশ ফেরে না। উল্টে সস্তায় পাওয়া ইন্টারনেটের দৌলতে এই ডিজিটাল নেশায় ডুবে আরও বেশি বেশি করে ডুবে যাই। পারিবারিক গেট টুগেদারে বহুকাল পর দেখা হওয়া পিসতুতো দাদার সঙ্গে কথা বলা বা মাসতুতো দিদির পুঁচকে মেয়েকে কোলে নেওয়ার থেকে অনেক বেশি দরকারি হয়ে ওঠে ফেসবুক-ইনস্টা অ্যাকাউন্ট চেক করা। ডেটে যাওয়া প্রেমিক-প্রেমিকারা মুখোমুখি বসেও কেউ কারও সঙ্গে বিশেষ কথা বলে না। দু’জনেই আটকে থাকে দুটো আলাদা স্ক্রিনে। এসির হাওয়ায় ঠান্ডা হতে থাকে সামনে রাখা খাবার, কফি। কিন্তু ফোন থেকে ফুরসত মেলে না। উপায় কী! আত্মীয়রা ছিল-আছে-থাকবে। প্রেম থাকলে ভালো, নাহলে ফের আসবে। কিন্তু ফোন না দেখলেই তো কিছু না কিছু মিস হয়ে যাবে যে! তাই প্রতি মুহূর্তে ফিড রিফ্রেশ করতে ব্যস্ত সবাই।
আর এভাবেই আমরা ক্রমাগত আক্রান্ত হচ্ছি ‘ফোমো’তে (ফিয়ার অব মিসিং আউট)। প্রতি মুহূর্তে হারিয়ে যাওয়ার ভয়। পিছিয়ে পড়ার ভয়। এই ভয়ের ওষুধ একটাই—প্রতি মুহূর্তে স্ক্রিনে ডুবে থাকা। সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও দেখা ও গেম খেলার জন্য প্রতিদিন গড়ে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ব্যয় করে। আর এর মধ্যে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য বরাদ্দ গড়ে ২ ঘণ্টা ২৮ মিনিট।
এখানেই অ্যালগরিদমের সাফল্য। আপনি কোন পোস্ট, ভিডিও বা বিজ্ঞাপন দেখবেন, তা আসলে আপনার হাতে নেই। তা ঠিক করছে নেপথ্যে চলছে থাকা এক জটিল অঙ্ক। আপনার আচরণ, আগ্রহ এবং বিভিন্ন কমেন্ট বিশ্লেষণ করে। সহজ ভাষায় এটা একটা ‘স্মার্ট ফিল্টার সিস্টেম’। আপনার লাইক, শেয়ার, কমেন্ট, ভিউ টাইম ট্র্যাক করে এই অ্যালগরিদম ঠিক করে নেয় আপনার পছন্দ। তারপর আপনার ফিডে নির্দিষ্ট ধরনের কন্টেন্ট দেখানো এই অ্যালগরিদমের বাঁয়ে হাত কা খেল।
একটু গভীরে যাওয়া যাক। এই অ্যালগরিদমের প্রথম ধাপ তথ্য সংগ্রহ। মানে আপনি কোন ধরনের কন্টেন্ট বেশি দেখেন, কোন পোস্টে লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার করেন, কোন ধরনের পেজ বা গ্রুপে কাদের সঙ্গে বেশি কথা বলেন, কোন ধরনের ভিডিও কতটা দেখেন, তার একটা তালিকা তৈরি করা। পরের ধাপ প্রেডিকশন। অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর আচরণ দেখে কার কী পছন্দ, তা অনুমান করে। ধরুন আপনার পছন্দের বিষয় রাজনীতি। আপনি যদি রাজনীতি বিষয়ক ভিডিও বেশি দেখেন, অ্যালগরিদম ধরেই নেয় এই ইউজার এই ধরনের ভিডিও পছন্দ করে। তাকে আরও রাজনীতির কন্টেন্ট দেখালে সে অনেকটা বেশি সময় ফেসবুকে কাটাবে! এরপরে আসে কন্টেন্ট র্যাঙ্কিং। ব্যবহারকারীর ফিডে আসা সমস্ত পোস্ট বা ভিডিওকে একটি নম্বর দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে যদি রাজনীতি বিষয়ক ভিডিও ৯০ শতাংশ নম্বর পায়, তাহলে রান্নার ভিডিও পাবে ১০ শতাংশ। আর যে সমস্ত কন্টেন্টের স্কোর বেশি হয়, সেগুলি উপরের দিকে থাকে। এর সঙ্গেই থাকে টেস্টিং ও অ্যাডজাস্টমেন্ট। এর মধ্যে দিয়ে চলে স্বাদবদলের পরীক্ষানিরীক্ষা। মাঝে মধ্যেই ব্যবহারকারীর ফিডে নতুন ধরনের কন্টেন্ট দিয়ে একটি পরীক্ষা চালায় ফেসবুক। রাজনীতির ভিডিও দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা ট্রাভেল ভিডিও দেখালে আপনি কি স্টপ করেন নাকি স্কিপ করেন, সেই হিসেবও রাখে অ্যালগরিদম। এর সঙ্গে সঙ্গেই তৈরি করে ফিল্টার বাবল বা ইকো চেম্বার এফেক্ট। অর্থাৎ আপনি যখনই ফেসবুক খুলবেন, বেশিরভাগ সময়েই ফিডে হাজির হবে রাজনীতি বিষয়ক কন্টেন্ট। অন্য কোনও কন্টেন্ট ফিডে বিশেষ আসবে না। আপনি কোনও ভিডিওতে কী ধরনের মন্তব্য করছেন, সেগুলি লাইক বা শেয়ার করছেন কি না, সেই সব মিলিয়েই তৈরি হয় পার্সোনালাইজড ফিড। সঙ্গে বাড়তে থাকে ক্লিকবেট ট্র্যাপও। ক্রোনোলজিটা বোঝা গেল!
আসলে সোশ্যাল মিডিয়া আমাকে, আপনাকে... প্রত্যেকটা মানুষের জন্য তৈরি করছে পছন্দসই মতাদর্শের একটা দুনিয়া। সেই দুনিয়ায় ভিড় বাড়ছে চেনা-কম চেনা-অচেনা মানুষদের। ফ্রেন্ড সাজেশনেও তাঁদেরই আধিক্য। এটা আসলে আইডিওলজির একটা মায়া-জগৎ, যা একই ধরনের মনোভাবাপন্ন মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে নির্দিষ্ট মতাদর্শের বালতিতে চোবাচ্ছে। তুলছে। কে কতটা বদলাল, নিক্তিতে তার হিসেব কষে আবার চোবাচ্ছে। এভাবেই চলছে প্রতিদিন!
অ্যালগরিদমের এই সুতোর টানে কলের পুতুলের মতো নড়ছি আমরা। একই পাড়ায় থাকা দুটো মানুষ ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ক্রমশ সরে যাচ্ছে দুটো পৃথক মেরুতে। নিজেদের অজান্তেই। এরপর একদিন টিপিং পয়েন্ট আসে। ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে ফুটবল খেলা, দুর্গাপুজো-ঈদ কাটিয়ে বড় হয়ে ওঠা দুই বন্ধু গ্রুপে বিদ্বেষ ভাষণ শেয়ার করে। একে অপরের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। পরস্পরকে আক্রমণের ভাষা কুৎসিত থেকে কুৎসিততর হয়ে ওঠে। তারপর একজন গ্রুপ ছেড়ে চলে যায়। অন্যজন তাঁকে মোবাইলে ব্লক করে। রাস্তায় দেখা হলেও কেউ কাউকে দেখে হাসে না। দু’চোখে থাকে শুধুই ঘৃণা আর অবিশ্বাস। ওদিকে আবার নতুন বন্ধু জুটে যায়। তাঁদের কেউ কেউ সাবাস, কেয়া বাত বলে পাশে থাকার বার্তা দেয়। কেউ বিদ্বেষ ভাষণের স্বপক্ষে আরও চারটে লাইন লেখে। পাল্টা কেউ কিছু বললে দেখে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলে। তার পরদিন আরও জবরদস্ত সব খবর, ভিডিও আসতে থাকে ফিডে। অ্যালগরিদমের দৌলতে। আমরা আরও বেশি বেশি করে ডুবে যাই সোশ্যাল মিডিয়ার নেশায়।
এই তীব্র নেশা থেকে মুক্তির উপায়? সহজ রাস্তা—অতীত মুছে নিজেকে বদলে ফেলা। অর্থাৎ আপনার প্রোফাইলের হিস্ট্রি ডিলিট করার পাশাপাশি কী ধরনের কন্টেন্ট আপনি দেখতে চান সেই পছন্দের তালিকাতেও বদল আনা। কিছু বিষয়, যা ক্রমশ আপনার মধ্যে উগ্র নেশার জন্ম দিচ্ছে, সেই সব পোস্ট-ভিডিও-রিলের উৎসগুলিকে আনফলো করা, হাইড করে দেওয়া। কারণ স্মার্টফোন ছাড়া আমাদের চলবে না। আর এই নেশা কাটানোর জন্য কোনও নেশামুক্তি কেন্দ্রের ঠিকানা দেওয়ালে বা ট্রেনের দরজার উপরে সাঁটাও থাকে না। আপনার ভরসা আপনি নিজেই।