


প্রতি মুহূর্তের আপডেট সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনুমতি ছাড়াই দেদার ব্যবহার হচ্ছে আপনার ছবি। কী করবেন, আইন কী বলছে? পরামর্শে সাইবার ক্রাইম ফ্যাসিলিটেটর রুদ্রপ্রসাদ পন্ডা।
ঘটনা ১: ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল স্ক্রলিং রিমার অভ্যাস। আজও তা-ই করছিল। আচমকা নোটিফিকেশন। সুস্মিতার মেসেজ। চমকে উঠল রিমা। তার বিকৃত ছবি। ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। একের পর এক শেয়ার, কমেন্টের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। অথচ রিমা জানে, এই ছবি তার নয়। সূক্ষ্মভাবে না দেখলে বোঝার উপায়ও নেই।
ঘটনা ২: রাহুলের ছবি লাগানো একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে মেসেজ পেয়ে ঘাবড়ে গিয়েছিল সুমিত। লেখা,‘বাবাকে হাসপাতালে ভরতি করতে হয়েছে রে। ২৫ হাজার টাকা পাঠাবি প্লিজ।’ পাঠাতেই যাচ্ছিল। কী মনে হল, একবার ফোনই করল। রাহুল তখন ঘুমের ঘোরে। শুনে বলল, আমার বাবা তো খবরের কাগজ পড়ছেন। একদম সুস্থ রয়েছেন। সুমিত বুঝল, রাহুলের ছবি ব্যবহার করে অন্য কেউ অ্যাকাউন্টটি খুলেছিল।
ডিজিটাল যুগে এমন ঘটনা আর বিরল নয়। স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতার কারণে এখন কারও ছবি সংগ্রহ করা, এডিট করা বা অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা আগের চেয়ে অনেক সহজ। কিন্তু প্রযুক্তি যত সহজ হয়েছে, ততই বেড়েছে অপব্যবহারের আশঙ্কা। অনেকেই মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ছবি পোস্ট করা হলেই, তা যে কেউ ব্যবহার করতে পারেন। বিনা অনুমতিতে। যে কারও ছবি, ভিডিয়ো ছড়িয়ে দেওয়া যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। তার ফলে সম্মানহানি থেকে প্রতারণা— সবই বাড়ছে। সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বটতলা’ হোক বা মীনা কান্দাসামির নতুন উপন্যাস ‘ফিল্ডওয়ার্ক অ্যাজ আ সেক্স অবজেক্ট’— এমন ঘটনার উদাহরণ অসংখ্য। কেবল সাধারণ মানুষ? না। রশ্মিকা মন্দানা হোক বা আলিয়া ভাট, শাহরুখ খান থেকে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বহু তারকাও এর শিকার। তবে জানেন কি, এভাবে অনুমতি ছাড়া কারও ছবি ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।
ছবি একজন মানুষের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ছবির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর ব্যক্তিত্ব, সম্মান, সামাজিক অবস্থান এবং ব্যক্তি গোপনীয়তা। তাই কারও অনুমতি ছাড়া তাঁর ছবি ব্যবহার করলে কেবল নৈতিকতার প্রশ্নই ওঠে না, অনেক ক্ষেত্রে তা আইনি জটিলতাও তৈরি করে। বিশেষ করে কোনো ছবি যদি অসম্মানজনক, বিভ্রান্তিকর বা আর্থিক প্রতারণার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক সম্পর্ক, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এআই বর্তমানে ছবি এডিটের ধারণাই সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে কারও মুখ অন্য কারও শরীরে বসিয়ে ভুয়ো ছবি বা ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এই ধরনের ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তি যেমন বিনোদনের জন্য ব্যবহার হতে পারে, তেমনই তা অপরাধের হাতিয়ারও হয়ে উঠছে। বাড়ছে ব্ল্যাকমেলিংয়ের প্রবণতা।
আইন কী বলছে?
ভারতে কারও অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা, ব্যবহার করা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া পরিস্থিতি অনুযায়ী অপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে কতগুলি আইনও রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি আইন:
ধারা ৬৬ই (গোপনীয়তা লঙ্ঘন)
কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত বা গোপন ছবি তাঁর অনুমতি ছাড়া তোলা, প্রকাশ করা বা অন্যের কাছে পাঠানো অপরাধ। এই জন্য সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড ও ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
ধারা ৬৭ ও ৬৭এ
অনুমতি ছাড়া কোনো অশ্লীল ছবি বা ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিলে এই ধারাগুলি প্রযোজ্য হতে পারে। এতে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
ভারতীয় ন্যায় সংহিতা
ধারা ৭৭
কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও তাঁর সম্মতি ছাড়া রেকর্ড করা বা অন্যের কাছে পাঠানো অপরাধ। এমনকি প্রথমে ছবি তোলার অনুমতি থাকলেও পরে অনুমতি ছাড়া তা প্রকাশ করলেও এই ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।
ধারা ৭৯
কোনো নারীর মর্যাদা বা শালীনতায় আঘাত করার উদ্দেশ্যে তাঁর ছবি ব্যবহার, প্রকাশ বা অপমানজনক আচরণ করলে এই ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।
ধারা ৩৫৬
কোনো ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে তাঁর সম্মানহানি করলে, তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা যেতে পারে।
ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন আইন, ২০২৩
এই আইনে ছবি একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য হিসেবে ধরা হয়। তাই কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তাঁর ছবি সংগ্রহ, ব্যবহার বা অন্যের সঙ্গে ভাগ করলে আইন লঙ্ঘন হতে পারে। প্রমাণিত হলে ডেটা প্রোটেকশন বোর্ড সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড়ো অঙ্কের আর্থিক জরিমানা আরোপ করতে পারে।
এক্ষেত্রে ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদও মাথায় রাখা প্রয়োজন। প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার রয়েছে। ফলে অনুমতি ছাড়া ছবি ব্যবহৃত হলে এই মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হয়। আবার অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া কোনো শিশুর ছবি বাণিজ্যিক বা অসাধু উদ্দেশ্যে শেয়ার করাও অপরাধ হিসাবে গণ্য হয়। কোনো ব্যক্তির কাজ, আর্ট ওয়ার্ক অনুমতি ছাড়া পোস্ট করলে কপি রাইট আইনে মামলা হতে পারে।
বহু তারকার ছবি বাণিজ্যিক ভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যবহার হয়। এতে তারকাদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হয় অনেকক্ষেত্রে। সে কারণে সম্প্রতি বহু তারকা পার্সোনালিটি রাইট সংরক্ষণের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। সলমন খান, হৃতিক রোশন, ঐশ্বর্য রাই বচ্চন সহ বহু তারকা রয়েছেন এই তালিকায়। পার্সোনালিটি রাইট সংরক্ষিত হলে তাঁদের ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া কোনোভাবেই প্রকাশ করা যাবে না। এমনকি এডিট করা যাবে না কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে। সদ্য অভিনেত্রী প্রীতি জিন্টা এআই ব্যবহার করে তৈরি তাঁর একাধিক বিকৃত ছবি গুগল, মেটা থেকে সরিয়ে
নেওয়ার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হন। বম্বে হাইকোর্ট তাঁর পক্ষেই রায় দিয়েছে।
এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় উল্লেখ্য। ২০২৫ সালে একটি মামলায় শীর্ষ আদালত বলেছিল, ব্যক্তিগত মুহূর্ত বাদ দিয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রে কোনো মহিলার ছবি, ভিডিয়ো পোস্ট করলে তা সবসময় অপরাধ হবে না। কী উদ্দেশ্যে তা করা হয়েছে, এক্ষেত্রে বিবেচ্য।
ভুক্তভোগী হলে কী করবেন?
যদি দেখেন আপনার ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে প্রমাণ সংগ্রহ করুন। পোস্টের স্ক্রিনশট নিন, যে প্রোফাইল থেকে ছবিটি শেয়ার হয়েছে, তার ইউআরএল লিঙ্ক সংগ্রহ করুন। এর মাধ্যমেই বোঝা যায় ওই অ্যাকাউন্ট কোন ডিভাইসে খোলা আছে। পাশাপাশি কখন কোথায় ছবি প্রকাশ হয়েছে তা নোট করে রাখুন। এরপর সংশ্লিষ্ট সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানাতে পারেন। প্রয়োজনে জাতীয় সাইবার অপরাধ পোর্টাল বা নিকটবর্তী থানায় অভিযোগ দায়ের করা যায়। গুরুতর ক্ষেত্রে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়াও সম্ভব।
ব্যবহারকারীদেরও সচেতন হতে হবে
অনেক সময় মানুষ না বুঝেই অন্যের ছবি শেয়ার করে দেন। মনে করেন, ইন্টারনেটে আছে মানেই ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। যাচাই না করে কোনো ছবিই শেয়ার করা উচিত নয়। অন্যের ছবি দিয়ে মজা করা, ট্রোল করা বা ভুয়ো তথ্য ছড়ানো নানা সময় আইনি জটিলতার কারণও হতে পারে।
প্রযুক্তির সঙ্গে বাড়ুক দায়িত্ববোধ
একটি ছবি মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। সেই ছবিই আবার কারও সম্মান নষ্ট করতে পারে, সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারে বা মানসিক আঘাতের কারণ হতে পারে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ‘শেয়ার’ বা ‘পোস্ট’ করার আগে কয়েক সেকেন্ড ভেবে নেওয়াই সবচেয়ে বড়ো সতর্কতা। প্রযুক্তি যত এগবে, ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার গুরুত্বও তত বাড়বে।
শান্তনু দত্ত