


সুকান্ত বসু, কলকাতা: পুজোর সময় মানুষ নতুন জামাকাপড় কেনেন। ঘর সাজান। মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দেখেন। কিন্তু যাঁরা পটুয়াপাড়া থেকে লরি বা ট্রাকে প্রতিমা তুলে মণ্ডপে পৌঁছে দেন, সেই শ্রমিকরা থাকেন অন্ধকারেই। পুজোর সময় সাধারণ মানুষ যখন আনন্দে মশগুল থাকেন, তখন প্রতিমা বহনকারী সঞ্জয় সাউ, আনন্দ মণ্ডল, অনন্ত মালাকার, আবু হোসেনরা খিদের জ্বালা মেটাতেই ব্যস্ত থাকেন। অভাবের সংসারে তাঁদের নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা।
শনিবার ভরদুপুরে বিভিন্ন মণ্ডপে লক্ষ্মী প্রতিমা পৌঁছে দেওয়ার আশায় রবীন্দ্র সরণি, কুমোরটুলি স্ট্রিট, বনমালী সরকার স্ট্রিটের আশপাশে দাঁড়িয়েছিলেন প্রতিমা বহনকারীরা। কে আগে প্রতিমা ধরবেন, তা নিয়েই তাঁদের মধ্যে চলে প্রতিযোগিতা। তাদের কারও হাতে দড়ি, কারও হাতে বাঁশ, কারও হাতে কাঠের বাটাম। প্রতিমা বহনে এই সব সরঞ্জামই তাঁদের হাতিয়ার।
সারা বছর এই শ্রমিকরা দুর্গাপুজোর দিকেই তাকিয়ে থাকেন। এই মরশুমে বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে জোটে বড়জোর ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। কিন্তু তা দিয়ে তো আর সংসার চলে না! বছরের অন্য সময় তাঁরা পড়ে থাকেন কলকাতার রাজপথের ফুটপাতে। মাল বহন করাই তাঁদের পেশা। খাবার বলতে রাস্তার ধারে কখনও ছাতু, কখনও রুটি-সবজি আবার কখনও ভাত-ডাল-সবজি। তাঁরা জানালেন, লক্ষ্মীপুজো মিটে গেলেই বাড়ি ফিরবেন। পটুয়াপাড়ায় ফের আসবেন কালীপুজোর দিন তিনেক আগে। মণ্ডপে প্রতিমা পৌঁছে দিতে হবে তো! তারপর জগদ্ধাত্রী পুজোর জন্য অপেক্ষা।
সামসেরগঞ্জের বাসিন্দা মহম্মদ সাদিক হোসেন কথা প্রসঙ্গে বললেন, ‘পুজোর মরশুমে প্রতিমা বহনের কাজ করি। বাকি সময় অন্যের জমিতে চাষের কাজ করি। বাবা অসুস্থ, মাও বয়সের ভারে আর কাজ করতে পারেন না। তাঁদের ওষুধের টাকা জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয়। দুর্গাপুজোর সময় যে টাকা রোজগার করি, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার সামাল দেওয়া যায়।’ ক্যানিং থেকে এসেছেন প্রশান্ত সামন্ত। তিনি বলেন, ‘তাঁর দুই ছেলে‑মেয়ে। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা‑মা রয়েছেন। তাঁদের দেখাশোনা, ছেলে‑মেয়েদের খরচ চালাতে কালঘাম ছুটে যায়। পুজোর সময় দু’পয়সার আশায় পটুয়াপাড়ায় পড়ে থাকি।’ তাঁদের কথায়, অভাবের সংসার। পুজোর সময় বাড়িতে কাউকেই নতুন জামাকাপড় কিনে দিতে পারি না। তাই পুজোয় বাকিরা আনন্দ করলেও আমাদের জীবন পড়ে থাকে অন্ধকারেই।