


সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, চাকদহ: সন্ধ্যা নেমেছে। পালপাড়া স্টেশনের পাশের রেলগেটের কাছে গোল হয়ে ভিড় জমিয়েছেন প্রায় দেড়-দুশো মানুষ। নির্বাচনি প্রচার কি? এগতেই ভুল ভাঙল। ভিড় ঘেরা বৃত্তের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনটি ছেলে। কমবয়সি। তিনজনেরই পরনে কালো গোলগলা গেঞ্জি। জিনসের উপরে সাদা হাফ প্যান্ট। একজনের মাথায় অদ্ভুতদর্শন টুপি। সেই টুপির দু’পাশে লাগানো দু’টি লম্বা কান। ঘোড়ার মতো। বড়ো একটা ডাফলি বাজাচ্ছে তাদের একজন। আর ডাফলির তালে তালে চলছে পথনাটিকা। একটু দাঁড়াতেই বোঝা গেল, এসআইআরের কোপে নাজেহাল বাংলার আম জনতাই ‘বোকারাম’ পথনাটিকার বিষয়বস্তু।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার মধ্যে অন্যতম চাকদহ বিধানসভা। এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে বড়ো অংশই ওপার বাংলা থেকে আসা শরণার্থী। এক সময় ইতিহাসের নির্মম অভিঘাতে বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষগুলির জীবন ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়েছে। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে এই অপরিকল্পিত এসআইআর প্রক্রিয়ার জেরে আবার তাঁদের অস্তিত্বের শিকড়ে টান পড়েছে। ভিটেমাটির অধিকার নিয়ে তৈরি করছে বিভ্রান্তি, ভয় ও অসন্তোষ। বাদ যাননি এই এলাকায় থাকা মতুয়ারাও। এসআইআরের কোপে তাঁদেরও অনেকের নাম মুছে গিয়েছে ভোটার তালিকা থেকে। কাগজ হাতে লাইন দিতে হয়েছে নাম তোলার জন্য। অপরিকল্পিত এসআইআর যেভাবে এই অঞ্চলের মানুষের নাগরিকত্বের পরিচয়কেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে, পথনাটিকার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সেই যন্ত্রণাকে ফুটিয়ে তুলেছেন তিন কুশীলব সুশোভন মান্না, তিতুমীর দত্ত ও কুণাল চক্রবর্তী।
এসআইআরকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে যে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এই পথনাটিকার মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে সরব হতেই স্থানীয় স্তরে এই উদ্যোগ নিয়েছে চাকদহ পুর কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। পথনাটিকা দেখার ভিড়ে ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা সঞ্জিত ঘোষ। বলছিলেন, ‘পথনাটিকায় যে কথাগুলি বলা হচ্ছে, কিছুটা রূপক অর্থে হলেও বিষয়টা ভীষণ প্রাসঙ্গিক। মনে হচ্ছে যেন বাঙালিকে বোকারাম বানিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। দিকে দিকে এত মানুষ স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন জানাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের উচিত এগিয়ে এসে এর দায়িত্ব নেওয়া।’ নাটকের অন্যতম উদ্যোক্তা রথীন্দ্রনাথ দে’র কথায়, ‘নির্বাচন কমিশন কি সত্যিই দেশের সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব পালন করছে? নাকি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করছে? এই প্রশ্নই এখন আমাদের মনে।’ মেয়েকে নিয়ে পথনাটিকা দেখতে দাঁড়িয়েছিলেন গৃহবধূ অনামিকা সরকার। পরিবারের সদস্যদের নাম তালিকায় থাকলেও বাদ পড়েছে তাঁর গৃহ সহায়িকার নাম। ক্ষোভ উগরে দিয়ে অনামিকা বলেন, ‘নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি শুধুই টেকনিক্যাল এরর হতে পারে না।’
এসআইআরের জন্য মানুষকে যেভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে, তা নিয়ে সরব হয়েছেন চাকদহ বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী শুভঙ্কর সিংহ (যীশু)। তিনি বলেন, ‘বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার সাধারণ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। মানুষের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হয়েছে। বাংলার মানুষের অধিকার রক্ষায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত ছুটে গিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মানুষ এই সব কিছুই ভোট দেওয়ার সময় মনে রাখবে।’
উদ্যোক্তারা আরও জানিয়েছেন, অনেক দর্শকই ‘বোকারাম’-এর মধ্যে নিজের জীবনের সমস্যা, অনিশ্চয়তার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন। ভোটার তালিকায় নাম থাকা নিয়ে উদ্বেগে আছেন, এমন অনেকেই পথনাটিকা শেষে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন। চাকদহ বিধানসভার সমস্ত ওয়ার্ডেই এই পথনাটিকা অনুষ্ঠিত হবে। নিজস্ব চিত্র