


‘বাঙালির দ্বারা ব্যবসা হয় না’, ‘বাঙালির রক্তে ব্যবসা নেই’, ‘বাঙালি ব্যবসাবিমুখ’ — এসব অনেকে বলে থাকেন। কিন্তু অতীতের দিকে তাকালে কথাগুলো ঠিক মেনে নেওয়া যায় না। বাঙালির বাণিজ্য উদ্যোগের একাধিক সাক্ষ্য রয়েছে ইতিহাসের পাতায়। তবে এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, জীবিকা-নির্বাহের উপায় হিসেবে বণিকবৃত্তি কোনওদিনই বাঙালির প্রথম পছন্দ ছিল না।
সভ্যতার আদিকাল থেকে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের জন্য লড়াই করে চলেছে মানুষ। রুজি-রোজগারের তাগিদে বেছে নিয়েছে বিভিন্ন কৌলিকবৃত্তি। কৃষিকাজকে প্রাধান্য দিয়েছে বাঙালি। সেটা সঙ্গত কারণেই। এ দেশের মাটি সরস। জল পর্যাপ্ত। বঙ্গ দেশে সামান্য আয়াসেই সোনার ফসল ফলে। সহজেই গোটা পরিবারের সম্বৎসরের আহার জুটে যায়। ভূমিআশ্রিত জীবনযাপনে নিরাপত্তা বেশি। ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। আমবাঙালির উচ্চাকাঙ্ক্ষাও কম। খেয়ে-পরে জীবনটা একরকম কেটে গেলেই হল। তাছাড়া অতীতের বাঙালি সমাজের দৃষ্টিতে বাণিজ্যের চেয়ে কৃষিকাজই গৌরবজনক বৃত্তি বলে স্বীকৃত ছিল। বণিকদের দেখা হতো একটু খাটো চোখে। এসব নানা কারণে হয়তো ‘বাণিজ্য বসতে লক্ষ্মী’— কথাটা ঐতিহ্যগতভাবে আমবাঙালিকে তেমন আকৃষ্ট করেনি।
তবুও লক্ষ্মীলাভের আশায় বাণিজ্যে ব্রতী হয়েছেন একশ্রেণির বাঙালি। অনিশ্চয়তাকে উপেক্ষা করে মেতেছেন লক্ষ্মীর সাধনায়। এঁরা ব্যতিক্রমী। তাম্রলিপ্ত বন্দর-নগরীর সমৃদ্ধি মনে করিয়ে দেয় প্রাচীনযুগে বাঙালির বাণিজ্য উদ্যোগের কথা। মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্যের নায়ক হয়ে ওঠেন চাঁদ সওদাগর, ধনপতি, শ্রীমন্ত। পর্তুগিজ পর্যটক বারবোসা এদেশে এসে দেখেন রপ্তানি বাণিজ্যে বাঙালি বণিকের জয়জয়কার। সপ্তগ্রামকে সমৃদ্ধশালী বন্দর বলেছেন ইতালীয় পর্যটক সিজার ফ্রেডেরিক। একদা সপ্তগ্রামে ছিল অনেক বিত্তবান বাঙালি বণিকের বসবাস। তার সাক্ষ্য দিয়েছেন ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-এর কবি। তিনি লিখেছেন—
‘হিরণ্য-গোবর্ধন নামে দুই সহোদর।
সপ্তগ্রামে বার লক্ষ মুদ্রার ঈশ্বর।।’
ইংরেজ বণিকেরা যখন সুতানুটি-কলকাতা-গোবিন্দপুরে ঘাঁটি গাড়ল, তখন তাদের মালপত্র বাজারে বিক্রির জন্য স্থানীয় মানুষজনের সাহায্যের প্রয়োজন হল। এই কাজে নেমে বেশ কয়েকজন ভাগ্যান্বেষী বাঙালি রাতারাতি বিত্তবান হয়ে উঠলেন। নন্দরাম সেন, জনার্দন শেঠ এঁদের প্রতিনিধি। প্রাক্পলাশি যুগে ইংরেজ সান্নিধ্যে আসা আরও কয়েকজন সফল উদ্যোগপতির নাম করতে হয়। বৈষ্ণবচরণ শেঠ, পঞ্চানন কুশারী, লক্ষ্মী ধর, শোভারাম বসাক, নয়নচাঁদ মল্লিক, শুকদেব মল্লিক প্রমুখ। দালাল, গোমস্তা, বেনিয়ান, দাদনি বণিক, কোম্পানির ঘরে অর্ডারি মাল সরবরাহ, জাহাজের মালখালাস ও জাহাজে মাল বোঝাই মোটামুটি এই যোগসূত্রেই বাঁধা ছিল কোম্পানির সঙ্গে তাদের সম্পর্কও বিত্তলাভের উৎস।
পলাশি-উত্তর পর্বে অন্য একদল বাঙালি বিত্তবান লোকের নাটকীয় উত্থান হল। এঁদের মধ্যে মুখ্য চরিত্র হলেন, ক্লাইভের স্নেহধন্য রামচাঁদ রায় ও নবকৃষ্ণ দেব এবং ওয়ারেন হেস্টিংসের স্নেহধন্য কৃষ্ণকান্ত নন্দী ও গঙ্গাগোবিন্দ সিং। পলাশির যুদ্ধের সময় ফোর্ট উইলিয়ামের দেওয়ান ছিলেন রামচাঁদ। মাইনে ষাট টাকা। মৃত্যুর সময়ে তাঁর সম্পত্তির মূল্য ছিল এক কোটি পঁচিশ লক্ষ টাকা। নবকৃষ্ণও ছিলেন ষাট টাকা মাইনের মুনশি। পলাশির যুদ্ধের কিছু পরে মায়ের শ্রাদ্ধে খরচ করেছিলেন ন’লাখ টাকা। হেস্টিংসের আশীর্বাদ মাথার উপরে থাকায় খুব অল্প সময়ে কৃষ্ণকান্ত নন্দী ও গঙ্গাগোবিন্দ সিংহের চমকপ্রদ আর্থিক উন্নতি হয়েছিল। তবে এঁদের অর্জিত সম্পদের সবটা যে সোজা পথে আসেনি সেটা অবশ্য বলার অপেক্ষা রাখে না। খানিকটা সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে এরা পাহাড়প্রমাণ অর্থ পুঞ্জীভূত করেছিলেন কিন্তু সেই পুঁজিকে অবলম্বন করে এদের বংশধরেরা বড় কোনও উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারেননি।
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ভূসম্পত্তিতে ব্যক্তি মালিকানার সৃষ্টি করেছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করার জন্য মেলা পরিশ্রম, হুড়োহুড়ি, দৌড়াদৌড়ি প্রয়োজন। লোকসানের ঝুঁকিও রয়েছে এতে। নেটিভ হয়ে প্রতি মুহূর্তে শাসক সাহেবদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পাল্লা দেওয়াও সহজ কাজ নয়। সে তুলনায় জমিদারিতে ঝামেলা কম। উনিশ শতকের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তাই অধিকাংশ বিত্তবান বাঙালি বাণিজ্যের পরিবর্তে জমিদারিতে অর্থলগ্নিকে নিরাপদ মনে করলেন। উদ্যোগপতি না হয়ে বিত্তবান বাঙালি হল জমিদার।
নবজাগরণ এল। পাশ্চাত্যের মুক্ত চিন্তা ও আধুনিক শিক্ষার সুবাতাস বইতে লাগল বাংলায়। এ সময় চলতি স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার কেটে বেশ কয়েকজন বাঙালি লক্ষ্মীসাধনায় নিবেদিত হলেন। সাফল্যও পেলেন। তালিকাটা নাতিদীর্ঘ নয়। রামদুলাল দে, দ্বারকানাথ ঠাকুর, মতিলাল শীল, রামগোপাল ঘোষ, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রমোহন বোস, ইন্দুমাধব মল্লিক, কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত, চন্দ্রকিশোর সেন, ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত, মন্মথনাথ ঘোষ, বীরেন্দ্রনাথ সরকার ও আরও অনেকে। একদা বাঙালির ধারণা ছিল লক্ষ্মী অপেক্ষা সরস্বতীর সাধনা অনেক বেশি গৌরবের। উনিশ শতকের উদ্যমী মানুষরা প্রমাণ করলেন যুগপৎ সরস্বতী ও লক্ষ্মীর সাধনায় কোনও বিরোধ নেই। সফল উদ্যোগপতি হতে হলে যথার্থ শিক্ষার প্রয়োজন। ১৮৫৭ সালের পরে যে সকল বাঙালি উদ্যোগপতিকে আমরা পেলাম তাঁদের অনেকেই বিলেতের ডিগ্রিধারী কৃতবিদ্য মানুষ।
গোটা উনিশ শতক ও বিশ শতকের প্রথমার্ধ— মোটামুটি এই দেড়শো বছর হল আধুনিকযুগে বাণিজ্যে বাঙালির গৌরবের কাল। এই সময়কে দু’টি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রাক্-সিপাহি বিদ্রোহ ও উত্তর-সিপাহি বিদ্রোহ। প্রাক্-সিপাহি বিদ্রোহ পর্যায়ে উদ্যোগপতি হিসেবে বাঙালির আইকন রামদুলাল দে, দ্বারকানাথ ঠাকুর, মতিলাল শীল, রামগোপাল ঘোষ প্রমুখ। প্রতিভা ও উদ্যোগের বহুমুখীনতার কথা বিচার করলে এঁদের মধ্যে দ্বারকানাথ ঠাকুর নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠতম।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা হল এই যে, এঁদের অনেকেরই পরিশ্রম ও সাফল্য খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এই উদ্যোগপতিদের উত্তরপুরুষেরা অনেকেই ব্যবসাবিমুখ হয়ে জমিদারির দিকে ঝুঁকলেন, ব্যবসা চালাতে গিয়ে কেউ ডুবলেন অনভিজ্ঞতা ও অপেশাদারিত্বের কারণে, কেউ বা বিলাসিতার স্রোতে গা ভাসিয়ে সঞ্চিত পুঁজিকে তামাকের ধোঁয়ার মতো উড়িয়ে দিলেন। ওই সময়েই লক্ষ্মীর খোঁজে কলকাতায় আগমন বিড়লা, গোয়েঙ্কাদের। বংশ পরম্পরায় আজও কিন্তু তাঁরা সাফল্যের সঙ্গে ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বাঙালি পারেনি। ঝুঁকি এড়িয়ে নিরাপদ জীবনকে বেছে নিয়েছে। সে যুগে জমিদারি, এ যুগে চাকরি।
প্রবল দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন রামদুলাল দে। চাকরি জুটেছিল ধনী ব্যবসায়ী মদনমোহন দত্তের গদিতে। মাইনে মাসে পাঁচ টাকা। একদিন মনিবের হয়ে নিলামে গিয়ে চোদ্দো হাজার টাকায় রামদুলাল একটা ডুবন্ত জাহাজ কিনে নিলেন। হঠাৎই ছুটে এলেন এক ইংরেজ। রামদুলালের কাছ থেকে জাহাজটি চড়া দামে কিনতে চাইলেন। অনেক দরাদরির পর রফা হল এক লাখ টাকায়। মাত্র কয়েক মিনিটে লাভ ছিয়াশি হাজার টাকা। রামদুলাল ফিরে এসে মনিবের হাতে তুলে দিলেন পুরো টাকা। এই সততায় খুশি হয়ে মনিব মদনমোহন দত্ত পুরো টাকাটা ফিরিয়ে দিলেন। সেই টাকা ব্যাবসায় বিনিয়োগ করে কয়েক বছরের মধ্যেই কোটিপতি হয়েছিলেন রামদুলাল। কে বলে বাঙালি ব্যবসা বোঝে না!
মৃত্যুকালে রামদুলাল প্রায় এক কোটি তেইশ লাখ টাকা রেখে গিয়েছিলেন। তাঁর দুই পুত্র— আশুতোষ দেব (ছাতুবাবু) ও প্রমথনাথ দেব (লাটুবাবু) ইচ্ছে করলে অনায়াসে বড় বড় কল-কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। এঁদেরই সমসাময়িক ছিলেন জামশেদজি টাটা। মাত্র একুশ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে তিনি কারবারে নেমেছিলেন। সেই থেকে আজকের টাটা কোম্পানি। ভাবতেই মাথা ঘুরে যায়। এমন একটা কোম্পানির মালিক হতেই পারতেন ছাতুবাবু-লাটুবাবু ও তাঁদের উত্তরসূরিরা। অথচ বিলাসিতা ও বাবুগিরিতে সঞ্চিত পুঁজির অনেকটাই উড়িয়ে দিলেন তাঁরা। টাকা উড়ে গেল পারিবারিক বিয়ে, শ্রাদ্ধ, অন্নপ্রাশন, দুর্গাপুজোর মাত্রাতিরিক্ত আড়ম্বর অনুষ্ঠানে, বিড়ালের বিয়েতে, কবিগান-আখড়াই গানে, বুলবুলির লড়াইয়ে, খ্যামটা নাচের পৃষ্ঠপোষকতায় ও বাইজিবিলাসে। পুঁজির অপচয়ের এই উদাহরণ বাঙালির উনিশ শতকের ইতিহাসে ভূরি ভূরি আছে।
দ্বারকানাথ ঠাকুর রপ্তানি ব্যবসায় নামেন ১৮২১ সালে। এর পরই তিনি গড়ে তোলেন ওরিয়েন্টাল লাইফ ইনস্যুরেন্স সোসাইটি ও অনেকগুলি বিমা কোম্পানি। বিনয় ঘোষ লিখেছেন, ‘...উনিশ শতকের বাঙালীদের মধ্যে দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতো স্বাধীন শিল্পবাণিজ্যের প্রতি উৎসাহ ও অনুরাগ দ্বিতীয় আর কারও ছিল কিনা সন্দেহ।...’ ১৮২৯ সালে দ্বারকানাথের উদ্যোগে স্থাপিত হয় ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক। কয়েক বছর পর স্থাপিত হল ‘কার টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি’ — বাঙালি ও ইউরোপীয় বণিকের যৌথ সংস্থার প্রথম নিদর্শন। ১৮৪৩ সালে দ্বারকানাথ স্থাপন করেন ‘বেঙ্গল কোল কোম্পানি’। এসবের পাশাপাশি রেশম, নীল, আফিম চাষেও তিনি অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। পণ্য পরিবহণের জন্যও দ্বারকানাথ একাধিক কোম্পানি গড়ে তোলেন। যেমন ‘ক্যালকাটা স্টিম টাগ অ্যাসোসিয়েশন’, ‘স্টিম ফেরিব্রিজ কোম্পানি’ ও ‘ইন্ডিয়া জেনারেল স্টিম নেভিগেশন’ কোম্পানি। এইসব বহুমুখী উদ্যোগ আজও আমাদের বিস্ময় উদ্রেক করে। ১৮৪৬ সালের পয়লা আগস্ট ইংল্যান্ডে মৃত্যু হয় দ্বারকানাথের। এর পরে মাত্র দেড় বছরের মধ্যে তাঁর কোম্পানিগুলি দেউলিয়া হয়ে যায়। শুধু ভূসম্পত্তিতে বিনিযুক্ত মূলধনটুকু অক্ষত ছিল। দ্বারকানাথের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ব্যবসামুখী হলেন না। জমিদারিকেই তিনি নিরাপদ মনে করেছিলেন।
ফোর্ট উইলিয়ামে মাল সরবরাহ করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন মতিলাল শীল। পরে শিশি-বোতল ও ছিপির কারবার শুরু করেন। জলবাণিজ্যে বিদেশিদের সঙ্গে রীতিমতো পাল্লা দিয়ে নিজের বণিকসত্ত্বা সদর্পে ঘোষণা করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। কেলসল নামে এক সাহেবের সঙ্গে যোগ দিয়ে রামগোপাল গড়ে তোলেন ‘কেলসল ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি’। পরে ‘আর জি ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে নিজস্ব কোম্পানি খুলে প্রভূত উন্নতি করেছিলেন।
উত্তর-সিপাহি বিদ্রোহ পর্যায়ে উদ্যোগপতি হিসেবে বাঙালির শ্রেষ্ঠ আইকন নিঃসন্দেহে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞানশিক্ষার আগে দেশে শিল্প স্থাপন প্রয়োজন। তাঁর কথায়, ‘...প্রত্যেক দেশেই শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি হইয়াছে, তাহার পরে বিজ্ঞান ও বিবিধ শিল্পবিদ্যা প্রভৃতি আসিয়াছে।...’ তিনি লক্ষ করেছিলেন বাঙালি ছাত্ররা যে কোনওভাবে একটা চাকরি জোগাড় করতেই ব্যস্ত। বাঙালিকে জীবিকা নির্বাহের বিকল্প পথের সন্ধান দিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল’। এই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পর প্রফুল্লচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘... বেঙ্গল কেমিক্যাল পুরাপুরি বাঙ্গালীর প্রতিষ্ঠান। এইখানে বাঙ্গালীর অর্থ, বাঙ্গালীর বুদ্ধি, বাঙ্গালীর সামর্থ্য সবই বাঙ্গালীর। আমাদের দেশের যে সকল অতি পণ্ডিত লোকেরা বাঙ্গালীর কর্মকুশলতায় আস্থাবান নহে তাহারা একবার বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানা দেখিয়া আসিলে বুঝিতে পারিবে, কেমন করিয়া কেবল বাঙ্গালীর দ্বারা এত বড় কলকব্জার ব্যাপার চলিতে পারে।...’
উনিশ শতকের শেষের দিকে স্থাপিত হয় এইচ বোস অ্যান্ড কোম্পানির পারফিউমারি ওয়ার্কস। এইচ বোসের পুরো নাম হেমেন্দ্রমোহন বসু। ইনি ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভগ্নীপতি। এইচ বোস অ্যান্ড কোম্পানির কুন্তলীন হেয়ার অয়েল এক সময়ে বাংলাদেশে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
বাটনা বাটার ঝামেলা এড়াতে বাঙালিকে গুঁড়ো মশলার সুলুকসন্ধান দিলেন কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত। মশলার ব্র্যান্ড ‘কুকমি’। সেই প্রতিষ্ঠান আজও দাপটের সঙ্গে বিরাজ করছে। ১৮৭৮ সালে আয়ুর্বেদ চিকিৎসক চন্দ্রকিশোর সেন তৈরি করলেন ‘জবাকুসুম’ তেল। বছরের পর বছর বাঙালির ঘরে ঘরে আধিপত্য করল এই ব্র্যান্ড। প্রোডাক্ট জনপ্রিয় করতে চাই বিজ্ঞাপন। বুঝেছিলেন চন্দ্রকিশোর। ১৯০৩ সালে হীরালাল সেনকে দিয়ে তিনি তৈরি করালেন দেশের প্রথম বিজ্ঞাপনী চলচ্চিত্র।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও বিলিতি দ্রব্যবর্জনের ঢেউ অনেক বাঙালিকে উদ্যোগপতি হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সে সময় আমবাঙালির হাতে দেশীয় পেন, পেনসিল, রবার তুলে দিলেন ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত। আরেক উদ্যোগপতি অন্নদাপ্রসাদ শীল তৈরি করলেন ঝর্ণা কলম। ফাউন্টেন পেন-এর এই বাংলা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনিই বাঙালির তৈরি ফাউন্টেন পেনের ব্র্যান্ড নাম দিলেন ভারতী কলম।
জাপান থেকে সেলুলয়েড শিল্প শিখে এসে যশোরের জমিদার প্রমথভূষণ দেব রায়, কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, বর্ধমানের মহারাজা বিজয়চাঁদ মহাতাবের সহায়তায় মন্মথনাথ ঘোষ গড়ে তুললেন ‘যশোর কম্ব বাটন অ্যান্ড ম্যাট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড’। মন্মথনাথই ভারতের সেলুলয়েড শিল্পের জনক।
চর্মশিল্পের সম্ভাবনার কথা ভেবে ‘ন্যাশনাল ট্যানারি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নীলরতন সরকার। ইংল্যান্ডের লিডস থেকে লেদার টেকনোলজি শিখে এসে বিরাজমোহন দাস যোগ দিলেন ন্যাশনাল ট্যানারিতে। পরে ১৯১৮ সালে তিনি গড়ে তুললেন ‘ক্যালকাটা রিসার্চ ট্যানারি’। নাম পরিবর্তিত হতে হতে সেটাই এখন ‘কলেজ অব লেদার টেকনোলজি’। বিরাজমোহন চেয়েছিলেন বাঙালি শিক্ষিত যুবকেরা চর্মশিল্পে নিজেদের ব্যবসায়ী সংস্থা গড়ে তুলুক। কিন্তু তারা আগ্রহী হল মাস মাইনের চাকরিতে। কলকাতার চর্মশিল্পের দখল নিল চীনা ব্যবসায়ীরা। ১৯৩২ সালে চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে চলে এলেন টমাস বাটা। কোন্নগরে স্থাপিত হল বাটা কোম্পানির জুতোর কারখানা। বাঙালি সুযোগ হারাল।
বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এক বিরাট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হন স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তিনি স্থাপন করেছিলেন ‘ইন্ডিয়ান আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি’, ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড ওয়াগন কোম্পানি’, ‘বার্ন অ্যান্ড কোম্পানি’, ‘মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি’। কর্মজীবনের শুরুতে রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জি ছিলেন সুদক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ও ঠিকাদার। এদেশে মার্টিন রেলপথ সমূহ স্থাপনের কৃতিত্ব তাঁরই।
বিশ শতকের গোড়ায় নয়া শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্রে বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাঙালি। বলতে গেলে ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পের বুনিয়াদ গড়ে দিল তারাই। এ তালিকায় নাম অনেক — হীরালাল সেন (এদেশে চলচ্চিত্রের জনক), বীরেন্দ্রনাথ সরকার (নিউ থিয়েটার্স), অনাদিনাথ বসু (অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশন), হিমাংশু রায় ও শশধর মুখার্জি (বম্বে টকিজ) প্রমুখ।
পুস্তক ব্যবসায় নেমে পথ দেখিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। রামতনু লাহিড়ীর দ্বিতীয় পুত্র শরৎকুমার লাহিড়ী গড়ে তুললেন ‘এস কে লাহিড়ী অ্যান্ড কোং’ নামে প্রকাশনা সংস্থা। শিশিরকুমার ঘোষ প্রতিষ্ঠা করলেন ‘যুগান্তর’ ও ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকা। উদ্যোগপতি মহেন্দ্রনাথ দত্ত প্রতিষ্ঠা করলেন ‘শ্রী সরস্বতী প্রেস’, ‘শিশু সাহিত্য সংসদ’ ‘সাহিত্য সংসদ’ ও ‘তারা বাইন্ডিং ওয়ার্কস’।
কোনও সন্দেহ নেই উনিশ শতকের নবজাগরণ এক দল সাহসী বাঙালিকে লক্ষ্মীর সাধনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। ‘বাঙালির দ্বারা ব্যাবসা হয় না’ — একথা ভুল বলে প্রমাণ করেছিলেন তাঁরা। তবে বাণিজ্যিক ভারতের কেন্দ্রবিন্দু কলকাতায় অবস্থান করেও বেশিরভাগ বিত্তবান বাঙালির প্রধান আগ্রহ ছিল জমিদারি এবং ইংরেজ সরকারের অধীনে উচ্চপদের চাকরি।
বৃহত্তর বাঙালি সমাজের বাণিজ্যে অনীহা যে শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল, তা ভরাট করে দিল পশ্চিম ভারত থেকে আসা বণিকেরা। বংশ পরম্পরায় এখনও তাঁরা কলকাতায় বসে সাফল্যের সঙ্গে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বজায় রেখেছে। আর অতীত গৌরব হারিয়ে সর্বস্বান্ত বাঙালির কাছে যে কোনও একটা চাকরিপ্রাপ্তি ও মোক্ষলাভ হয়ে উঠেছে সমার্থক।
বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাণিজ্যে বাঙালির ক্রমশ পিছু হটা। তার আগে বিশ শতকের চল্লিশের দশকের পরপর কয়েকটি ঘটনা দুমড়ে মুচড়ে দিল বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ও মূল্যবোধকে। যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশভাগ তছনছ করে দিল বাঙালির সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা। দেশভাগে গরিব হল বাঙালি। সংকুচিত হল ব্যবসার ক্ষেত্র। তারপর জমিদারি প্রথা বিলোপ। জমিতে বিনিয়োগ করে নিশ্চিন্তে যাঁরা বসেছিলেন, হঠাৎ একদিন তাঁরা দেখলেন জমি-জায়গা নেই। পুঁজি ক্রমশ পিছলে যেতে লাগল বাঙালির হাত থেকে। জমিদারি খুইয়ে অনেকে মরিয়া হয়ে বাণিজ্যকে আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু যথার্থ আগ্রহ ও উদ্যমের অভাব এবং অনভিজ্ঞতার কারণে ব্যর্থ হলেন অনেকেই।
মনোবল হারিয়ে বাঙালি ভাবতে শিখল চাকরিই তার একমাত্র গতি। অজস্র বাঙালি যুবক আজ সামান্য একটা চাকরির খোঁজে জুতোর শুকতলা খুইয়ে ফেলছে। তবুও ব্যবসা করে স্বনির্ভর হওয়ার কথা তারা ভাবতেই পারে না। সত্যজিৎ রায়ের ‘জন অরণ্য’ ছবিতে দেখি সোমনাথ জিজ্ঞেস করছে, ‘আপনি আমাকে চানাচুর বেচতে বলছেন?’ জবাবে বিশুদা বলেন, ‘না না। তুমি ব্রাহ্মণ সন্তান। তোমাকে তা বলতে পারি? তুমি ব্রাহ্মণ সন্তান তুমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করতে পার কিন্তু সওদা করবে কী করে?’
চারদিকে চাকরির আকাল। তবুও চাকরির খোঁজে উদ্ভ্রান্ত বাঙালি যুবক-যুবতী। ‘বাণিজ্য বসতে লক্ষ্মী’— কবে একথায় বাঙালির প্রত্যয় হবে জানি না। উনিশ শতকে ও বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি উদ্যোগপতিরা পথ দেখিয়েছিলেন। অগ্নি স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল কিন্তু তা দাবানলে পরিণত হয়নি। আজ বাঙালির ঘরে ঘরে উদ্যোগপতির জন্ম হওয়া প্রয়োজন। সে ছোট, বড় যাই হোক না কেন।
বাঙালির হাতে বিত্ত পুঞ্জীভূত না হলে তার সংস্কৃতি ঐতিহ্য, শিল্পকলা, কৃষ্টি কিছুই বাঁচবে না। এই সারসত্যটা বোঝার সময় এসেছে। তাই এই অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্যলগ্নে তাঁকে আবাহন করি। এসো হে উদ্যোগপতি। নেমে এসো ধরায়। আবির্ভূত হও এই বঙ্গভূমে। অক্ষয় হোক তোমার উদ্যোগ। অবিনশ্বর হোক তোমার বিত্তসাধনা।