


বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: কথায় বলে, ‘লাভের গুড় পিঁপড়ে খায়’! স্বাস্থ্যবিমার ক্ষেত্রে বর্তমানে কার্যত এটাই ঘটে চলেছে। বেসরকারি ক্ষেত্রে চিকিৎসার খরচ যত বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যবিমার চাহিদা। কিন্তু মাত্রাছাড়া প্রিমিয়ামের চাপে নাজেহাল আম জনতা। তাঁদের কিছুটা সুরাহা দিতে প্রিমিয়ামের উপর জিএসটি ১৮ শতাংশ থেকে নামিয়ে শূন্য করেছে সংশ্লিষ্ট কাউন্সিল। তবে বাস্তবে ফুটো কলসির মতো এর সুফল দ্বিগুণ হারে বেরিয়ে যাচ্ছে বিমা গ্রাহকদের। বিমা সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় নিয়ামক সংস্থা ‘ইনসিওরেন্স রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়া (আইআরডিএআই)-এর সাম্প্রতিক তথ্যেই বিষয়টি স্পষ্ট। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ক্লেমের প্রায় ৩০ শতাংশ টাকা দিচ্ছে না বিমা সংস্থাগুলি। অর্থাৎ, চিকিৎসার জন্য ১০০ টাকা ক্লেম হলে, ৭০ টাকা মেটাচ্ছে তারা। ফলে বিমা থাকার পরও হাসপাতালে নগদ টাকা মেটাতে হচ্ছে গ্রাহককে। অথচ বিমা বিক্রির শর্ত অনুযায়ী পুরো টাকাই মেটানোর কথা। শুধু তাই নয়, ১৩ শতাংশ ক্ষেত্রে নানা অছিলায় কোনও টাকাই দিচ্ছে না বিমা সংস্থাগুলি। ফলে প্রিমিয়ামে জিএসটি শূন্য হলেও নিয়মের কলকাঠিতে আদতে কোনো সুরাহা হচ্ছে না মানুষের।
আইআরডিএআই জানাচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে স্বাস্থ্যবিমা মেটানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিমা সংস্থাগুলির কাছে ৩ কোটি ৭৩ লক্ষ ‘কেস’ এসেছিল। তার মধ্যে ৩ কোটি ২৬ লক্ষ আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। ক্লেমের মোট টাকার অঙ্ক ছিল ১ লক্ষ ৩২ হাজার ৪৮২ কোটি। এর মধ্যে বিমা সংস্থাগুলি মিটিয়েছে ৯৪ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৩৪ হাজার কোটিরও বেশি টাকা মেটায়নি তারা। তবে ক্লেম মেটানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থাগুলির অবস্থা বেসরকারি ক্ষেত্রের তুলনায় অনেকটা ভালো। আইআরডিএআই জানিয়েছে, চারটি সরকারি বিমা সংস্থা প্রিমিয়াম বাবদ যে টাকা গত অর্থবর্ষে আয় করেছে, তার চেয়ে বেশি টাকা ক্লেম মেটাতে খরচ করেছে। তাদের আয়ের তুলনায় ক্লেম মেটানোর হার ১০০.৫৯ শতাংশ। বেসরকারি সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে তা ৮৮ শতাংশ। শুধুমাত্র স্বাস্থ্যবিমা বিক্রি করে যারা, তাদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৬৯ শতাংশ।
শর্ত অনুযায়ী ক্লেমের টাকা না পেলে বিমা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো যায়। কেন্দ্রীয় সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে স্বাস্থ্য ও সাধারণ বিমা মিলিয়ে মোট অভিযোগের সংখ্যা ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ছাড়িয়েছে। এর সিংহভাগই যে স্বাস্থ্যবিমা সংক্রান্ত, বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘কনফেডারেশন অব জেনারেল ইনসিওরেন্স এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনস অব ইন্ডিয়া’র যুগ্ম আহ্বায়ক সুদীপ্ত সরকারের কথায়, ‘স্বাস্থ্যবিমায় ক্লেমের টাকা না পাওয়ার অভিযোগ ক্রমশ বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ বেসরকারি সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে। যেখানে সরকারি বিমা সংস্থাগুলি তাদের আদায় করা প্রিমিয়ামের প্রায় পুরোটাই বা তারও বেশি টাকা ক্লেম মেটাতে খরচ করছে, সেখানে বেসরকারি অনেক সংস্থা খরচ করছে ৬০ শতাংশের কম। কোথাও তা ১০ শতাংশের নীচে!’ তিনি আরও জানান, কেমোথেরাপি বা ডায়ালিসিসের মতো চিকিৎসার জন্য বারবার হাসপাতালে যেতে হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এসব ক্ষেত্রে একাধিক বিমা সংস্থা ক্লেমের টাকা না দেওয়ার জন্য বছরের শেষে পলিসি আর রিনিউ করছে না। অর্থাৎ বহু বছর প্রিমিয়াম আদায়ের পর যেই মাত্র সংস্থাগুলি দেখছে যে বারবার ক্লেম মেটাতে হচ্ছে, তখন সব দায় ঝেড়ে ফেলছে।