


অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: টিনের চাল খলপা দেওয়া বেড়ার ঘর একমাস আগেই ভেঙে গুঁড়িয়ে নিয়েছে রেল। ঘর হারিয়ে কাটোয়ার ধোপাপুকুর পাড়ে গাছতলাতে সংসার পেতেছেন উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলি। ত্রিপল খাটিয়ে সেখানেই চলছে পড়াশোনা। ভাঙা ঘরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ইঁট দিয়ে উনুন বানিয়ে হচ্ছে রান্নাবান্না। রাত হলে সেখানেই মাদুর বিছিয়ে ঘুম।
গত ৭ জুন কাটোয়ায় ধোপাপুকুর পাড়ে রেলের জায়গায় তৈরি বস্তি ভেঙে দিয়েছিল রেল। কলোনির বাসিন্দারা মূলত পরিচারিকার কাজ করে সংসার চালান। বহু বছর ধরে রেলের জায়গায় গড়ে উঠেছিল এই বস্তি। কাটোয়া শহরের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের বাস স্ট্যান্ড লাগোয়া ধোপাপুকুর পাড়ে প্রায় আশি বছর আগে কলোনিটি গড়ে উঠেছিল। ওই কলোনির পিছনেই রেলের কোয়ার্টার। প্রায় দু’শ পরিবার আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে এসে কলোনিতে ঠাঁই নিয়েছিলেন। পরিবারের মহিলারা শহরের বিভিন্ন বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেন। পুরুষরা দিনমজুর। প্লাস্টিকের ছাউনি ও করোগেটেড টিন ঘিরে তৈরি খুপরি ঘরগুলিতে কোনোমতে মাথা গুঁজতেন বাসিন্দারা। ঘর হারিয়ে এখন তাঁরা নিঃস্ব।
এখনও অনেকেই মায়া ত্যাগ করতে পারছেন না। আবার কেউ কেউ এখনও বাড়ি ভাড়া করে উঠতে পারেননি। তাই তাঁদের ঠাঁই হয়েছে গাছতলাতেই। বন্দনা মণ্ডল বলছেন, আমার বাবা রিকশ চালান। ওই সামান্য রোজগারে বাড়ি ভাড়া করব কীভাবে। তাই গাছতলাতেই থাকছি। বৃদ্ধা বাচী মণ্ডল কোনোমতে দুটো ভাত ফুটিয়ে স্বামী-স্ত্রীতে খেতে বসেছিলেন। আচমকা বৃষ্টি নামায় ভাতের থালা হাতে ছুটোছুটি করে গাছের নীচে গিয়ে বসলেন। বাচীদেবী বলছেন, এই কলোনিতেই আমি বউ হয়ে এসেছিলাম। এখানেই আমার ছেলে মেয়ে হয়েছে। তাঁদের আবার বিয়ে হয়েছে। এখন আমাদের মত গরিব মানুষেরা কোথায় যাব। সরকার কি পারত না একটু খাস জায়গা ব্যবস্থা করে দিতে! রাত হলে অন্যের বাড়ির বারান্দায় থাকছি। আর সকালে খোলা আকাশের নীচে রান্না করতে হচ্ছে। রেল আমাদের কথাই শুনল না।
ধোপাপুকুর পাড় এখন শ্মশানের চেহারা নিয়েছে। উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলি বাড়ি ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে পারছেন না। লোকের বাড়ি পরিচারিকার কাজ করে শহরে কীভাবে তাঁরা ভাড়াবাড়িতে থাকবেন, সেই চিন্তাতেই তাঁদের দিনকাবার. গাছতলায় ত্রিপল খাটিয়ে পড়াশোনা করছে তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়া রূপম কুমারী, দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ুয়া রাজ সাহা। রূপম কুমারী বলে, আমার বাবা মুটিয়ার কাজ করেন। মা লোকের বাড়িতে কাজে গিয়েছেন। এখানেই বসে আমরা পড়াশোনা করছি। আনন্দ দাস বলেন, মাথার ছাদ চলে গিয়েছে। এখন গাছতলাই ভরসা। তবে বর্ষায় কী হবে জানি না। বৃষ্টি এলে অন্যের বাড়ির বারান্দাতে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপেই চলছে নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই।