


রাজদীপ গোস্বামী, পলাশবনী: পেট বড় বালাই! সংসারে একাধিক পেট থাকলে তো আর কথাই নেই। বাজারের যা হাল, তাতে বাড়তি উপার্জন না করলে দু’বেলা, দু’মুঠো খাওয়া ও খাওয়ানোটাই কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে দেবজিৎ মাহাত দিনে দিনমজুর। রাতে ‘রাধিকা’ কিংবা ‘মা দুর্গা দুর্গতিনাশিনী’। কখনও কখনও তিনি রাতের ‘অপ্সরা’ও।
মেদিনীপুর সদর ব্লকের পলাশবনী গ্রামে বাড়ি দেবজিতের। কঠোর পরিশ্রমকেই জীবনের মূলমন্ত্র মানেন। তাই সংসারে বাড়তি উপার্জনে তিনি দিনে মাঠে, রাতে মঞ্চে। দেবজিৎ একজন ছৌ শিল্পী। অভিনয় ও নৃত্যে দুরন্ত। রাধিকা থেকে দুর্গা, অপ্সরা থেকে সখী—দক্ষতার সঙ্গে মঞ্চে ফুটিয়ে তোলেন নারী চরিত্র। তাঁর নাচ দেখে মুগ্ধ আট থেকে আশি। নিজের গ্রাম তো বটেই পড়শি গ্রামের লোকজনের কাছে তিনি এখন সেলিব্রিটি। বাড়ির বাইরে পা রাখলেই সেলফির আবদার। এলাকায় তিনি এখন আইকন। সবাইকে বলেন, ‘মোবাইল ছেড়ে পরিশ্রম করো।’
মঙ্গলবার ছিল পয়লা বৈশাখ। শো রয়েছে দেবজিতের। ক’দিন ধরেই অনুশীলনে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। উৎসব মরশুমে তাঁর বিশ্রামের জো নেই। পশ্চিম মেদিনীপুর ছাড়াও রাজ্য থেকেও ডাক পান তিনি। পড়শি ঝাড়খণ্ডে নিয়মিত শো করেন। গ্রামবাসীদের কথায়, ‘দেবজিতের অভিনয় দেখার মতো। মুগ্ধ হন সকলেই। বিশেষ করে মহিলা চরিত্রের ওর অভিনয় অনবদ্য। এদিন বাড়িতে নাচের অনুশীলন করছিলেন দেবজিৎ। এক ফাঁকে তিনি বলছিলেন, ‘ছোট থেকেই নাচ ও অভিনয়ের প্রতি আমার আগ্রহ। কিন্তু কোনও দিন কিছু শেখা হয়ে ওঠেনি। ইন্টারনেটের মাধ্যমে নাচ ও অভিনয় দেখে শিখছি। পরিবার সব সময় পাশে থেকেছে। জীবনে আরও বড় জায়গায় যেতে চাই।’
নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম দেবজিতের। বাবা ভগিরথ মাহাত প্রান্তিক চাষি। মা বিজলা মাহাত গৃহিণী। একসময় আধপেটা খেয়ে থেকেছেন। সেদিনের কথা বলতে গিয়ে চোখের কোণটা চিকচিক করে ওঠে দেবজিতের। ‘বাবা সকাল হলেই সাইকেলে চেপে ধান আনতে যেতেন। কয়েক ঘণ্টা বাদে চাষিদের থেকে ধান নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। এসেই ধান ভাঙতেন। সেই চাল আবার চাষিদের বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। টাকা পেলে আমাদের খাবার জুটত। এখন একটু একটু করে আমাদের অবস্থা বদলাচ্ছে।’
ঝাড়গ্রাম জেলার জামবনীর এক ছৌ নৃত্যের গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত দেবজিৎ। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করার আর পড়শোনা করতে পারেননি। তাঁর ইচ্ছে, জাতীয় স্তরের কোনও অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া। একইসঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করা। দেবজিৎ বলছিলেন, ‘আমাকে আরও লড়াই চালাতে হবে। ইচ্ছে শক্তিই আমার সম্বল।’ দেবজিতের দাদা বিক্রমজিৎ মাহাতও চান ভাই আরও বড় শিল্পী হোক। বলছিলেন, ‘নাচ ও অভিনয়ের প্রতি ওর নির্ভেজাল ভালোবাসা ওকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’ বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক দেবদাস রায় দেবজিতের অনেক শো দেখেছেন। তিনি বলছিলেন, ‘এঁরা যোগ্য সম্মান পেলে বাংলার লোকশিল্প বাঁচবে।’