


২৮ জানুয়ারি বিকেলে ধনপতি দত্ত ও তাঁর বড় ছেলে দেবদাস কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিচ্ছিলেন। আচমকা বেজে উঠল ল্যান্ডলাইন। ফোনের ওপারে চন্দ্রনাথ বণিক। আশ্চর্যজনকভাবে ভালো ব্যবহার। কলকাতায় আসতে বারণ করলেন তিনি। অমায়িক ব্যবহারে অবাক লেগেছিল ঠিকই। কিন্তু ‘অনুতাপ’ হয়েছে ভেবে মনকে সান্ত্বনাও দিয়েছিলেন দেবযানীর বাবা ধনপতি। তাই বাবা-দাদা আর আসেননি কলকাতায়। আসলে ততক্ষণে মোক্ষম একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে চন্দ্রনাথের মনে— গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার কথা কেউ বিশ্বাস করবে তো? বসল ‘পারিবারিক বৈঠক’। সিদ্ধান্ত হল, আপাতত দেহ লুকিয়ে ফেলা হোক। তারপর শুরু হল বণিকদের অপারেশন। পরের দিন, অর্থাত্ ২৯ তারিখ সকালে গোলপার্কের একটি ব্যাঙ্ক থেকে এক লাখ টাকা তুলে পারিবারিক চিকিত্সকের কাছে পৌঁছন চন্দ্রনাথ-চন্দন। আব্দার, ডেথ সার্টিফিকেট লিখতে হবে। টাকার লোভ দেখালেন। ডাক্তারবাবু লেখেননি। এবার ভয় ধরেছে চন্দ্রনাথের মনে। ডাক্তারবাবুকে তাঁর প্রশ্ন, ময়নাতদন্তে বোঝা যায় কীভাবে মৃত্যু? ডাক্তারের পাল্টা প্রশ্ন, ‘এসব জিজ্ঞেস করছেন কেন? খুব সহজেই বোঝা যায়।’ সেদিন রাতেই বেল বাজল... ‘থানা থেকে আসছি।’ পাঁচতলা থেকে ছ’তলায় উঠলেন চন্দ্রনাথ-চন্দন-অসীম। সেখান থেকে নেমে রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের দিকের গেট দিয়ে পালালেন। যদু-শান্তি-পুষ্পাকে রান্নাঘরে ঢুকিয়ে চাবি দিলেন সুমিত্রা।
চিত্রনাট্যে সুশীল, অশোক, গৌরদের প্রবেশ। এরা কেউ রক্তমাংসের মানুষ নন। সবই চন্দ্রনাথদের ছদ্মনাম। এইসব নাম নিয়েই কখনও মহাত্মা গান্ধী রোড, কখনও বিবি গাঙ্গুলি স্ট্রিটে লুকিয়েছিলেন তাঁরা। এই পর্যন্তই ছিল বণিকদের অপারেশন। এবার অপারেশনে নামলেন কলকাতা পুলিসের গোয়েন্দারা। তদন্তের দায়িত্বে সুজিত সান্যাল। ৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরে রাসবিহারী মোড়ে একটি ট্যাক্সিকে আটকানো হল। আটক চন্দ্রনাথ-চন্দন-অসীম। দেবযানীর মাথায় যে লাঠি দিয়ে মারা হয়েছিল, সেটিও উদ্ধার হল ছ’তলার অফিসঘর থেকে। ফাঁস দেওয়ার শাড়িও উদ্ধার হল। গ্রেপ্তার চন্দ্রনাথ-চন্দন-অসীম-জয়ন্তী-সুমিত্রা-বিত্রা। শুরু হল বিচার। বিত্রার বিচার শুরু হল জুভেনাইল কোর্টে। তিনি তখনও নাবালিকা।
ফরেন্সিক রিপোর্ট বলল, মৃত্যুর পর দেহ ঝোলানো হয়েছে। ’৮৫ সালের এপ্রিলে রায় ঘোষণা করলেন আলিপুর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দিলীপ নারায়ণ সেন। জয়ন্তী, সুমিত্রা ও অসীমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। চন্দ্রনাথ-চন্দনের ফাঁসির আদেশ। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে আদালত বসেছিল। প্রেসিডেন্সি জেল থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল দেবযানীর শ্বশুর ও স্বামীকে। শোনা যায়, রায় শুনেই চন্দ্রনাথ আইনজীবী নরেন দত্তকে টোকা মারেন। নিজেই বলে ওঠেন, ‘সকলের বাচ্চা রয়েছে। এই রায় কীভাবে দেওয়া যায়?’ হাইকোর্টে চন্দ্রনাথ-চন্দনের ফাঁসির আদেশ বহাল থাকল। সুমিত্রার যাবজ্জীবনের সাজাও। অসীম, জয়ন্তীর শাস্তি কমে দাঁড়াল দু’বছরের সশ্রম কারাবাসে। হাইকোর্টে থেমে থাকেননি বণিকরা। নিন্দুকে বলে, ‘বিরাট প্রভাবশালী বলে কথা!’ নামকরা উকিলদের রাখা হয়েছিল। পাল্লা দিয়ে লড়াই করেছিল দত্তবাড়িও। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে চন্দ্রনাথ-চন্দনের ফাঁসির আদেশ রদ হয়ে গেল। ১৪ বছর পর মুক্তি পেলেন চন্দ্রনাথ-চন্দন-সুমিত্রা। চন্দ্রনাথ প্রয়াত। বাকিরা আছেন। জুভেনাইল কোর্টে বিচারপর্বে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন বিত্রাও। সুপ্রিম কোর্টের আদেশে মামলা থেকে মুক্তি পান ঘটনার বছর তিনেক পর। গত হয়েছেন ধনপতি ও তাঁর বড় ছেলে।
এখন দত্ত পরিবারের কুলদেবতার কাছে দেবযানীর নামে ২৮ জানুয়ারি পুজো দেওয়া হয়। করা হয় তর্পণ। সেই সময়ের কয়েকটা খবরের কাগজের কাটিং ছাড়া আর কিছুই নেই দত্তদের কাছে। বণিকবাড়ি নামের দৈত্যের পেটের ভিতর কি কিছু আছে? ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তা আর জানার ইচ্ছেও নেই দত্তদের।