


বিশেষ নিবন্ধ, স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী: ১৯৬৫ সাল। ১ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছে মনোজ কুমার অভিনীত ছবি ‘শহিদ’। ভগৎ সিংয়ের জীবনী অবলম্বনে তৈরি ছবিটি ইনস্ট্যান্ট হিট। সেই বছরই ৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে গেল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ভূমিকা অবশ্য শুরু হয়েছিল সে বছর জানুয়ারি মাস থেকেই। পাক সেনারা ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে টহল দিতে শুরু করেছিল। দেশজুড়ে প্রবল উত্তেজনার মধ্যেই দিল্লিতে ‘শহিদ’ ছবির একটি বিশেষ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। তখন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী। তাঁর রামলীলা ময়দানের সভায় দেওয়া স্লোগান ‘জয় জওয়ান জয় কিষান’ ভারত কাঁপাচ্ছে। এই আবহে ‘শহিদ’ দেখে আপ্লুত লালবাহাদুর ছবির হিরো মনোজ কুমারকে ডেকে অনুরোধ করলেন, তাঁর স্লোগান অবলম্বনে একটি ছবি বানাতে। প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে আবেগতাড়িত মনোজ দিল্লি থেকে বোম্বে ফেরার পথে ছবির কাহিনির খসড়া তৈরি করতে শুরু করে দিলেন। ১৯৬৭ সালের ১১ আগস্ট মুক্তি পেল সেই ছবি— ‘উপকার’। বক্স অফিসে ছবিটি দুর্দান্ত সাফল্য পেল। জুটল বছরের সেরা ছবি সহ একাধিক পুরস্কার। লালবাহাদুর শাস্ত্রী অবশ্য দেখে যেতে পারেননি সেই ছবি। ১৯৬৬ সালে তাসখন্দে চুক্তি স্বাক্ষর করতে গিয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। এই ‘উপকার’-ই আমাদের দেশে সরকারের গুণকীর্তন করা প্রথম ছবি। যাকে বলে ‘প্রোপাগান্ডা মুভি’। বিশ্বে অবশ্য প্রোপাগান্ডা মুভি শুরু হয় আরও আগে। মূলত হিটলারের জার্মানিতে প্রোপাগান্ডা মুভির জয় জয়কার শুরু হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, অনেকেই এই সারিতে সোভিয়েত ইউনিয়নে নির্মিত কুলেশভ ও আইজেনস্টাইনের ছবির পাশাপাশি আমাদের দেশে তৈরি প্যারালাল সিনেমাগুলিকেও রাখতে চান। কিন্তু নাজি জার্মানিতে তৈরি প্রোপাগান্ডা সিনেমার সঙ্গে সোভিয়েত সিনেমার এবং বর্তমানে বলিউডের প্রোপাগান্ডা ছবির সঙ্গে ঋত্বিক ঘটক কিংবা মৃণাল সেনের তৈরি ছবির মূলগত কিছু তফাৎ আছে। কী সেই তফাৎ তা বলার আগে ২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি হলিউডি ছবির প্রসঙ্গ টানতে হবে। ‘শক অ্যান্ড অ’ (shock and awe) নামে সেই ছবিটির পরিচালক রবার্ট রেইনার। না বক্স অফিসে, না সমালোচক মহলে কোথাও পাত্তা পায়নি এই ছবিটি। অর্থাৎ সর্ব অর্থে অসফল একটি ছবি। কিন্তু ছবিটি কতগুলি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তুলে দেয়। ইরাকে মার্কিন হানাদারি ছবিটির মূল প্রেক্ষাপট। ছবির এক দৃশ্যে দেখা যায় ৯/১১ আক্রমণের পর এক অনুসন্ধানী সাংবাদিক বাড়িতে স্ত্রী ও একরত্তি ছেলের সঙ্গে ডিনার সারছেন। ছেলের স্কুলে পড়াশোনা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে সাংবাদিকের স্ত্রী বলেন, ওরা স্কুলেও ‘ন্যাশনালিজম’ শেখাতে শুরু করেছে। সাংবাদিক স্বামী বলেন, এটাই তো স্বাভাবিক। এখনই তো ‘প্যাট্রিয়টিজম’ শেখাবে। স্ত্রী বলেন, তুমি একে প্যাট্রিয়টিজম বলছ! কিন্তু এটা ন্যাশনালিজম ছাড়া আর কিছুই না। যে ন্যাশনালিজম আমার দেশ যুগোস্লাভিয়াকে টুকরো টুকরো করেছে।
এখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, ‘ন্যাশনালিজম’ আর ‘প্যাট্রিয়টিজম’-এর মধ্যে ফারাক কী। এই দুই শব্দের বাংলা হল যথাক্রমে ‘জাতীয়তাবাদ’ ও ‘দেশপ্রেম’।
ডিকশনারি বলছে, দেশপ্রেম হল নিখাদ দেশভক্তি, দেশের মানুষের মঙ্গলকামনা। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে মিশে থাকে এক ধরনের আধিপত্যবাদ। অর্থাৎ আমার জাতিই অন্যদের থেকে সেরা, এই মনোভাব। এই আধিপত্যবাদ থেকেই জন্ম নেয় উগ্র জাতীয়তাবাদ। আর তা পরিণত হতে পারে ‘জিঙ্গোইজম’-এ। যার অর্থ, যুদ্ধোন্মাদনা। যে উগ্র জাতীয়তাবাদের ভয়ঙ্কর রূপ আমরা দেখেছিলাম নাৎসি জার্মানিতে।
তবে ডিকশনারির থেকেও বেশি মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ন্যাশনালিজম নিয়ে যা বলেছেন তার দিকে। ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্ত্য সভ্যতা’ প্রবন্ধে রবি ঠাকুর বলছেন, ‘নেশন শব্দ আমাদের ভাষায় নাই, আমাদের দেশে ছিল না।... নেশনই যে সভ্যতার অভিব্যক্তি তাহার চরম পরীক্ষা হয় নাই। কিন্তু ইহা দেখিতেছি, তাহার চরিত্র-আদর্শ উচ্চতম নহে। তাহা অন্যায় অবিচার ও মিথ্যার দ্বারা আকীর্ণ এবং তাহার মজ্জার মধ্যে একটি ভীষণ নিষ্ঠুরতা আছে।...।’ এই নিষ্ঠুরতার প্রতিফলনই কি আমরা দেখতে পাই না প্রতিটি যুদ্ধে? এই নিষ্ঠুরতাই কি ভেসে ওঠেনি ‘ধুরন্ধর’ নামে সিনেমাটির ফ্রেম থেকে ফ্রেমে? শুধু ধুরন্ধর কেন, আগেও জাতীয়তাবাদের প্রচারমূলক বহু সিনেমাতেই এই নিষ্ঠুরতা দেখা গিয়েছে। দেখা গিয়েছে ভারতের আধিপত্যবাদী ভূমিকা। লোকে সেসব গোগ্রাসে গিলেছেও। পাশাপাশি অনেকেই অবশ্য এর বিরুদ্ধ মতও পোষণ করেছেন। আমরা যদি কয়েক বছর পিছনে ফিরি, তবে দেখব ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অক্ষয় কুমার অভিনীত ‘কেশরী’ কিংবা ওই বছরই মুক্তি পাওয়া ‘উরি— দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ ছবিতেও এই ধরনের জাতীয়তাবাদী প্রচার হয়েছিল। কেশরী ছবির মূল কাহিনি সারাগারির যুদ্ধ অবলম্বনে। যে যুদ্ধে আফগান জনজাতির যোদ্ধারা সারাগারির ব্রিটিশ দুর্গ আক্রমণ করে সেখানে থাকা শিখ রেজিমেন্টের সমস্ত সৈন্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ছবিতে ঘটনাটি এমন ভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, দেখে মনে হবে এটা মুসলিম বনাম শিখদের যুদ্ধ। বিষয়টা আদৌ তা নয়। আফগান জনজাতিরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে। ঘটনাচক্রে দুর্গটি রক্ষার দায়িত্ব ছিল শিখ সৈন্যদের। এর মধ্যে কোনোভাবেই ‘শিখ বনাম মুসলিম’ বিষয়টি আসে না। ‘উরি দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ ছবিটিতেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দাদের জয়কে এমনভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে যে দর্শকের পাকিস্তান সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে বাধ্য। অথচ একটা দেশের সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তের কারণে সেই দেশের নাগরিকদের দায়ী করা যায় না কোনোভাবেই, যতই সে শত্রু দেশ হোক না কেন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বিভিন্ন দেশের বহু সাধারণ নাগরিকই যুদ্ধের বিরুদ্ধে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইজরায়েলের অনেক মানুষই সম্প্রতি চলা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন।
ধুরন্ধর-২ ছবিটিও ‘কেশরী’ ও ‘উরি-দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ ছবির মতো একই দোষে দুষ্ট। এই ছবিতে পাকিস্তান সম্পর্কে এক অদ্ভুত নেতিবাচক মনোভাবের প্রচার করা হয়েছে খুব সুকৌশলে। তার সঙ্গে ভারত সরকারের ‘নোটবন্দি’-কেও সঠিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরার একটা চেষ্টা হয়েছে ছবিটিতে। সরকারের যে পদক্ষেপের ফলে ভারতের আপামর মানুষকে বহু কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। অনেকে মারাও গিয়েছেন টাকা তোলার লাইনে দাঁড়িয়ে। সরকারের যেকোনো পদক্ষেপের অন্ধ সমর্থনকারী এই ধরনের ছবিগুলিই আসলে প্রোপাগান্ডা ফিল্ম। হলিউডেও এই ধরনের প্রোপাগান্ডা ছবি বহু তৈরি হয় এবং হয়েছে। সিলভেস্টার স্ট্যালোনের একাধিক ছবিতে ভিয়েতনামী যোদ্ধাদের নৃশংসভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কৌশলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিয়েতনাম আক্রমণের সমর্থন করা হয়েছিল সেই ছবিগুলিতে। জেমস বন্ডের বহু ছবিতে এক সময়ে ভিলেন চরিত্রগুলি হতো সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রশাসনিক কিংবা সেনাবাহিনীর লোকজন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এখন উত্তর কোরিয়া এবং চীন সেই জায়গা নিয়েছে। ইদানীং বলিউডেও সেই ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। হিন্দি প্রোপাগান্ডা ফিল্মের ভিলেনরা উঠে আসছে পাকিস্তানের মাটি থেকে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তান ভারতের ক্ষতি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতও তাকে বারবার নাকে খত দিতে বাধ্য করেছে। সে বাংলাদেশ যুদ্ধে হোক কিংবা কারগিল যুদ্ধে। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাফল্যকে সিনেমার মাধ্যমে সুকৌশলে সরকারে অধিষ্ঠিত দলের কিংবা কোনো ব্যক্তির সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা অনৈতিক।
এবার আসি সোভিয়েত ছবি কিংবা আমাদের দেশের ঋত্বিক ঘটকের মতো পরিচালকদের ছবিকে কেন এই পঙ্ক্তিভুক্ত করা উচিত নয় সেই প্রসঙ্গে। লক্ষ্য করে দেখবেন, সেই ছবিগুলোতে কিন্তু নির্লজ্জ জাতীয়তাবাদী প্রচার কিংবা আগ্রাসী যুদ্ধোন্মাদনা দেখানো হয়নি। বরং দেশের কোণঠাসা সাধারণ মানুষের অধিকার বোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে। নানা সামাজিক অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ঋত্বিক ঘটক বা মৃণাল সেন, প্রত্যেকেই তাঁদের ছবিতে সাধারণ মানুষের অসহায়তার কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন। তাঁদেব ছবিতে যা থাকে তা হল নিখাদ দেশপ্রেম, দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা। জাতীয়তাবাদ নয়। ফারাকটা এখানেই।