


হিমাংশু সিংহ: বাংলার গৌরবের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে যাঁরা অপমান করেন, তাঁরা ভরসা দেবেন? যে দল বাংলায় এসেই গোটা জাতিটাকে ঘুসপেটিয়া বলে সম্বোধন করে, তারা রক্ষা করবে বাংলার কৃষ্টি সংস্কৃতি? শিক্ষিত বাঙালি সমাজ, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় মুখ বুজে মেনে নেবে এই অন্যায়, না ২৯ এপ্রিল জবাব দেবে ইভিএমের বোতাম টিপে?
প্রথম দফার ভোটদানের হার রেকর্ড করেছে। স্বাধীনতার পর আট দশকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বিজেপি যতই বুক ফুলিয়ে প্রচার করুক, ওয়াররুমে দলের শালগ্রামশিলা অমিত শাহ বসে থাকুন, ভোট দানের হারে একটু যেন মুষড়ে পড়েছে হিন্দি বলা প্রভারীরা। গেরুয়া দলের চিন্তা, গত ৬ মাসে ভোটার তালিকায় নাম টিকিয়ে রাখার যন্ত্রণার বিস্ফোরণ হল না তো ভোটযন্ত্রে? কিংবা একশো দিনের টাকা আটকে রাখার বদলা? বুথে বুথে মানুষের লম্বা লাইন বিজেপি ও বশংবদ কমিশনের বিরুদ্ধে সুদে আসলে প্রতিশোধের শপথ থেকেই যদি হয়, তাহলে আগামী ৪ মে পালাবার আর পথ পাবে না উড়ে এসে জুড়ে বসা বহিরাগত নেতারা। মোদি-অমিত শাহের ছুটি। টা-টা বাই বাই! জ্ঞানেশ কুমারের পরের প্রমোশনও বাতিল।
দেশে ডবল ইঞ্জিন রাজ্যের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সবমিলিয়ে কুড়ি-একুশটি। বিজেপিকে ভরসা করে যাঁরা ভোট দিয়েছিলেন তাঁদের অভিজ্ঞতা কিন্তু মোটেই ভালো নয়। সাধারণ গৃহবধূ থেকে সম্ভাবনাময় যুবক, পক্বকেশ প্রবীণ থেকে পরিযায়ী শ্রমিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী কার আচ্ছে দিন ফিরেছে, কে সরকারি চাকরি পেয়েছে কিংবা চিচিং ফাঁকের ১৫ লাখ? কেউ বলতে পারবে বুক ফুলিয়ে! প্রতিশ্রুতির মোহে একদা যাঁরা গেরুয়া দলের দিকে ঝুঁকেছিলেন, তাঁরা এক যুগ কেটে গেলেও পাননি কিছুই। আজ বুঝছেন সব ফাঁকি। বরং রান্নার গ্যাসের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। পেট্রল ১০০ ছাড়িয়েছে। দেশবাসী হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছেন গেরুয়া দলের হরেক কিসিমের জুমলার সাইড এফেক্ট কতটা ভয়ংকর। মণিপুরে সুশাসন দেওয়ার নাম করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন অমিত শাহরা। গত চার বছর ধরে রাজ্যটা প্রতিদিন জ্বলছে কুকি আর মেইতেইদের জাতি দাঙ্গায়, কেন্দ্রের সরকার নির্বিকার। চারদিক অন্ধকারাচ্ছন্ন, ভয়ের রাজত্ব। মোদিজি একবারও যাওয়ার সময় পাননি। অপদার্থ মুখ্যমন্ত্রীকে বদলানোর হিম্মতও হয়নি। ভরসা কি শুধু মুখে বললেই সঞ্চারিত হয়? দেশের সর্বশক্তিমান নেতা একবার রক্তাক্ত ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে গিয়ে দাঁড়াবার প্রয়োজনটুকুও বোধ করলেন না! এই হচ্ছে গেরুয়া সুশাসনের উদাহরণ। এখন মণিপুরের তুলনায় কয়েক গুণ অতিরিক্ত আধাসেনা নামিয়ে শান্ত বাংলার জনপ্রিয়তম মুখ্যমন্ত্রীকে হেনস্তার চেষ্টা চলছে। ভবানীপুর যেন পহেলগাঁও! বাংলার মানুষ আগামী ২৯ এপ্রিল এই আগ্রাসনের জবাব দেবেন না?
যে দল বাংলায় এসে হিন্দিতে ক্ষমতা বদলের কথা বলেন তাঁদের কতটা বিশ্বাস করবেন? তাঁরাই আবার হাতরাস, উন্নাওয়ের পরও লখনউয়ের তখতে মহামান্য যোগী আদিত্যনাথকেই মুখ্যমন্ত্রী রাখতে বদ্ধপরিকর। সেখানে পরিবর্তন নৈব নৈব চ! লখনউয়ের রাজভবনে বসে থাকা রাজ্যপাল দেখতে পান না কিছুই। যত কলকাঠি বাংলায় এসে। এই বুঝি রাজধর্ম পালনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ! ডবল ইঞ্জিন রাজ্যের রাজ্যপাল থেকে সাধারণ মানুষ যে কেউ পরিবর্তনের স্লোগান দিলেই নিমেষে বুলডোজার পিষে দেবে আপনাকে। দাগিয়ে দেবে দেশদ্রোহী বলে। সিদ্দিক কাপ্পান, সোনাম ওয়াংচুকরা তা হাড়ে মজ্জায় জানেন। ভয়ের অন্ধকার সরিয়ে সেখানে ভরসার আলো ঢোকে না। ডবল ইঞ্জিন ওড়িশায় গত দু’বছরে গণধর্ষণ লাফিয়ে বেড়েছে, রাস্তাঘাটে নারী নির্যাতন জলভাতে পরিণত হয়েছে। অগত্যা যত কারিকুরি বাংলা আর বাঙালিকে নিয়ে। ভালোবেসে নয়, সম্মান জানিয়েও নয়, ভরসার আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যও নয়, এই রাজ্য ও রাজ্যবাসীর শতাব্দী-প্রাচীন নিজস্বতাকে খতম করতেই মেকি বাঙালি সাজার এই সস্তা নাটক।
সবচেয়ে বড়ো কথা গেরুয়া শিবির যে রাজ্যকে টার্গেট করে সেখানে প্রথমে তারা ভোটার তালিকাটাকেই আমূল বদলে ফেলে কমিশনের সৌজন্যে। এরাজ্যে যেমন নির্বাচনের আগে নাম বাদের কুনাট্য মঞ্চস্থ হয়েছে। ৮৩ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বাঙালিকে শায়েস্তা করার নামে, তেমনি দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে আবার সম্পূর্ণ
উলটপুরাণ। ওই দুই রাজ্যেই সাম্প্রতিক বিধানসভা ভোটে নাম ঢোকানোর তাস খেলেই এগিয়েছে গেরুয়া শিবির। বাদ দেওয়ার প্রহসন নয়, রহস্যজনকভাবে লাফিয়ে ভোটার বেড়েছে লোকসভা ও তার কয়েক মাস পর অনুষ্ঠিত বিধানসভা ভোটের মধ্যবর্তী সময়ে। বাংলায় যেমন ভূতুড়ে এসআইআর এবং লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির জোড়া আক্রমণে লাখ লাখ নাম বাদ গিয়েছে। দলবদলু হুংকার দিয়েছেন সওয়া এক কোটি নাম বাদ দিতে হবে। তেমনই নির্দেশ দিয়েছিল আরএসএস ও সদর দপ্তরও। কমিশন হুকুম তামিল করেছে মাত্র। মহারাষ্ট্রে বিগত লোকসভা নির্বাচনের পর মাত্র কয়েক মাসে ৫০ লক্ষ নাম যুক্ত হল কোন ম্যাজিকে। আকাশ থেকে পড়ল ভোটার! সেখানে মৃত কিংবা অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটার ছিল না!
অমিত শাহরা যতই বাংলায় এসে চেঁচান, একথা সবাই জানে প্রচুর বাংলাদেশি ‘ঘুসপেটিয়া’ দিল্লিতে বহাল তবিয়তে বসবাস করছেন। মহারাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছেন। অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরে তাদের অনেকেই বিজেপিতেও যে যোগ দেননি, তা কে বলতে পারে! গেরুয়া স্বার্থপূরণ হলেই তখন সাত খুন মাফ। লোকসভা নির্বাচনের পর মাত্র কয়েক মাসে দিল্লির ভোটার তালিকাতেও ৪ লক্ষ নাম তুলেছিল বিজেপি। ভোটের আগেই সেই চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যায়। তোলপাড় হয় দেশ। তারপর আশ্চর্য কারণে সবাই নীরব। আবগারি দুর্নীতিতে মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল গ্রেপ্তার হলেন। সেই ফাঁকেই রাতারাতি ৪ লক্ষ নাম উঠল। নিট ফল দিল্লিতে ক্ষমতা হারাল আপ।
কিন্তু তারপর? সব যখন মিটে গিয়েছে তখন আদালত বলল সিবিআই কোনো প্রমাণই হাজির করতে পারেনি। কেজরিওয়াল, মণীশ সিশোদিয়া বেকসুর। এই হচ্ছে প্রতিহিংসাপরায়ণ বিজেপির কর্মকাণ্ড। এভাবেই এরা একটার পর একটা রাজ্য দখল করে চলেছে।
বাংলায় যেমন আজ বিজেপি ‘পালটানো দরকার’ স্লোগান তুলেছে, তেমনি ৮ বছর আগে ত্রিপুরা দখলে তাদের প্রধান থিম ছিল ‘চলো পালটাই’। বিরোধীদের উপর অত্যাচার নামিয়ে আনা ছাড়া আর কিছু কি খুব বদলেছে। আজ বাংলায় যেমন সংকল্পপত্র প্রকাশ করে অনেক কথা বলা হচ্ছে, তেমনি ত্রিপুরায় মোদিজির আশ্বাসপত্রের নাম দেওয়া হয়েছিল ভিশন ডকুমেন্ট। সেখানে প্রথমেই লেখা ছিল, সরকার গড়ার পর প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই ত্রিপুরার সরকারি কর্মীদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন গঠন করা হবে। হয়েছে? আজও সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ মেনে আগরতলায় রাজ্য কর্মীদের বেতন দেওয়া হয় না। কেন্দ্রীয় সরকার যে হারে ডিএ দেয় তার চেয়ে অনেকটাই কম দেওয়া হয়। ফারাকটা কুড়ি শতাংশ। তাহলে বাংলায় ডবল ইঞ্জিনের জয়গান কেন? আরও বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই ৫০ হাজার যুবক যুবতীকে চাকরি দেওয়া হবে। বাস্তবে সেই লক্ষ্যপূরণ হয়নি। আজ বাংলা দখল করতেও একই কায়দায় ১ লক্ষ চাকরির গাজর ঝোলানো হয়েছে। অথচ গত ১২ বছর কেন্দ্রে দশ লক্ষ সরকারি পদ ফাঁকা। মোদি-অমিত শাহদের একবারও টনক নড়েনি। নিয়োগ বন্ধ। যাও বা সামান্য চাকরি হচ্ছে তা স্রেফ চুক্তিভিত্তিক। কেন্দ্রের নয়া শ্রম আইন সম্পূর্ণ শ্রমিক স্বার্থবিরোধী। দেশের সর্বোচ্চ নিয়োগ সংস্থা রেল, ব্যাংকিং ও বিমা জোর দিচ্ছে বেসরকারিকরণ আর আউটসোর্সিংয়ে। এই পরিস্থিতিতে চাকরি দেবে কে?
বাংলায় মমতার ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। ৫০০ টাকা করে প্রত্যেক মহিলাদের অ্যাকাউন্টে দিয়ে শুরু। বাড়তে বাড়তে তা আজ ১৫০০ টাকা হয়েছে। মাত্র চার বছরে বেড়ে তিন গুণ হয়েছে। চালু হয়েছে যুবকদের জন্য যুবসাথী। এই কিছুদিন আগেও বিজেপি নেতারা মমতার এই উদ্যোগের সমালোচনা করতেন। কিন্তু আজ মহিলা ভোট যার জয়ও তার। একথা প্রমাণ হতেই মমতাকে টুকে একের পর এক রাজ্যে মহিলাদের নগদ অর্থ দিতে ঝাঁপিয়েছে গেরুয়া সরকার। বাংলাতেও ৩ হাজার টাকা মহিলাদের অ্যাকাউন্টে ফেলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দিল্লিতে, বিহারে হালে ভোটের আগে দেওয়া আশ্বাস রাখা হয়নি। সেই নির্মম অভিজ্ঞতার কথা বাংলার মহিলাদের কানেও পৌঁছেছে। বাংলার মহিলাকুল মনে করে মমতা না থাকলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পটাই বন্ধ হয়ে যাবে। যিনি শুরু করেছেন, প্রয়োজন পড়লে তিনিই আবার বাড়াবেন। তার জন্য খাল কেটে কুমির আনার দরকার নেই।
বিজেপি এই বাংলায় কল্পতরু হতে আসেনি, এসেছে উলটো ঝুলিয়ে বঙ্গ সমাজকে সবক শেখাতে। মুখ দিয়ে বারবার সেকথা বেরিয়েও পড়ছে অমিত শাহদের। মোদি বলছেন, হিসাব হবে। এমনিতেই এসআইআর বঙ্গে তিনশো লোকের প্রাণ কেড়েছে। বাঙালির অস্তিত্ব নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলে তারা কখনো বাঙালির নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে? দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে প্রত্যেক বাঙালি নিজেকে এই প্রশ্নটা করুন। তারপর ভোট দিতে যান। ভুল হলে পস্তাতে হবে বিলকুল।