


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: মারধর করতেন পুত্র-পুত্রবধূ। বাদ ছিল না মানসিক অত্যাচারও। তার জেরেই শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হলেন বৃদ্ধ দম্পতি। মঙ্গলবার রাতে পূর্ব যাদবপুর থানার মুকুন্দপুরে ফ্ল্যাটের মধ্যে থেকেই উদ্ধার হল তাঁদের ঝুলন্ত দেহ। মৃতদের নাম দুলাল পাল (৬৬) ও রেখা পাল (৫৮)। ঘর থেকে মিলেছে সুইসাইড নোটও। সেখানে ছেলে-বউমার অত্যাচারের উল্লেখ রয়েছে বলে পুলিস সূত্রে খবর। ভাই ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে বাবা-মাকে খুন করার অভিযোগ তুলেছেন দুলালবাবুর মেয়ে সঙ্গীতা সেনাপতি। থানায় লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন। বাবা-মাকে মারধর, আত্মহত্যায় প্ররোচনা সহ একাধিক বিষয় রয়েছে সেই অভিযোগপত্রে। তার ভিত্তিতে মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিস। আটক করা হয়েছে দুলালবাবুর ছেলে সৌরভ পাল ও তাঁর স্ত্রীকে।
সঙ্গীতাদেবী জানিয়েছেন, এয়ারপোর্ট লাগোয়া নারায়ণপুর এলাকায় তাঁদের বাড়ি ছিল। সেখানেই থাকতেন বাবা-মা ও ভাই। সৌরভ পেশায় ফিজিওথেরাপিস্ট। নায়ারণপুরে থাকাকালীনই ভাই বিয়ে করে। একটি সন্তানও হয়। কিন্তু এর মধ্যে অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায় সৌরভ। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদও হয়। যে তরুণীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছিল ভাই, সে-ই টাকা দিয়ে সাহায্য করে। তাঁর কথাতেই সৌরভ বাবা-মাকে বোঝায় যে, নারায়ণপুরে থেকে কাজ করতে অসুবিধা হচ্ছে। ইএম বাইপাসের ধারে মুকুন্দপুরে ফ্ল্যাট নিলে রোগীর সংখ্যা বাড়বে। বাবা-মাকে বাধ্য করে নারায়ণপুরের বাড়িটি বিক্রি করতে। ভাইয়ের চাপে বাড়ি বিক্রি করা হয়। বছর দেড়েক আগে ২২ লক্ষ টাকা দিয়ে মুকুন্দপুরে ফ্ল্যাট কেনে সৌরভ। তারপর ওই তরুণীকে বিয়ে করে বাবা-মার সঙ্গে থাকছিল।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেছে পুলিস। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, দুলালবাবু ও তাঁর স্ত্রীকে ঘরের যাবতীয় কাজ করাতেন পুত্র ও পুত্রবধূ। কাজ করতে না পারলে তাঁদের মারধর করা হতো। মেয়ে সঙ্গীতার অভিযোগ, বাবা-মাকে ওষুধ খেতে দিতেন না ভাই ও তাঁর স্ত্রী। অথচ বাইরের লোকজনের কাছে ভালো সাজতে ওষুধের খালি পাতা এনে দেখাত। প্রতিদিন মা-বাবার উপর অমানুষিক অত্যাচার করা হতো। কয়েকদিন আগে তাঁদের মাথা দেওয়ালে ঠুকে দেয় সৌরভ ও তার স্ত্রী। বিষয়টি মেয়েকে জানিয়েছিলেন বাবা-মা। সঙ্গীতাদেবীর আরও বক্তব্য, মাসছয়েক আগে তাঁর অপারেশন হয়। বাবা-মাকে তখন তাঁর কাছে যেতে দেওয়া হয়নি।
জানা গিয়েছে, প্রতিদিন বাবা-মার সঙ্গে ফোনে কথা বলতেন সঙ্গীতা। মঙ্গলবার বিকেলের পর ফোন করে পাননি কাউকেই। তখন ফ্ল্যাটের নীচতলার এক প্রতিবেশীকে উপরে গিয়ে দেখতে বলেন। তিনি এসে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখেন, ডাইনিংয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছেন দুলালাবাবু। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি তিনি জানান সঙ্গীতাকে। পুলিসে খবর দেওয়া হলে রাত ন’টা নাগাদ ফ্ল্যাটে আসেন থানার অফিসাররা। সকলের উপস্থিতিতে দরজা ভাঙা হয়। ভিতরে দুলালবাবুর পাশাপাশি সিলিংয়ে ওড়নার ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলছিল রেখাদেবীর দেহ। তদন্তে নেমে পুলিস জেনেছে, মঙ্গলবারও পুত্র ও পুত্রবধূর সঙ্গে অশান্তি হয় বৃদ্ধ দম্পতির। ছেলে ও তাঁর স্ত্রী কাজ চলে যান। রাতে আর বাড়ি ফেরেননি। এর মাঝেই সন্ধ্যায় এই ঘটনা।