


নিজস্ব প্রতিনিধি, জলপাইগুড়ি: মা দুর্গা হিসেবে আজও পূজিত হন দেবী চৌধুরানি! জলপাইগুড়ির বেলাকোবায় রয়েছে মন্থনীর মন্দির। বিগ্রহ বলতে সিংহাসনের উপর আসন করে বসা এক বধূ। যাঁর কপালে সিঁদুরের টিপ। পরনে লালপাড় সাদাশাড়ি। হাতে কোনও অস্ত্র নেই। মূর্তি দেখে বোঝা যায়, তিনি কোনও স্বর্গের দেবী নন। তিনি মর্ত্যের নারী! এই বিগ্রহকেই মা মন্থনী হিসেবে সারাবছর পুজো করেন এলাকার বাসিন্দারা।
তাঁদের বক্তব্য, মন্থনী ওরফে দেবী চৌধুরানি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জলপাইগুড়ির রাজা দর্পদেব রায়কতকে সাহায্য করা থেকে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে এলাকার দুঃস্থদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অকাতরে বিলিয়েছেন ধনসম্পদ। তাই তাঁকে দেবী দুর্গা হিসেবেই যুগ যুগ ধরে পুজো করে আসছেন স্থানীয়রা। সারাবছর মন্দিরে পুজো হলেও দুর্গাপুজোর সময় বেশ জাঁকজমক করে আরাধনা হয় ওই বিগ্রহের। পাশে প্যান্ডেল করে মহিষাসুরমর্দিনীর পুজো হয় বটে, কিন্তু মন্দিরে দুর্গা হিসেবে দেবী চৌধুরানির পুজোই এখানকার বিশেষত্ব।
গত ১৩ বছর ধরে মন্থনী মন্দিরে পুজো করে আসছেন সদরু রায়। বললেন, প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার পুজো হয়। এছাড়া কারও কোনও মানত থাকলে বিশেষ পুজো হয় সেদিন। দেবী চৌধুরানি হিসেবে ওই মন্দিরে আমরা মন্থনী মায়ের পুজো করে থাকি। তাঁকেই আবার মা দুর্গা হিসেবে পুজো করি।
স্থানীয় বাসিন্দা গোলাপ রায় বলেন, পুজোর ইতিহাস জানা নেই। তবে মা মন্থনী কিংবা দেবী চৌধুরানি যাই হোক না কেন, পুজো ঘিরে আমরা আনন্দে মাতি। বড়দের মুখে শুনতে শুনতে আমাদেরও বিশ্বাস, মা মন্থনীই আজও আমাদের সবাইকে রক্ষা করে চলেছেন।
জলপাইগুড়ির আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক উমেশ শর্মা বলেন, পূর্ববাংলার মন্থনা এস্টেটের রানি ছিলেন দেবী চৌধুরানি। ১৭৭৩ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফকির ও সন্ন্যাসীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি রাজা দর্পদেব রায়কতকে সাহায্য করেছিলেন। তিস্তার বুকে সেই যুদ্ধে পরাজিত হন দর্পদেব। ফলে তাঁকে ১৮ বছর বন্দি করে রাখা হয় রংপুর জেলে। আমাদের ধারণা, এই প্রেক্ষাপটেই বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৮৬ সালে ‘দেবী চৌধুরানি’ উপন্যাস লেখেন। তাঁর দাবি, চরম সঙ্কটের সময়ে স্থানীয় দুঃস্থ মানুষের ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মন্থনার রানি অর্থাৎ দেবী চৌধুরানি। ধনীদের কাছ থেকে ভবানী পাঠকের লুট করে আনা সম্পদ তিনি বিলিয়ে দিতেন সাধারণ মানুষের মধ্যে। এভাবেই মানুষ থেকে দেবী হয়ে যান মন্থনী।
বেলাকোবার শিকারপুরে দেবী চৌধুরানির বড় মন্দির রয়েছে। সেখানেও সারাবছর পুজো পান দেবী চৌধুরানি ও ভবানী পাঠক। ওই মন্দিরে রয়েছে তিস্তাবুড়ি, গঙ্গাদেবী, সিদ্ধপুরুষ মোহনলালের মূর্তি। এছাড়াও রয়েছে দুই সশস্ত্র প্রহরীর মূর্তি। তাঁরাও যুগ যুগ ধরে পূজিত হয়ে আসছেন। শিকারপুরের মন্দিরেও দুর্গাপুজো হয়ে থাকে।- নিজস্ব চিত্র