


বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। কারণ বর্তমান বিধানসভার মেয়াদ ফুরোনোর আগেই পরবর্তী বিধানসভা গঠনের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেলতে হবে। সেদিক থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন এপ্রিল মাসের মধ্যেই সুসম্পন্ন হওয়া জরুরি। এরাজ্যে বর্তমান বিধানসভার মেয়াদ আগামী ৭ মে পর্যন্তই। শুধু বাংলা নয়, এই দফায় বিধানসভা ভোটগ্রহণ পর্বে প্রবেশ করতে চলেছে আরো চারটি রাজ্য। সেগুলির মধ্যে বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে তামিলনাড়ুতে ১০ মে, অসম ২০ মে, কেরল ২৩ মে এবং পুদুচেরি ১৫ জুন। আমাদের দেশ নির্বাচন ঘোষণার একটি স্বস্তিদায়ক ঐতিহ্য বহন করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কথা ছিল না। তবু বাংলার মানুষ স্বস্তিতে নেই। কারণ বিহারে বিধানসভা ভোট মিটতেই এরাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্বচ্ছ ও নিখুঁত ভোটার তালিকার ভিত্তিতে নির্বাচন সকলেই চায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তেমন ভোটার তালিকা উপহার দেওয়ার অছিলায় এসআইআরের নামে যে বাড়াবাড়ি জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) করে চলেছে তা একটি বেনজির দৃষ্টান্ত। ইসিআইয়ের অতিসক্রিয়তা কিছু ক্ষেত্রে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সাধারণ ভোটার থেকে বিএলও পর্যন্ত বেশকিছু মানুষ তার শিকার হয়ে পড়েন। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, কিছু লোক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং প্রাণও গিয়েছে কয়েকজনের!
তারপরেও পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করতে পারেনি কমিশন। লক্ষ লক্ষ নাম এখনো ‘বিচারাধীন’ (আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন)। অর্থাৎ ঝুলে থাকা নামগুলির নিষ্পত্তি করা হবে বিচারকদের তত্ত্বাবধানে। মানুষের ব্যাপক হয়রানি এবং ভোটাধিকার হরণের চেষ্টার অভিযোগে টানা কয়েকমাস রাজ্য-রাজনীতি উত্তাল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনে বারবার দরবার করার পরেও সুরাহা মেলেনি। বাধ্য হয়েছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে সওয়াল করতে। তারপরই বিষয়টিতে শীর্ষ আদালত হস্তক্ষেপ করেছে। ভোটার তালিকার সেই অ্যাডজুডিকেশন চলছে। তবে ঠিক কবের মধ্যে আপত্তিগুলির নিষ্পত্তি হবে এবং পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে পারবে কমিশন, সেই ব্যাপারে সদুত্তর এখনো মেলেনি। কমিশনের ফুল বেঞ্চ দুদিনের রাজ্য সফর সেরে সবে দিল্লি ফিরে গিয়েছে। কমিশনের বঙ্গসফরে নেতৃত্ব দেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। মঙ্গলবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা দুদিন ধরে রাজনৈতিক দল এবং ভোটের কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এবার দিল্লিতে যাবতীয় বিষয় পর্যালোচনার পর ভোট ঘোষণা করা হবে।’ প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি অ্যাডজুডিকেশন তালিকা প্রকাশের আগেই ভোট ঘোষণা হয়ে যাবে? প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান জ্ঞানেশ কুমার। তিনি আরো যোগ করেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশমতো ভোটারদের যোগ্যতা যাচাইয়ের কাজ এগিয়েছে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ মাফিকই প্রকাশ করা হবে তালিকা।’ অর্থাৎ, ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা থেকে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশের বিষয়টি সুকৌশলে পৃথক রেখেছেন তিনি। বরং তাঁর ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, ‘জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুসারে ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা বাদ দিলে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার ৬ কোটি ৪৪ লক্ষ ৫২ হাজার ৬০৯।’ অর্থাৎ, ২০২৫ সালের থেকে ১.২০ কোটি কম। ইসিআই কর্তা এও বলেন, ‘সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২৬ অনুযায়ী যাঁরা ভারতীয় নাগরিক গণ্য হবেন, ভোটাধিকার পাবেন শুধুমাত্র তাঁরাই।’
তাই রাজনৈতিক মহলের আশঙ্কা, কমিশন শীঘ্রই ভোট ঘোষণা করতে চলেছে। বাকি চার রাজ্যে বাংলার মতো জটিলতা এবং সমস্যা নেই। তাই তারা হয়তো আপত্তি করবে না। ভয়ানক সমস্যায় পড়বে মূলত বাংলা। সোজা কথায়, লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েই ভোটের ঢাকে কাঠি নেড়ে দিতে তৈরি কমিশন। রাজনৈতিক দিক থেকে অধিক সচেতন বাংলায় ভোট একটি বৃহৎ উৎসবই বটে। আর সেখানকারই লক্ষ লক্ষ মানুষকে জোরপূর্বক বিচ্ছিন্ন বা বাইরে রেখে এমন উৎসব সম্পূর্ণ হতে পারে না। তাই নির্বাচন ঘোষণার আগে যোগ্য সকলের নাম তালিকাভুক্ত করার দায়িত্ব কমিশনকেই নিতে হবে। একজনও যোগ্য ব্যক্তি যেন বঞ্চিত না হন, এটা নিশ্চিত করতে হবে জ্ঞানেশ কুমারকেই। হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট দেখিয়ে পার পাবে না ইসিআই। এমনকি তাদের গাফিলতি এবং ‘অবাঞ্ছিত রাজনীতি’র কারণে কোনোরকম সাংবিধানিক সংকট উপস্থিত হলে তার দায়ও বর্তাবে কমিশনের উপর। বাংলার মানুষের আশা, ইসিআই সেই হঠকারিতার ভুল করবে না। প্রত্যেকের ভোটাধিকার দ্রুত নিশ্চিত করে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তৎপর হবে তারা।