


সৌম্যজিৎ সাহা, সাগর: লট এইট ফেরিঘাটে অপেক্ষা করছিলেন সত্তরোর্ধ্ব জানকীনাথ মাইতি। সঙ্গে ব্যাগপত্র, ফ্লাস্ক, বালিশ ও অন্যান্য জিনিসপত্র। দেখে মনে হল হাসপাতাল থেকে ফিরছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মেয়েকে ডায়মন্ডহারবার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভরতি করিয়েছিলেন। ছাড়া পাওয়ার পর বাড়ি ফিরছেন তাঁকে নিয়ে। অসুস্থ শরীরেও ধকল সহ্য করে সড়ক, নদীপথ পেরিয়ে যেতে হবে রোগীকে।
গঙ্গাসাগর সেতু হয়ে গেলে কতটা সুবিধা হবে? সেই প্রশ্ন ছেড়ে দিতেই, জোর গলায় বলে উঠলেন বেঁচে যাই। এইভাবে যাতায়াত করা খুবই কঠিন। ব্রিজ হয়ে গেলে সরাসরি সাগর থেকে গাড়ি ধরে নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছে যাব। সাগরবাসীর কাছে এটি হবে বড়ো প্রাপ্তি হবে। তাঁর মতোই কিশোর মান্না, সাবিত্রী মণ্ডলরাও একই মত পোষণ করলেন। আসন্ন নির্বাচনে এই সেতু ঘিরেই তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক চর্চা। দীর্ঘদিনের মানুষের এই দাবি বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে তৃণমূল এই বিষয়টিকে হাতিয়ার করে প্রচার চালাচ্ছে। ভোটের আগে থেকে মানুষের আবেগে শান দিতে শুরু করেছিল তারা এবং এখনো এই সেতুই প্রাধান্য পাচ্ছে বিভিন্ন সভায়।
উলটো দিকে বিরোধীরা পুরানো ইস্যু নিয়েই প্রচারে নেমেছে। এমন একটা ইস্যু নিয়ে শাসক দল নেমেছে যার বিরোধিতা করতে পারবে না বাম বিজেপিসহ কোনো বিরোধী দলই। তাই পালে হওয়া টানতে নানারকম কটাক্ষের সুর শোনা যাচ্ছে তাদের গলায়। যদিও সাগরের বাসিন্দাদের অনেকেই জানিয়েছেন, তাঁরা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষিত এই প্রকল্পের ব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী। ইতিমধ্যে সেতু তৈরির প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে, যা দেখে দীপাঞ্চলের মানুষজন এখন আশায় বুক বেঁধেছেন।
২০১৬ থেকে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট বেড়েছে বঙ্কিমবাবুর। দুবারই তিনি লক্ষাধিক ভোট পেয়েছিলেন। চারবারের বিধায়ক এই প্রাক্তন মাস্টারমশাই এখন পঞ্চমবার জেতার লড়াইয়ে নেমেছেন। বামেদের বেশিরভাগ ভোট চলে গিয়েছে বিজেপিতে। এবার এই আসনে পদ্ম ফোটাতে তাই গেরুয়া শিবির সাগর বিধানসভার অন্তর্গত নামখানা থেকে প্রার্থী দিয়েছে। কারণ কখনোই এই অঞ্চল থেকে কোনো দলের প্রার্থী ভোটে দাঁড়ায়নি। স্থানীয় আবেগ কি এই ক্ষেত্রে ভোটের ফ্যাক্টর হতে পারে? বিজেপি প্রার্থী সুমন্ত মণ্ডল অবশ্য বলছেন যে, মানুষ যেটা ঠিক করবেন, সেটাই হবে। আলাদা করে আবেগের কোনো জায়গা নেই।
প্রচারে ব্রিজের পাশাপাশি তৃণমূল উন্নয়নের তালিকা তুলে ধরলেও বিজেপি বা সিপিএম সেই বেহাল নদীবাঁধ, খারাপ স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রভৃতিকে তুলে ধরছে। তবে তাদের দাবির সঙ্গে যে বাস্তবে সবটা মিলছে না, সে-কথা মানছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের কথায়, উপকূল এলাকা যেমন গঙ্গাসাগর, সুমতিনগর, বঙ্কিমনগর, পাতিবুনিয়াসহ বেশকিছু জায়গায় স্থায়ী বাঁধের কাজ হয়েছে। তবে আরো কিছু জায়গায় হলে ভালো।
কিন্তু গঙ্গাসাগর সেতুর ব্যাপারে দলমত নির্বিশেষে একমত, মুড়িগঙ্গা নদীর উপর ব্রিজ দরকার। কিন্তু রাজ্য যখন এই উদ্যোগ নিয়েছে তখন তার কৃতিত্ব দিতে নারাজ বিরোধীরা। বিজেপি প্রার্থী বলেন, এটা ভোটের আগে গিমিক ছাড়া কিছু নয়। বরং ভালো হতো কেন্দ্র রাজ্য সমঝোতা থাকলে। আন্তর্জাতিকমানের ব্রিজ হতো।
অন্যদিকে, সিপিএম প্রার্থী স্বপন সিংহের দাবি, এই নদীর উপর সেতু তৈরির ডিপিআর কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা আটকে দেওয়া হয়। ফলে এখন রাজ্য যেটা করতে উদ্যোগ নিয়েছে সেটা যতক্ষণ না সম্পন্ন হবে ততক্ষণ মানুষ বিশ্বাস করবে না।
সূত্রের খবর, সেতুর কাজের অগ্রগতি বলতে মাটি পরীক্ষা হয়েছে। তার সঙ্গে চলছে অন্যান্য কাজও। সাগরের কসতলায় সেতু তৈরির যন্ত্রাংশ ও কর্মীদের থাকার জায়গা ভাড়ায় নিয়েছে নির্মাণ সংস্থা।
এদিকে, বিরোধীদের পালটা জবাব দিয়ে তৃণমূল প্রার্থী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা বলেন, কেন্দ্র সাহায্য করেনি। কিন্তু সাগরের মানুষের কথা ভেবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ব্রিজ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রথম পর্যায়ের কাজও শুরু হয়েছে। বিরোধীরা অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাতে লাভ হবে না। কারণ মানুষ দেখতে পাচ্ছে যে এটা শুধু মুখের কথা নয়, বাস্তবে সেটা হচ্ছেও।