


ডঃ সায়ন্তন মজুমদার: ‘নারায়ণী’ বলতে মূলত আমরা লক্ষ্মীদেবীকেই বুঝে থাকি। বাঙালির ঘরে, বন্দেমাতরম্ রাষ্ট্রগীতে, দুর্গোৎসবের প্রতিমায় দুর্গা এবং লক্ষ্মী পারস্পরিক সহাবস্থানে মাতা ও দুহিতায় পরিণত হয়েছেন। মহা আড়ম্বরে শারদার পূজান্তে শারদীয়া দেবীপক্ষের অন্তিমে কোজাগরী পূর্ণিমার স্নিগ্ধতায় পূজিতা হন দেবী কমলা।
‘শ্রীশ্রীচণ্ডী’তেও আমরা দেবী মহালক্ষ্মীকে পাই। এই গ্রন্থের একাদশ অধ্যায়ে দেবতারা কাত্যায়নীর স্তব করার সময় বারবার ‘নারায়ণী’ শব্দ উচ্চারণ করেছেন। শব্দটির মধ্যে রয়েছেন লক্ষ্মীপতি নারায়ণও। রামায়ণ এবং মহাভারতকে আমরা ‘নারায়ণী কাব্য’ বলতেই পারি। উভয় গ্রন্থে যথাক্রমে রাম এবং কৃষ্ণ হলেন নারায়ণেরই দ্বিবিধ সর্বাত্মক রূপ। কাজেই রামকথাই হোক বা ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ কথাই হোক, লক্ষ্মীকে সেখানে কিছু আয়াসেই পাওয়া সম্ভব। এবার তাহলে আমরা আমাদের লক্ষ্যভেদে অগ্রসর হই।
নদীয়ার কবি কৃত্তিবাস ওঝা পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাল্মীকি-রামায়ণের বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। ব্রহ্মার সঙ্গে শলাপরামর্শ করে যখন নারায়ণ মানবমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করার কথা পাকা করে ফেলেছেন ঠিক তখনই লক্ষ্মী জুড়ে দিয়েছিলেন কান্না। ব্রহ্মা তখন তাঁরও ব্যবস্থা করে দেন। কৃত্তিবাস শ্রীহরির জন্মকথার আগেই ‘লক্ষ্মীর জনম’ বর্ণনা করেছেন—‘শ্রীহরির জন্ম-কথা থাকুক এখন। /আগেতে কহিব মাতা লক্ষ্মীর জনম।।’ মিথিলার রাজা জনক প্রথম জীবনে ছিলেন ঋষি। তিনি একবার অপ্সরা উর্বশীকে দেখে মোহিত হয়ে পড়েন। তার ফলবশত পৃথিবীর অভ্যন্তরে এক ডিম্বের জন্ম হয়। বহুকাল তা ধরিত্রীর মধ্যেই লালিত হয়। জনক রাজা হলে একদিন ভাবী বেয়াই দশরথের মতোই পুত্র কামনায় যজ্ঞ করার জন্য ক্ষেত্রকর্ষণ বা জমি চাষ শুরু করেন। তাঁর লাঙলের ফলায় তখন সেই ডিম্ব উঠে আসে। জনক সেটি ভেঙে লক্ষ্মীর সমান এক কন্যারত্ন পান। দৈববাণীর কারণে জনক তাঁকে ঘরে তুলে নিলে ‘দিনে দিনে বাড়ে লক্ষ্মী জনকের ঘরে।।’ চামরের মতো তাঁর ঘন চুল, পাকা তেলাকুচো বা বিম্ব ফুলের মতো লাল ঠোঁট, মুঠোয় ধরতে পারা ক্ষীণ কোমর সর্বোপরি তাঁর পায়ের আঙুলগুলি ছিল হিঙ্গুলরাঙা। জমির শিরাল বা আলে তাঁর জন্ম বলে নাম রাখা হয়েছিল সীতা। আদি কাণ্ডে কৃত্তিবাস লিখেছেন, ‘যেই জন শুনে এই লক্ষ্মীর জনম। /ধনে পুত্রে লক্ষ্মী তারে দেন নারায়ণ।।’ মজার বিষয় এই, সীতারূপে লক্ষ্মীর জন্ম আগে বর্ণিত হলেও রামরূপী নারায়ণের যখন সাত বছর বয়স তখন লক্ষ্মী জন্মেছিলেন।
আশ্চর্যের বিষয়, অধুনা পূর্ব বর্ধমানের কবি কাশীরাম দাসের অনূদিত মহাভারতের বনপর্বেও রামায়ণের কাহিনি লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেখানেও যজ্ঞভূমি চাষ করে মিথিলার রাজর্ষি জনকের, কন্যা প্রাপ্তির কথা রয়েছে—
‘তথায় জন্মিল লক্ষ্মী অযোনীসম্ভবা।
পাইল লাঙ্গলমুখে পরম দুর্লভা।।’
দেবতারা জনককে বলে দিয়েছিলেন, ‘লক্ষ্মীর সমান এই তোমার জানকী।’
পরবর্তীতে লক্ষ্মীকে আমরা পাই অশ্বমেধ পর্বে। সেই অংশটি হয়তো কাশীরামের রচনা নয়। তাঁর উত্তরাধিকারীদের রচনা হতে পারে। কেননা সপ্তদশ শতাব্দীতে আদি, সভা, বনপর্ব সহ বিরাট পর্বের কিছুটা রচনা করেই কাশীরাম প্রয়াত হয়েছিলেন। সেই পর্বে রাজা জন্মেজয় বৈশম্পায়নের কাছে জানতে চান পৃথিবীর প্রতি লক্ষ্মীর অভিশাপ প্রদানের কাহিনি। সত্যিই তো, রামায়ণ অনুযায়ী মাতা বসুমতীকে কেন শাপিত করেছিলেন দেবী কমলা? কিন্তু মহাভারত পাঠ করলে বোঝা যায় পৃথিবীই আগেভাগে সুস্থিরা লক্ষ্মীর সঙ্গে ঝগড়া করতে গিয়েছিলেন। আসলে বিনা তপস্যায় নারায়ণের বক্ষবিলাসিনী বলে কথার খোঁচায় লক্ষ্মীকে খোঁটা দিয়েছিলেন তিনি। তার উপর লক্ষ্মীনারায়ণের বিচ্ছেদ করাবেন বলে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ করে বসেছিলেন পৃথিবী। রেগে গিয়ে লক্ষ্মী রাজা নীলধ্বজের রানি জনার কন্যা স্বাহারূপে পৃথিবীতে জন্মানোর অভিসম্পাত দিয়ে ফেলেন ধরিত্রীকে। তিনিও লক্ষ্মীর মুখের উপর সপাটে বলে দিয়েছিলেন, ‘নারায়ণ সহ দেখা নহিবে তোমারে।।’ তাই হয়তো রাধাকৃষ্ণের অথবা রামসীতার মিলন সম্ভব হয়নি।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে রামায়ণের অনুবাদকরূপে বাঁকুড়া জেলায় আমরা পাই দুইজন কবিকে। তাঁরা আবার ছিলেন পরস্পর পিতাপুত্র—জগদ্রাম রায় এবং রামপ্রসাদ রায়। সেখানে আমরা দেবর্ষি নারদের অভিশাপে লক্ষ্মী-নারায়ণকে সীতা এবং রামচন্দ্ররূপে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে দেখি। একদিন বৈকুণ্ঠে গায়ক কৌষিকের গান শুনছিলেন শ্রীহরিসহ অন্যান্য দেবদেবী। হঠাৎ লক্ষ্মী এসে হাতে বেত ধরে থাকা তাঁর কোটি দাসীদের দিয়ে দেবতাদের সেখান থেকে তাড়িয়ে দেন। এতে নারদ অপমানিত হয়ে লক্ষ্মীকে অভিশাপ দেন,
‘যেমতি রাক্ষসী বুদ্ধি কৈলি হরিপ্রিয়া।
তেমতি রাক্ষসী গর্ভে জনমহ গিয়া।।’
নারায়ণ তখন নারদের প্রতি অনুযোগ করতে ছাড়েন না—
‘সৃষ্টি স্থিতি কিবা লয়, যাহার আশ্রয়ে হয়,
লক্ষ্মী ছাড়া মোর নাই মূল।
কোপের হইয়া বশ, ই কোন করিলে যশ,
কেন মুনি হৈলে প্রতিকূল।।’
তখন নারদও অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে লক্ষ্মীর স্তব করতে থাকেন,
‘মহাযুদ্ধে মহামারী,গ্রামে গ্রামে গ্রামেশ্বরী,
গৃহদেবী তুমি ঘরে ঘরে।’
নারদের স্তুতিতে শেষ পর্যন্ত সন্তুষ্ট হন লক্ষ্মী। তিনি নারদকে উলূক অর্থাৎ প্যাঁচার কাছে গান শিখতে পাঠান। আমরা সকলেই জানি প্যাঁচার ডাক অত্যন্ত কর্কশ। কিন্তু কাব্যে মানস পর্বতে প্যাঁচার কাছেই গন্ধর্ব, যক্ষ, কিন্নর, অপ্সরাদের আমরা গান শিখতে দেখি। পাশাপাশি লক্ষ্মী যে গান শুনতে বড়োই ভালোবাসেন সে কথাও গোপন থাকেনি, ‘গান মোর প্রাণ হয় আন কিছু নয়।।’ এরপর নারদের শাপবাক্য অবশ্যম্ভাবী জেনে লক্ষ্মী তাঁর কাছে একটি প্রার্থনা করে বসেন। ভবিষ্যতে রাক্ষসীগর্ভে তাঁর জন্ম হলেও তিনি মুনিঋষিদের রক্তে আবির্ভূতা হতে চান,
‘সে শোণিতে রাক্ষসীতে করিবে ভক্ষণ।
তাহে জন্ম নিব ওহে শুন তপোধন।।’
অদ্ভুত যোজনায় পরবর্তীকালে রাবণ শক্তিশালী হয়ে মুনিঋষিদের উপর অত্যাচারের নিদর্শনরূপে এক কলসি ব্রহ্মরক্ত সংগ্রহ করে রাখেন। ঘটনাচক্রে গোপনে তাঁর পাটরানি মন্দোদরী সেই রক্ত খেয়ে সন্তানসম্ভবা হন—
‘নারদের শাঁপ সত্য করিতে কমলা।
রাক্ষসী উদরে রক্তযোগে জন্মনিলা।।’
কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে রানি গর্ভস্থ ভ্রূণকে পৃথিবীর মধ্যে পুঁতে দেন। জায়গাটি ছিল কুরুক্ষেত্র। কাশীরাম দাসের মহাভারতে আমরা রামায়ণকে পেয়েছিলাম। আর এই রামায়ণের মধ্যে আমরা কুরুক্ষেত্রের মাধ্যমে যেন মহাভারতকে পেলাম। এই স্থানই হয়ে উঠেছিল লক্ষ্মীর লীলাক্ষেত্র,
‘কুরুক্ষেত্রে মহালক্ষ্মী মৃত্তিকা ভিতরে।
প্রণিধান করহ প্রকট যে প্রকারে।।’
পরবর্তীতে সীতারূপে তাঁর প্রকট হওয়ার কথা আমরা সকলেই জানি।
কবি জগদ্রাম এবং রামপ্রসাদ রায় লক্ষ্মী প্রসঙ্গে আমাদের মনের কথা যেন প্রকাশ করেছিলেন,
‘কমলা করেন কেলি মৃত্তিকা ভিতরে।
পৃথিবী পরশ প্যেয়ে ধন্য ধন্য করে।।’
দেবী লক্ষ্মী এই মাটির পৃথিবীতে বিরাজিত হলে আমরা যথার্থই ধন্য হতে পারি। কোজাগরীর রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে জগতে লক্ষ্মীশ্রী চিরজাগ্রত থাকুক এই কামনা করি।
লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক