


ভগীরথ মিশ্র
শৈশবে নববর্ষ আর বোঁদের নাড়ু আমার কাছে সমার্থক ছিল। তার অধিক কিছু নয়। আমাদের গ্রামে একমাত্র মুদি-মশলার দোকানটি ছিল হাজরাদের। সেখানে আমাদের মাসকাবারি বন্দোবস্ত ছিল। সারা মাস মাল খেয়ে পরের মাসে দাম মেটাতেন বাবা। হাজরা’রা ফি-বছর পয়লা বৈশাখে হালখাতা করত। গালভরা নাম ছিল তার। শুভ নববর্ষের হালখাতা উৎসব। লাল কালিতে হাতে লেখা একটি চিঠিও আসত বাবার নামে। আসলে, ওটা ছিল মাসকাবারি খদ্দেরদের সংবৎসরের বাকি-বকেয়া মেটানোর ‘উৎসব’। বাবা ফি-বছরই ওই ‘উৎসবে’ যোগ দিতেন। ট্যাঁকে থাকত সর্বশেষ বকেয়া পড়ে থাকা কিছু টাকা। আর, ওই ‘উৎসবে’ আমি থাকতাম তাঁর ছায়াসঙ্গী। পাওনাগন্ডা মিটিয়ে দেওয়ার পর, আমাদের দু’জনকেই দেওয়া হত একটা করে প্রমাণ সাইজের বোঁদের নাড়ু। আর, বাড়ির জন্য কাগজের ঠোঙায় মোড়া গুটিকয় মিষ্টি। বস্তুতপক্ষে, ওই প্রমাণ সাইজের নাড়ুটার জন্যই আমি বাংলা নববর্ষের দিনটাকে ভুলতে পারতাম না। কাজেই, বলতে পারি, আমার শৈশবে নববর্ষের প্রথম দিনটি ছিল সর্বার্থেই নাড়ুময়।
নববর্ষের মহিমা প্রথম টের পেলাম শহরের স্কুলে ক্লাস নাইনে ভর্তি হওয়ার পর। বেলদা গঙ্গাধর অ্যাকাডেমি। ওই স্কুলে মাখনবাবু আমাদের সমাজবিজ্ঞান পড়াতেন। এমনিতে মানুষটি ভালোই ছিলেন। কিন্তু শিক্ষকতার পাশাপাশি তাঁর একটি ‘ঘোড়ারোগ’ও ছিল। স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, গান্ধী-সুভাষের জন্মদিন গোছের দিনগুলোতে তিনি রাতারাতি লিখে ফেলতেন গান। ওই গানে সুরারোপ করবার দায়িত্ব চাপিয়ে দিতেন পরম শ্রদ্ধেয় ‘ডি এল রায় মশাই’য়ের ওপর। আসলে ডি এল রায়ের বিখ্যাত গানগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে গান লিখতেন মাখনবাবু। যেমন, স্বাধীনতাদিবস উপলক্ষ্যে ‘যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ’র অনুকরণে লিখেছিলেন, ‘যেদিন ব্রিটিশ শাসন হইতে মুক্ত হইল ভারতবর্ষ...’ কিংবা বিধান রায়ের আকস্মিক মৃত্যুর পরদিনই লিখে ফেললেন, ‘অমিত শক্তি, অমিত শৌর্য, হে বিধান তুমি কোথায় আজ/ অসহায় দেশ হতাশায় কাঁদে, বিনামেঘে শিরে পড়েছে বাজ...’। ১৯৬২ সালে চীন-ভারতের যুদ্ধ বাধল। চীনের হাতে ভারতের তখন লেজেগোবরে অবস্থা, তাও মাখনবাবু রাতারাতি লিখে ফেললেন, ‘লাদাক-নেফা’য় শান্তি ছিল সারা পাহাড় জুড়ে/ হিমালয়ের পারে ড্রাগন মরত মাথা খুঁড়ে।/ হঠাৎ পাহাড় বেয়ে উঠে,/ আসলো ভারত পানে ছুটে,/ বীর জওয়ানের অস্ত্রাঘাতে দ্রংষ্টা হল ক্ষয়,/ জয় ভারতের জয়, জয় ভারতের জয়, জয় ভারতের জয়...।/ হে নেতাজি, কোথায় আজি, এসো মোদের মাঝ/ তোমার আশিস মাথায় নিয়ে পরব রণসাজ।/ স্বর্ণ দেব, অর্থ দেব, রক্ত ও সামর্থ দেব,/ বীর সেনানীর বক্ষে মোরা দানবো বরাভয়/ জয় ভারতের জয়, জয় ভারতের জয়, জয় ভারতের জয়...।’ কেবল গান লিখেই ক্ষান্ত হতেন না মাখনবাবু। উঁচু ক্লাসের কিছু ছাত্রছাত্রীকে ডেকে নিয়ে দ্রুতলয়ে তালিম দিতেন। তারপর গলায় হারমোনিয়ম ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়তেন পথে। গান গাইতে গাইতে গোটা বেলদা বাজারটা পরিক্রমা করতেন বার-দু’তিন। স্কুলের সমস্ত ছাত্রকেই শামিল হতে হত সেই পরিক্রমায়। সে এক ক্লান্তিকর গলদঘর্ম ব্যাপার।
তো, নববর্ষ উপলক্ষ্যেও মাখনবাবু লিখে ফেললেন ‘নতুন বরষে নবীন হরষে জাগো রে ভারতবাসী...’ গোছের একটি গান। পয়লা বৈশাখ বেলা দশটা নাগাদ গলায় হারমোনিয়াম খচিত মাখনবাবুর নেতৃত্বে গোটা স্কুলের শ’পাঁচেক ছেলেমেয়ে পথ-পরিক্রমায় বেরল। বৈশাখের কাঠফাটা গরমে সেই পরিক্রমা চলল প্রায় দুপুর পর্যন্ত। তখন আমাদের এমনই গলদঘর্ম অবস্থা, স্কুল-কর্তৃপক্ষ আয়োজিত ছোলাসেদ্ধ-মুড়ি বিতরণের