


রাহুল চক্রবর্তী, কলকাতা: প্রতীক উর রহমান। বছর পঁয়ত্রিশের এক যুবক। কাঁধে লালঝান্ডা তুলে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন সিপিএমকে শক্তিশালী করবেন। নির্লোভ, আপসহীন লড়াইয়ের জন্য পার্টির স্বার্থে নিজেকে সঁপে দিতেও দ্বিধা বোধ করেননি। সর্বক্ষণের পার্টিকর্মী হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন হাত মুঠো করে গলার শিরা ফুলিয়ে আওয়াজ তুলবেন, ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।’ ওই পথে তিনি হাঁটা শুরুও করেছিলেন ছাত্র সংগঠনের সূত্র ধরে। এমনকি অকুতোভয় এই ছেলেটি তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের বিরুদ্ধে লোকসভা ভোটে প্রার্থী হয়ে লড়াইও দিয়েছিলেন। কিন্তু এতসবের পরেও আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের কর্তারা ওই ছেলেটির পাশে এসে দাঁড়াননি। সাহস জোগাননি। খোঁজ নেননি তাঁর। অভিযোগের পাহাড়ে জুটেছে বঞ্চনা আর তাচ্ছিল্য। ছেলেটির ভাষায়, ‘আমি রক্তাক্ত।’ গত দেড় বছর মুখ চেপে বসে থাকলেও এবার তিনি মনে করেছেন, ‘অনেক হয়েছে, আর না।’ তাই ক্ষোভের বিস্ফোরণ। সরাসরি সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকের সামনে একগুচ্ছ প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া। সিপিএমে ফেরত যাওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব বলে প্রকাশ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন প্রতীক উর। রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেওয়ার মনস্থির থেকে পিছু হটে এখন তাঁর বক্তব্য, ‘বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে আছি। উলটো দিকে ফুল বিছানো বাগানো হতে পারে, খাদ থাকতে পারে, মসৃণ রাস্তাও থাকতে পারে। বাঁক অতিক্রম করলেই সবাই উত্তর পেয়ে যাবেন।’
ইদানীং সিপিএমের তরুণ তুর্কিদের মধ্যে প্রতীক উর পরিচিত মুখ। ভালো বক্তা। লড়াইয়ের মানসিকতা রয়েছে। রাজনীতির প্রতিদিনের খবর তিনি রাখেন। সিপিএমের ছাত্র সংগঠন থেকে ধাপে ধাপে রাজনৈতিক পথ পেরোনোর সংকল্প নিয়েছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন সিপিএমে থাকতে। কিন্তু পার্টির কাছ থেকে তিনি যে আচরণ পেয়েছেন, তাতে মর্মাহত। সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিরুদ্ধে।
প্রতীক উর রহমানের কথায়, ‘সিপিএমের বর্তমান রাজ্য সম্পাদক চেয়েছিলেন আমাকে কোণঠাসা করে রখেতে। উনি ব্যক্তিস্বার্থের জন্য দলের ইমেজকে ব্যবহার করেছেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনা সিপিএমের জেলা সম্পাদকও আছেন এই তালিকায়। ওঁরা পার্টির অভ্যন্তরে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে রেখেছিলেন। ভয়ের চুপ থাকতে হবে। কোনো কথা বলা যাবে না। শুধু ওঁরা যা বলবেন, তাতেই সুর মিলিয়ে ‘ইয়েস স্যার’ বলতে হবে। যদি কেউ মুখ খোলে তাহলে সিপিএম পার্টিতে জায়গা থাকবে না।’
প্রতীকের আরও অভিযোগ, ‘পার্টির হোলটাইমারদের বাড়িতে হাঁড়িতে ভাত চড়ছে কি না কোনোদিন খোঁজ নেননি মহম্মদ সেলিম। সূর্যকান্ত মিশ্রর সময় কোনো কথা বলা হলে তিনি তা শুনতেন এবং পরে ডেকে পাঠিয়ে কথা বলতেন। এখন সিপিএম পার্টিতে গণতন্ত্র নেই। সিপিএম আমাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়েছে। আমি রক্তাক্ত।’
দলের অভ্যন্তরে মৌচাকে ঢিল মারার পর থেকে দিনভর সিপিএমের কমরেডদের কাছ থেকে কটূক্তি তাঁর দিকে ধেয়ে আসছে। এই অবস্থায় যাবতীয় জবাব দেওয়ার জন্য নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যেতে চলেছেন তিনি। তাঁর কথায়, সিপিএমে আর ফিরব না। বিধানসভা ভোটে সাম্প্রদায়িকতাবাদের বিরুদ্ধে প্রচার করব। সেইসঙ্গে অকপটেই তিনি জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সওয়ালকে কুরনিশ জানাই। আর এটা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে ডায়মন্ডহারবারে সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যথেষ্ট কাজ হয়েছে।