


দেবাঞ্জন দাস, বাগদা: সাম্রাজ্যে বড়সড় ফাটল! মতুয়া সংঘাধিপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য শান্তনু ঠাকুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই ঘোষণা করে দিল বাগদা! আভাস মিলেছিল গত ৩১ মার্চ। বিজেপির প্রার্থী ঘোষণার দিনই। নদীয়া লাগোয়া সন্তোষা-মঙ্গলগঞ্জ, নাটাবেড়িয়া, সিন্দ্রানীর মতো এলাকায় কানাঘুষো শুরু হয়েছিল সেদিনই। ঠাকুরবাড়ির বউমা সোমা ঠাকুর, এবার বাগদা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী! দাবানলের মতো খবর ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া জনপদে। শান্তনু ঠাকুর কথা দিয়েছিলেন, এবার বাগদায় লড়বেন কোনো ভূমিপুত্র বা কন্যা। তা না করে প্রার্থী করে পাঠিয়ে দিলেন নিজের স্ত্রীকে! কেন খেলাপ হল সে কথা? বিজেপির ঝান্ডা হাতে ‘প্রতিবাদ’ মিছিল শুরু হয়ে যায় সেদিনই। বাগদা পঞ্চায়েত সমিতি ও বিভিন্ন পঞ্চায়েতের বিজেপি সদস্য, মণ্ডলের কর্মকর্তারা সবাই হেঁটেছেন সেই প্রতিবাদ মিছিলে। বোধহয় এই প্রথম হেলেঞ্চা, গ্যাঁড়াপোতা, সুন্দরপুরের মতো গড়ে বনগাঁর বিজেপি সাংসদকে শুনতে হল—‘শান্তনু ঠাকুর মুর্দাবাদ’, ‘বহিরাগত প্রার্থী দূর হটো’। ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি করে জ্বলতে শুরু করে। মঙ্গলবার দুপুরে ‘ভূমিপুত্র’ দুলাল বর নির্দল হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বহিরাগত সোমা ঠাকুরের বিরুদ্ধে দুলাল বরকে সমর্থনের প্রশ্নে আড়াআড়ি ভাবে ভাগ হয়ে গিয়েছে বাগদা বিজেপি।
চৈত্রের দুপুরের প্রখর রোদেও নদীয়া লাগোয়া সন্তোষা-মঙ্গলগঞ্জের প্রাথমিক স্কুল চত্বরে জমাট ভিড়। স্থানীয়দের কাছে ভোট প্রার্থনায় এসেছেন তৃণমূলের প্রার্থী মধুপর্ণা ঠাকুর। মধুপর্ণা, ঠাকুর বাড়ির মেয়ে। তাঁর মা মতুয়াদের আরেক সংঘাধিপতি সাংসদ মমতা ঠাকুর। জমায়েতেই ছিলেন পেশায় কৃষক অশীতিপর রমেন বিশ্বাস। হরিচাঁদ ঠাকুর-শান্তিমাতার পরম ভক্ত। এ বয়সেও গাইঘাটার ঠাকুরবাড়িতে যান আরাধ্য ভজনে। এসআইআরের গুঁতোয় পরিবার-পরিজনের অধিকাংশের নাম বাদ পড়েছে। নাগরিকত্বের গাজর তো ঝুলেই রয়েছে। ক্ষোভ উগড়ে দিলেন বৃদ্ধ—‘শান্তনু ঠাকুরকে ভরসা করেছিলাম, ঠকেছি। ঘাট হয়েছে। ঠাকুরের ভজনা করতে আর কোনো ঠাকুরকে দরকার নেই আমাদের।’ মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন মধুপর্ণাকে। বাড়তি সংযোজন—‘মেয়েটা ঠাকুরবাড়ির! দেড়বছর ধরে এখানেই পড়ে রয়েছে। যদি জেতাতেই হয় মেয়েটাকে জেতাব। বউমা তো পরের বাড়ি থেকে এসেছে।’ ঠাকুরবাড়ির পরম্পরা আসলে কে বহন করছেন? প্রশ্নে সাবধানী মধুপর্ণা এবং সোমা ঠাকুর দু’জনেই। সম্পর্কে ননদ-বউদি। পারিবারিক সম্পর্ককে সরিয়ে রেখে রাজনীতির লড়াই চাইছেন দু’জনেই। মধুপর্ণার কথায়, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ন দেখেই মানুষ ভোট দেবেন। উপনির্বাচনে জেতার পর মাত্র দেড় বছর সময় পেয়েছি। মানুষ দেখেছেন, আমার চেষ্টাটা।’ স্বামী শান্তনু ঠাকুর গত সাত বছর ধরে বনগাঁর সাংসদ। কাছ থেকে দেখেছেন, শিখেছেন। ‘সেই অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগবে’—বলছেন সোমাদেবী। বাগদা বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি আহ্বায়ক প্রণব পাল যেন অসন্তুষ্ট হলেন। বলে উঠলেন, ‘উনি (সোমাদেবী) একজন ধর্মগুরুর স্ত্রী, গুরুমা। সেটাই যথেষ্ট।’
আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এখান থেকেই লড়াইটা শুরু করেছেন দুলাল বর। দু’বারের বিধায়ক দুলালবাবু বাগদাকে চেনেন হাতের তালুর মতো। প্রার্থী হিসেবে সোমা ঠাকুরের নাম ঘোষণা হওয়ার পর ক্ষোভের যে বহিঃপ্রকাশ হয়েছিল, সেটাকেই রসদ করে ভোটের ময়দানে দুলাল বর। বললেন, ‘বাগদার মানুষ ঠিক করেছেন, ঘরের ছেলেকে ভোটে লড়াবেন। তাঁদের সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। ধর্মগুরুর পরিচয় দিয়ে পরিবারতন্ত্র অনেক হয়েছে, আর নয়।’ একধাপ এগিয়ে রাজ্য বিজেপির মহিলা মোর্চার বিস্তারক সোমা সর্দার জানালেন, ‘ঠাকুরবাড়ি নিয়ে ব্যবসা শুরু হয়েছে, মেনে নেওয়া যায় না। কর্মীরা মার খাবে, আর ওরা লুটেপুটে বিদেশে সম্পত্তি করবে, হয় কী করে! তাই দুলাল বরকে সামনে রেখে বিদ্রোহ।’ অনাস্থার তিরে শান্তনু ঠাকুর...।