


সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: স্কুলে চাকরির সুবাদে প্রতিদিন কুলটি থেকে আসানসোল আসতে হয় শ্রীতমা পালকে। ভগৎ সিং মোড়ের ট্রাফিক সিগন্যাল পার করে দ্রুত বেরিয়ে যেতে মরিয়া তিনি। ওই স্কুলশিক্ষিকা নিত্য ভোগান্তির শিকার। তিনি বলেন, ভগৎ সিং মোড়, বিএনআর মোড়ের সিগন্যালে আটকে পড়লেই স্কুলে লাল কালির দাগ খেতে হবে। অতিরিক্ত গাড়ির চাপ। সিগন্যাল লাল থেকে সবুজ হতেই চার মিনিট সময় নিচ্ছে। তারপর গাড়ি, অটো পাশ কাটিয়ে যেতে আরও চার মিনিট। এভাবে তিনটি সিগন্যালে আটকে পড়লেই হয়ে গেল!
শুধু শ্রীতমা নয়, আসানসোলের রাস্তায় গাড়ির চাপ বাড়ছে, তা জানেন শহরের বাসিন্দারা। শহরে কী পরিমাণ গাড়ি বাড়ছে, তা পরিবহণ বিভাগের পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে শুধুমাত্র পশ্চিম বর্ধমান আরটিও অধীনেই ২৮হাজার ৭৯০টি নতুন যানবাহন রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। অন্যান্য আরটিও অফিসের তুলনায় রাজ্যে যা তৃতীয় সর্বাধিক। তারমধ্যে বাইক ও স্কুটিই রয়েছে ২২হাজার ৮৪১টি। মোটর কার নথিভুক্ত হয়েছে ৩০১৮টি, গুডস ক্যারিয়ার রয়েছে এক হাজার ২১টি। আসানসোলের মতো মেগা সিটিতে শুধু জেলায় রেজিস্ট্রেশন হওয়া গাড়িই ছোটে না। বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন জেলার গাড়িও ভিড় করে। শহরের সংকীর্ণ সড়কগুলি এই বিপুল সংখ্যক গাড়ির চাপ সামলাতে পারে না। বাধ্য হয়ে প্রতিনিয়ত ট্রাফিক সিগন্যালের যানজট লম্বা হচ্ছে। সময়মতো অফিস, হাসপাতালের মতো জরুরি প্রয়োজনে যেতেই দেরি হয়ে যাচ্ছে শহরের বাসিন্দাদের।
বহু মানুষ শখ মেটাতে বড় গাড়ি নিয়ে শহর ঘুরতে বেরিয়ে বাসিন্দাদেব বিড়ম্বনা বাড়াচ্ছেন। তা যানজটের অন্যতম কারণ। কিন্তু, এই যানজটের পিছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা শহরে বেলাগামভাবে চলা অটো, টোটো। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় টোটো নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধার কাজ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন শহরে টোটো চালাচল নিয়ন্ত্রণ করতে সফল হয়েছে কর্তৃপক্ষ। বীরভূম জেলাও এনিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতি নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। নদীয়াও এনিয়ে তৎপর। কিন্তু আসানসোল-দুর্গাপুরের মতো মেগা সিটির জেলা পশ্চিম বর্ধমানে এনিয়ে কোন উচ্চবাচ্য নেই। উপর থেকে চাপ এলে কখনও সখনও বেআইনিভাবে চলা টোটো বিক্রেতাদের শোরুম বন্ধের তোড়জোড় দেখা যায়। তারপর আগের অবস্থাতেই ফিরে যায়। যার ফলে লাফিয়ে বাড়ছে টোটো। শুধু আসানসোল শহরের বাসিন্দারা যে টোটো কিনে রাস্তা নেমে পড়ছেন তা নয়। বারাবনি, সালানপুর সহ বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকা থেকেই টোটো নিয়ে বাড়তি রোজগারের আসায় আসানসোল চলে আসছেন টোটোচালকরা। একই অবস্থা রানিগঞ্জ-জামুড়িয়ার ক্ষেত্রেও। টোটোগুলির কোনও টিন নম্বর দেওয়া যায়নি, কোনও রুটও নেই। এই পরিস্থিতিতে আসানসোল মহকুমাজুড়েই প্রায় ১০ হাজার টোটো রাস্তায় নামে বলে অভিযোগ। স্বাভাবিক কারণেই রাস্তাজুড়ে যানজট বাড়ছে। ভোগান্তি বাড়ছে সাধারণ মানুষের।
টোটোর পাশাপাশি আসানসোল আরও একটি বড় সমস্যা ঝাড়খণ্ড থেকে আসা বহু অটো। যেগুলির গতি অতি মন্থর। কোনও নির্দিষ্ট রুট পারমিট নেই। অনেকে ক্ষেত্রেই কেরোসিনে চলা এই যানগুলি ব্যাপক দূষণও ছড়ায়। ধীর গতির এই অটোগুলি জিটি রোডে গাড়ির গতি কমিয়ে দিচ্ছে। আসানসোল, জামুড়িয়া, রানিগঞ্জ থেকে কুলটি সব এলাকার মানুষ চায়, টোটোগুলির নির্দিষ্ট রুট দেওয়া হোক। কবে সেই পদক্ষেপ হবে সেদিকেই তাকিয়ে শহরবাসী। পশ্চিম বর্ধমান আরটিএ-র বোর্ড মেম্বার নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেন, টোটো চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে আলোচনা চলছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। (চলবে)