


নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: ‘টু বিএইচকে’ ফ্ল্যাটের দাম কোটি টাকা ছাড়িয়েছে চার মেট্রো শহরের বেশ কিছু এলাকায়। দিল্লি, মুম্বই, গুরুগ্রামের বহু ফ্ল্যাট অনায়াসে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে ১০-১৫ কোটি টাকায়। এমনকী তার বেশি দামেও।
শুক্রবার ভারতে প্রথম বিক্রি শুরু হল আইফোন সেভেনটিনের। তা কেনার জন্য মুম্বইয়ে অ্যাপলের আউটলেটের প্রবেশপথে এত ভিড় ছিল যে, তীব্র সংঘর্ষ বাধার উপক্রম। পুলিশ পোস্টিং পর্যন্ত রাখতে হয়। লক্ষাধিক টাকার এসব ফোন কেনার জন্য প্রথমদিনেই লাইনে যে মুখগুলি দেখা গিয়েছে, তারা একেবারে সাধারণ মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।
এই দুই চিত্রই বুঝিয়ে দিচ্ছে ভারতে ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে নিরন্তর। তারই প্রতিফলন দেখা গেল সাম্প্রতিকতম হারুন ইন্ডিয়া ওয়েলথ রিপোর্ট, ২০২৫-এ। সেই সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে, বিগত চার বছর ধরে ভারতবাসীর একাংশ শুধু যে ধনী থেকে ধনীতর হয়ে চলেছে। শুধু তা-ই নয়, প্রত্যেক আধঘণ্টায় বা ৩০ মিনিটে একটি করে ভারতীয় পরিবার হয়ে উঠছে ‘ডলার মিলিওনেয়ার’। ‘ডলার বিলিওনেয়ার’ এবং ‘ডলার মিলিওনেয়ার’ হল বিশ্বজুড়ে ধনী হওয়ার মানদণ্ড। ‘ডলার মিলিওনেয়ার’ তাদেরই বলা হয়, যাদের সম্পত্তির পরিমাণ সাড়ে ৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। ধনী হওয়ার নিরীখে এই অঙ্ক হয়তো বিরাট চোখ ধাঁধানো নয়। কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ! কারণ, এর অর্থ আপার মিডল ক্লাস এবং আপার ক্লাসের মধ্যে ধীরে ধীরে একটি নব্য ধনী শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছে ভারতে। সাম্প্রতিক এই রিপোর্ট বলছে, মাত্র চার বছরের মধ্যে তাদের সংখ্যা এক ধাক্কায় ৯০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ২০২১ সালেও ভারতে সাড়ে ৮ কোটি টাকার সম্পদ সংবলিত ‘মিলিওনেয়ার’ পরিবার ছিল ৪ লক্ষ ৫৮ হাজার। আর ২০২৫ সালে তা হয়েছে ৮ লক্ষ ৭১ হাজার পরিবার।
হারুন ইন্ডিয়া ওয়েলথ রিপোর্টের চিত্তাকর্ষক তথ্য হল, সবথেকে বেশি হারে বেড়ে চলেছে এই শ্রেণিটি। অর্থাৎ গরিব থেকে মধ্যবিত্ত হওয়ার শতকরা হার, মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ মধ্যবিত্ত হওয়া অথবা উচ্চবিত্ত থেকে ধনীতম তালিকায় প্রবেশ করার হার কিন্তু এই প্রবণতার তুলনায় কম। মহারাষ্ট্রে সবথেকে বেশি রয়েছে এই মিলিওনেয়ার পরিবার, মোট ১ লক্ষ ৭৮ হাজার। ভারতের গ্রামীণ এলাকা অথবা মফস্সলের সঙ্গে নগরজীবনের আর্থিক বৈষম্য যে কতটা, তার সবথেকে বড় প্রমাণ হল এই সংখ্যা। কারণ, এর মধ্যে ১ লক্ষ ৪২ হাজারই মুম্বইয়ের বাসিন্দা। দিল্লির ‘মিলিওনেয়ার’ পরিবারের সংখ্যা ৭৯ হাজার ৮০০। রিপোর্টে বাংলার জন্য একটি সুসংবাদ আছে। ভারতে সবথেকে বেশি এই শ্রেণির ধনী বাস করে মাত্র সাতটি শহরে—দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, আমেদাবাদ, হায়দরাবাদ, পুনে এবং কলকাতা।
নয়া সমীক্ষা রিপোর্টের সঙ্গে সামাজিক ক্রয়বিক্রয়ের কোন প্রবণতার মিল দেখা যাচ্ছে? সেটি হল, হঠাৎ বিগত কয়েক বছর ধরে সোনার দাম এবং সেনসেক্স পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাওয়া। বিগত ৬ মাসে সোনা অবশ্য অনেক এগিয়ে গিয়েছে। বিপুল সোনা ক্রয় করছে এই ‘মিলিওনেয়ার’ শ্রেণি। তাই চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু কেন সোনা কিনছে তারা? কারণ, আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারের অনুমান ২০৩০-৩৫ সালের মধ্যে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম আড়াই লক্ষ টাকাতেও নাকি পৌঁছতে পারে। দ্বিতীয় উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে অটোমোবাইল সেক্টর থেকে। ‘এন্ট্রি লেভেল’ গাড়ির বিক্রি কমে গিয়েছে বিপুলভাবে। অর্থাৎ, যেগুলির দাম ১০ লক্ষ টাকার কম। অথচ বেড়ে চলেছে ১০ লক্ষ টাকার বেশি দামের গাড়ি বিক্রি।
অন্য একটি সরকারি রিপোর্টও অবশ্য পাশাপাশি আছে। ৮২ কোটি মানুষকে এখনও বিনামূল্যে চাল-গম দিয়ে যেতে হচ্ছে সরকারকে। সংবিধানে লেখা আছে, বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য। আদতে বৈষম্যের মধ্যে ঐক্য!