


প্রীতম দাশগুপ্ত: ট্রেনে যাচ্ছিলাম। মাঝবয়সি দুই ব্যক্তির আলোচনা কানে এল। বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নাগরিকত্ব। স্বাভাবিকভাবেই কান খাড়া হয়ে উঠল। প্রথমে ভাবলাম, বোধহয় রাজ্যের নীতি নিয়ে চর্চা চলছে। অবৈধ তকমা দিয়ে যেভাবে
একশ্রেণির লোককে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, হয়তো তা নিয়ে গম্ভীর আলোচনা। কারণ ওই লোকগুলির অনেকেরই এখন না ঘরকা না ঘাটকা দশা। ভারত বলছে আউট। বাংলাদেশ বলছে নো ইন। তাই এখন খোলা আকাশই তাঁদের জায়গা। কোন দেশের তাঁরা নাগরিক, সেটা তাঁরা নিজেরাও জানেন না। ভাবলাম, মানবিক কারণেই বোধহয় দু’জনে উদ্বিগ্ন। তারপরই বুঝলাম, ব্যাপারটা শুধু ওইখানে সীমাবদ্ধ নেই। দুই ব্যক্তিই উদ্বিগ্ন একটাই কারণে। তাঁরা নিজেরাও কি ভারতের নাগরিক? এটাই বুঝতে পারছেন না পঞ্চাশ পেরিয়ে যাওয়া ওই দুই ব্যক্তি। সৌজন্যে বিদেশ মন্ত্রকের সাম্প্রতিক একটি বিবৃতি। পাসপোর্ট মোটেও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। এর আগে বার্থ সার্টিফিকেট, আধার, প্যান থেকে শুরু করে রেশন, এমনকি ভোটার কার্ডও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় বলে ঘোষিত হয়েছে। আইন বলছে, রাষ্ট্র আপনাকে অবৈধ বললে, নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় আপনার। প্রশ্নটা এখানেই? তাহলে আমরা নিজেদের নাগরিক কীভাবে প্রমাণ করব? এ তো সেই সুকুমার রায়ের বিখ্যাত ‘শিব ঠাকুরের আপন দেশে, আইন-কানুন সর্বনেশে’ ব্যাপার।
তাঁদের আলোচনা আমার মনকেও নাড়িয়ে দিল। সত্যিই তো। এ তো মহা ফাঁপরে পড়া গেল। আয়কর দপ্তর জানিয়েছে, প্যান কার্ড দেশের নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। এটা আয়কর দেওয়ার মাধ্যম মাত্র। খাদ্যদপ্তর বলছে, রেশন কার্ড সেটা আবার কী করে নাগরিকত্বের প্রমাণ হবে? ওটা তো স্রেফ খাদ্যসামগ্রী পাবেন কি না, সেটা দেখার উপায়। জমির দলিলে রেজিস্ট্রার সই করেছেন। আপনি ভারতীয় উল্লেখ রয়েছে। তবুও এটা দিয়ে আপনি নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশন মানে শ্রীযুক্ত জ্ঞানেশ কুমারের দপ্তর জানিয়ে দিয়েছে, ভোটার কার্ড মোটেও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। আপনি ভোট দেন। এটা তার একটা পরিচয়পত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। সুপ্রিম কোর্ট আবার এসআইআর মামলায় জানিয়ে দিয়েছে, আধার মোটেও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। কারণ কেন্দ্র স্পষ্ট করে দিয়েছে, দেখবেন আধারে স্রেফ লেখা আছে, এটা একটা পরিচিতিপত্র। এবার বাকি ছিল পাসপোর্ট। দিন কয়েক আগে বিদেশ মন্ত্রক জানিয়ে দিল, ওটা স্রেফ ট্রাভেল ডকুমেন্ট। মানে পাসপোর্ট থাকলেই আপনি ভারতীয় নাগরিক, এমনটা মোটেও নয়। আমিও ভাবতে বসলাম, তাহলে আমরা কারা? আমার কাছেও তো প্রমাণপত্র বলতে এসবই আছে। কিন্তু এই দিয়ে তো নিজেকে ভারতীয় প্রমাণই করতে পারব না। অথচ আমি ভোট দিলাম। দেশের তখতে কে বসবে, সেটাও ঠিক করলাম। কিন্তু আমরা কি ভারতীয়? তার থকেও বড়ো কথা দেশের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী—এরাই বা কারা? ভারতের নাগরিক? আমাদেরই যদি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকে, তবে আমাদের ভোটে নির্বাচিতরাই বা কীভাবে ভারতীয় হবে? আমরা কি ভার্চুয়াল জগতে আছি? মাথাটা ঘুরে গেল। সব যেন কেমন ধাঁধার মতো লাগল। এর থেকে বোধহয় কে সি নাগের অঙ্ক বোঝা অনেক সোজা।
নাগরিকত্ব হল, একটি আইনি মর্যাদা। পরিচয়পত্রের সঙ্গে নাগরিকত্বের পার্থক্য রয়েছে। পরিচয়পত্র আপনাকে কেবল একজন সরকারি সুবিধাভোগী হিসাবে দেখাবে। কিন্তু নাগরিকত্ব হল আইনি অধিকার। আপনাকে রাষ্ট্র সমান মর্যাদা দিতে বাধ্য। আপনি নাগরিক হলে সংবিধানের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত হয়। রাষ্ট্রকে আপনি প্রশ্ন করতে পারেন। কোনো সরকার সহজে সেটা কেড়ে নিতে পারে? দার্শনিক হানা আরেন্টের ভাষায়, নাগরিকত্ব মানে স্রেফ নাগরিক অধিকার ভোগ করা নয়। এটি আসলে অধিকার লাভের অধিকার। ভারতে কারা নাগরিক সেটা নির্ধারিত হয়, নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫ অনুযায়ী। আমাদের সংবিধানের ৫ নম্বর থেকে ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের মধ্যেও নাগরিকত্ব নিয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আছে। আইন অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে এ দেশে জন্মগ্রহণ করা যেকোনো ব্যক্তিই ভারতের নাগরিক। ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের পর হলে মা-বাবার মধ্যে কোনো একজনকে ভারতের নাগরিক হতে হবে। নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতে মূলত পাঁচটি স্বীকৃত পদ্ধতি রয়েছে। ১) জন্মসূত্রে ২) বংশসূত্রে ৩) রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ৪) স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং ৫) কোনো ভূখণ্ড ভারতে অন্তর্ভুক্ত হলে। এসব তো সরকারি বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, নিজেকে ভারতীয় কীভাবে প্রমাণ করব?
ভাবছেন ১৯৮৭ সালের আগেই তো জন্মেছেন, চিন্তা কী? ২০২০ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সংসদে স্পষ্ট করে দিয়েছে, বার্থ সার্টিফিকেট নাগরিকত্বের একক প্রমাণ নয়। মানে বার্থ সার্টিফিকেট আছে বলেই আপনি এদেশে জন্মেছেন, এমনটা নয়। এর এক বছর আগেই অবশ্য পিআইবি জানিয়েছিল, দেশে নাগরকিত্ব প্রমাণের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নথিই নেই। কেন্দ্রের ও আদালতের যুক্তি অত্যন্ত পরিষ্কার। নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র ও পরিচিতিপত্রের মধ্যে তফাৎ রয়েছে। যেমন ধরুন, আধার কার্ড। আজকের দিনে আধার না থাকলে জীবনটাই আঁধার। সরকারি কোনো সুবিধা বা ডাইরেক্ট বেনিফিট আপনি পাবেন না। ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করতে যান, আধার লাগবে। সিম কিনতে যান, আধার লাগবে। দেশের মধ্যে ঘুরতে যান আধার লাগবে। কেন লাগবে? এটা নাকি প্রমাণপত্র। কিন্তু সরকার বলছে, আধার কার্ড একজন ব্যক্তির পরিচয়। ভারতে বসবাসের প্রমাণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে নয়। মানে কোনো বিদেশি নাগরিকও এদেশে বসবাস করার সময় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে আধার পেতে পারেন। আপনি আয়কর দেন। ভাবলেন, দেশের নাগরিক না হলে কি আর আমি আয়কর দিতাম? ভুল। সরকার বলছে, প্যান কার্ড শুধুই কর-সংক্রান্ত পরিচয়পত্র। এটি আয়কর দপ্তর ইস্যু করে। আর্থিক ও কর-সংক্রান্ত লেনদেনের জন্য এই কার্ডের প্রয়োজন। ভারতে আয় করেন বা বিনিয়োগ করেন, কিন্তু বিদেশি নাগরিকরাও প্যান কার্ড পেতে পারেন। আপনার কাছে ভোটার কার্ড আছে। ভাবলেন দেশের নাগরিক না হলে কি আর আমাকে ওই কার্ড দেবে? সরকার বলে দিল আপনি ভোটার কি না, সেটা বোঝার জন্য ওই কার্ড। এটা আপনার ভোট দেওয়ার অধিকার সুনিশ্চিত করে, নাগরিকত্বের নয়। আপনার নাম ভোটার তালিকায় আছে বলেই আপনি দেশের নাগরিক, এটা মোটেও বলা যাবে না। আপনি বিদেশে ঘুরতে যান। আপনার কাছে পাসপোর্ট আছে। দেশের সরকারই আপনার নথি খতিয়ে দেখে পুলিশ ভেরিফিকেশন করে ওই কার্ড ইস্যু করেছে। কিন্তু এখন সরকার বলছে, পাসপোর্ট নাগরিকত্বের পক্ষে শক্তিশালী সহায়ক নথি ঠিকই। কিন্তু এটি একাই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত আইনি প্রমাণ নয়। এটা আসলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ডকুমেন্ট। যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বা আইনগত কারণ থাকলে পাসপোর্ট বাতিলও হয়। তাই এটিকে নাগরিকত্বের প্রমাণ তো বলাই যাবে না। যুক্তি পরিষ্কার। সেই স্কুলজীবনে যেমন আমরা পড়েছিলাম, সব ক্ষারকই ক্ষার। কিন্তু সব ক্ষার ক্ষারক নয়। তেমনই বলা হয়েছে, একমাত্র নাগরিকেরাই পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু পাসপোর্ট থাকার অর্থ নাগরিকত্ব নয়। প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচন কমিশন কীভাবে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য পাসপোর্টকে বৈধ নথি বলতে পারে? বিদেশ মন্ত্রকের পাসপোর্ট ম্যানুয়ালেও তো বলা আছে, এটি নাগরিকত্বের প্রমাণ। সব দেখে মনে হচ্ছে, সরকারের বাঁ হাত জানেই না ডান হাত কী করবে? আর আইনের এই মারপ্যাঁচে নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করতে আম আদমির তো ঘুম উবে যাচ্ছে। মানুষ তো নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করতে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকছেন।
মনে রাখবেন, এই বিতর্ক তখনই উঠল যখন দেশের ১৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআরের কাজ চলছে। এরই মধ্যে দেশজুড়ে এনআরসি ও সিএএ কার্যকর করার প্রয়াস নিশ্চিতভাবেই নেবে কেন্দ্রীয় সরকার। বলা হচ্ছে, এনআরসির মাধ্যমে খুঁজে বের করা হবে অবৈধ নাগরিকদের। এতে আশঙ্কা তো থাকছেই। সত্যিই অবৈধ খোঁজা হবে, নাকি ‘অবৈধ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হবে। অসমের উদাহরণ এই আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এই তো কয়েক দিন আগের কথা। নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করার জন্য আদালতে ১৫ নথি জমা দিয়েছিলেন অসমের এক ব্যক্তি। তার পরেও নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। তাঁর আবেদন খারিজ করেছে গুয়াহাটি হাইকোর্ট। অসমের ডিটেনশন ক্যাম্পে দুর্দশার খবর তো আমরা শুনেছি। ২০১৯ সালে ডিটেনশন ক্যাম্পেই মৃত্যু হয়েছিল দুলালচন্দ্র পালের।
এবার শোনা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকার একটি নাগরিকত্ব কার্ড আনার পরিকল্পনা করেছে। এটা নাকি ফাইনাল, অন্যবারের মতো জল্পনা নয়। ভালো কথা। কিন্তু সেই কার্ড পেতে গেলেও তো যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। সেখানেও যদি বেছে বেছে কার্ড দেওয়া হয়? কত লোক নিজভূমে পরবাসী হবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।