


ক্রীশ্চান সায়েন্সে বিশেষজ্ঞ একটি ছাত্র একবার স্বামী তুরীয়ানন্দকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমাদের শরীরটাকে সুস্থ রাখা কি আমাদের কর্তব্য নয়?” স্বামী তুরীয়ানন্দ উত্তর দিলেন, “হাঁ। কিন্তু সর্বোচ্চ দৃষ্টিভঙ্গীতে দেহধারণই মহাব্যাধি, মহাবিঘ্ন! আমরা দেহজ্ঞানের অতীত হয়ে অনুভব করতে চাই, আমরা অজর, অমর আত্মা। যে উচ্চতর অবস্থায় আমরা জানতে পারি, ‘আমি এই দেহ নই, আমি নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্ত আত্মা; দেহ মায়িক, মিথ্যা’—সেই অবস্থা লাভের পথে দেহপ্রীতিই বড় বাধা। যতদিন আমরা দেহকে ভালবাসব, ততদিন আমাদের আত্মজ্ঞান হবে না, এবং আমরা বার বার জন্মগ্রহণ করব। যখন আমরা দেহকে ঠিক ঠিক ভালবাসব তখন দেহের প্রতি আমাদের ঔদাসীন্য আসবেই আসবে। দেহাসক্তি দূরীভূত হলেই মুক্তির দিব্যালোক দৃষ্টিগোচর হবে।”
একটি ছাত্রীর মন সিদ্ধাই-প্রবণ ছিল। স্বামী তুরীয়ানন্দ এক দিন দেখিলেন তিনি স্বতঃ-লেখন অভ্যাস করিতেছেন। তিনি মনকে জড়বৎ নিষ্ক্রিয় করিয়া স্বতঃ-লেখনের জন্য হাতে একটি পেন্সিল লইয়া বসিলেন। হাতটি প্রেতচালিত হইয়া নাড়িতে ও লিখিতে আরম্ভ করিবে এবং তিনি উক্ত লেখা প্রকৃতিস্থ হইয়া দেখিবেন—ইহাই ছিল ছাত্রীটির উদ্দেশ্য। এই উপায়ে কাগজে সুন্দর সুন্দর বিষয় লিখিত হয়। ছাত্রীটিকে উক্ত কর্মে ঐপ্রকারে রত দেখিয়া স্বামী তুরীয়ানন্দ তাঁহাকে তীব্র ভর্ৎসনা করিয়া বলিলেন, “এ কি তোমার বোকামি? তুমি কি প্রেতচালিত হতে চাও? এই নিরর্থক ব্যাপার ছাড়। আমরা চাই মুক্তি। এই জগৎ এবং অন্যান্য সকল জগতের পারে আমরা যেতে চাই। প্রেতাত্মাদের সহিত যোগাযোগ করতে চাও কেন? তাদের শান্তিতে থাকতে দাও। এই সব মায়া। মায়ার বাহিরে যাও এবং মুক্ত হও।”
গুরুদাস মহারাজ বলেন, “স্বামী তুরীয়ানন্দের সঙ্গে শান্তি আশ্রমে আমরা নিরন্তর আনন্দ ও প্রেরণা পাইতাম। তাঁহার নিকট সর্বদা শিক্ষালাভ হইত। আমরা সকলেই অনুভব করিতাম তিনি আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য সদা সচেষ্ট। আধ্যাত্মিক ভাবে সদা আরূঢ় হইয়া তিনি কখন সুকোমল ও সুভদ্র সুশান্ত পিতৃতুল্য এবং কখন বা গর্জনকারী বেদান্তকেশরীবৎ ব্যবহার করিতেন। আশ্রমে একটি মুহূর্তও অবসাদ বা অলসতায় ব্যয়িত হইত না।” ব্যক্তিগত ভাবে অনেকেই কোন না কোন কঠোরতা অভ্যাস করিতেন। স্বামী তুরীয়ানন্দ কাহাকেও কঠোরতা অভ্যাস করিতে বলিতেন না। তারপর তপঃপ্রভাবে স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া কোন কোন ছাত্র বা ছাত্রী তপশ্চর্যায় ব্রতী হইতেন। কেহ আহারসংযম, কেহ মৌনাবলম্বন, কেহবা নির্জনবাস করিতেন। স্বেচ্ছাপ্রণোদিত তপস্যায় প্রত্যেকে বিপুল আনন্দ পাইতেন। আধ্যাত্মিকতার মূর্তি তপস্বীর কাছে কেহ উদাসীন বা অযত্নশীল থাকিতে পারিত না।
স্বামী জগদীশ্বরানন্দের “স্বামী তুরীয়ানন্দ” থেকে