


প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্রাম: ঝাড়গ্রামের জঙ্গলে নানা প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান মিলছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওষুধি গাছের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে। জেলার নদী, নালা, খালবিলে কুইচা মাছ দেখা যায়। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষরা বাত, উচ্চ রক্তচাপ, পাইলসের সমস্যা সমাধানে ওই মাছের শ্লেষ্মা গরম ভাতের সঙ্গে মেখে খান। সত্যিই কি কুইচা মাছ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর? উত্তর পেতে আসরে নেমেছে একদল গবেষক।
ঝাড়গ্রামের জঙ্গল বহু প্রাচীন কাল থেকে প্রাণী বৈচিত্র্যে ভরপুর। বনবিভাগের ট্র্যাপ ক্যামেরা বসানোর পর থেকে সোনালি খেঁকশিয়াল, হানি বেজার, ভল্লুক, নেকড়ে , বার্কিং ডিয়ারের সন্ধান মিলছে। এছাড়াও নানা ওষুধি গাছের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। জেলার জঙ্গলভূমির ওষুধি উদ্ভিদ ও নানা প্রজাতির প্রাণী এতদিন অগোচরে ছিল। পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে আলদা হবার পরেই ঝাড়গ্রাম নিয়ে পৃথক গবেষণা শুরু হয়। তারপর থেকেই জেলার বৈচিত্র্যময় প্রাণী ও ওষুধি গুণসম্পন্ন উদ্ভিদের সন্ধান মিলতে শুরু করে। ঝাড়গ্রাম বনদপ্তর গত বছর ৬০ হাজার হেক্টর জমির মাধ্যমে উদ্ভিদ (ফ্লোরা ) নিয়ে সমীক্ষা চালায়। মোট ১২টি রেঞ্জের ৩৬টি বিটে সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। ৪৯টি বিপন্ন গাছ ও ৪০টি ক্লাইম্বার গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। জুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া জেলাজুড়ে নানা প্রজাতির মাছের সন্ধানও চালাচ্ছে। বিনপুর-২ ব্লকের ঘাগড়া জলপ্রপাত এলাকায় সদ্য উত্তরবঙ্গের পাথর চাটা মাছের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। ডুলুং, পলপলার মতো ছোট নদীতে প্রচুর পরিমাণে কুইচা মাছ রয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর লোকেরা হাত, পায়ের যন্ত্রণা, বাত, উচ্চ রক্তচাপ, পাইলসের মতো স্বাস্থ্য সমস্যায় কুইচা মাছের গায়ের শ্লেষ্মা গরম ভাতের সঙ্গে খান। এবার ওই মাছের গায়ের শেষ্মার গুণাবলীর কারণ জানতে গবেষনায় নেমেছেন বিশেষজ্ঞরা।
পশ্চিম মেদিনীপুরের সুকুমার সেনগুপ্ত মহাবিদ্যালয়ে জিওলজি বিভাগের প্রধান সুমন প্রতিহার বলেন, ‘ঝাড়গ্রাম জেলা হওয়ার পরই জেলার উদ্ভিদ, নানা প্রজাতির পশুপাখিদের নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। তারপরই নানা তথ্য সামনে আসাতে শুরু করছে। জেলার জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষ বংশপরম্পরায় ওষুধি গুণের কথা জানেন। সন্ধান পাওয়া সেইসব গাছের রিপোর্ট কিছুদিনের মধ্যেই আমরা প্রকাশ করব। কুইচা মাছের গায়ের শ্লেষ্মা ওষুধ হিসেবে গরম ভাতের সঙ্গে খাওয়া হয়। গবেষকদের কাছে বিষয়টি এখনও অজানা। সীমিত ভাবে গবেষণার কাজ শুরু হয়েছে। সরকারের আর্থিক সহায়তা না পেলে বড় আকারে গবেষণা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে এই জেলা ওষুধ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভবনা রয়েছে।’
জুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার গবেষক সুমন দাস বলেন, ‘ঝাড়গ্রামে নদী-নালা, খাল-বিলের মাছ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। কুইচা জাতীয় মাছেদের গায়ে যে মিউসিন বা শ্লেষ্মা থাকে তা বাইরের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধে কাজ করে। মানুষের শরীরের ক্ষুদ্রান্তেও এই মিউসন থাকে। যা ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস রোধে কাজ করেছে।
কিন্তু কিভাবে এটা কাজ করে, তা এখন গবেষকদের কাছে অজানা। আমাদের তরফে এই বিষয় নিয়ে প্রাথমিকস্তরে গবেষণা শুরু হয়েছে।’ বেলপাহাড়ী কটুচুয়া গ্ৰামের বাসিন্দা সনাতন হেমব্রম বলেন, ‘আমাদের এখানে চিপাঘাটি খাল আছে। বর্ষার সময় প্রচুর কুইচা মাছ পাওয়া যায়। হাত পা যন্ত্রণা, বাতের ব্যথা হলে আমরা মাছের শ্লেষ্মা গরম ভাতে মিশিয়ে খাই। ব্যথা একদম সেরে যায়। এলাকার জনজাতির মানুষ এখনও এইসবে টোটকায় ভরসা রাখেন। এখন বাইরের মানুষজন আসছেন। তাঁরা আমাদের কাছে খোঁজখবর নিচ্ছেন।’ বেলপাহাড়ীর ঘাঘরা জলপ্রপাতে মাছ নিয়ে গবেষণায় রত গবেষকরা। (ইনসেটে) কুইচা মাছ। নিজস্ব চিত্র