


বস্তারের একমাত্র মহিলা বডি বিল্ডিং চ্যাম্পিয়ন খুশবু নাগ। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যাত্রাপথটা কেমন ছিল? জানালেন সবিস্তারে।
‘বাপু সেহত কে লিয়ে তু তো হানিকারক হ্যায়...!’ মনে পড়ছে ‘দঙ্গল’? আপনি সিনেপ্রেমী হলে এই গান আপনার মনে থাকবে। আমির খানের কড়া শাসনে বড় হয়েছিল দুই মেয়ে। পালোয়ান তৈরি করতে বাবার পরিশ্রমও কম নয়। মেয়ে পালোয়ান? সমাজ বাঁকা চোখে তাকিয়েছিল বটে। কিন্তু শেষ হাসি হেসেছিল খেলার প্রতি ভালোবাসা। বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় তৈরি হয়েছিল সেই ছবি। বাস্তবে আরও এক মেয়ে তৈরি হয়েছেন নিজের শর্তে। সমাজের চোখরাঙানিকে তোয়াক্কা না করে আদিবাসী সমাজ থেকে উঠে আসা মেয়েটি বিশ্বমঞ্চে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। মেয়েটি, খুশবু নাগ। বস্তার এলাকার একমাত্র মহিলা বডি বিল্ডিং চ্যাম্পিয়ন।
চোখে ধাঁধা লেগে যাওয়ার মতো সবুজের উৎসবে সাজানো ছত্তিশগড়ের নারায়ণপুর গ্রাম। বাবা, মা, দাদার সঙ্গে সেখানেই বড় হয়েছেন খুশবু। তাঁর কাছে প্রশ্ন ‘দঙ্গল’ দেখেছেন? ‘দেখেছি। ভালো লেগেছে। দেখুন, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশে মহিলা বডি বিল্ডার, পালোয়ান অনেক পাওয়া যাবে। কারণ ওখানকার পরিবেশ আলাদা। আমি কিন্তু বস্তারের একমাত্র মহিলা বডি বিল্ডার। এখানকার পরিবেশে এই কাজটা করা কঠিন। আমি আদিবাসী কন্যা। কোনও কিছুরই তেমন সুবিধে নেই। কিন্তু আদিবাসী সমাজ আমাকে বাধা দেয়নি। বরং আমার কাজ এই সমাজকে গর্বিত করেছে বলেই মনে করে ওরা,’ নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন খুশবু।
জীবনের কোন বাঁকে কী ম্যাজিক যে অপেক্ষা করছে, তার আভাস পাওয়া দুষ্কর। আদিবাসী সমাজে পড়শিদের মাঝেই বড় হয়েছেন খুশবু। পড়াশোনার পাশাপাশি ঘরের কাজও শিখেছেন। সময় হলে বিয়ে দেওয়া হবে, এই তো ভবিষ্যৎ! কিন্তু এই মেয়ের ললাটলিখন তো অন্যরকম। কোনওরকম খেলার সঙ্গে সম্পর্ক না থাকা মেয়েটি আজ খেলার স্বপ্নে বাঁচতে শিখেছে। ২০১৯ থেকে বদলে যায় খুশবুর জীবন। ক্যান্সারে মা চলে যান। অভাবের সংসার। বাবা ছুতোরের কাজ করেন। নেহাতই কিছু উপার্জনের আশায় জিমে যেতে শুরু করেন খুশবু। সেখান থেকে নিজের ফিটনেসের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। খেলার প্রতি আগ্রহের জমিও তৈরি হয় তখনই। ২০২২ থেকে পাওয়ার লিফটিংয়ের জার্নি শুরু। ইতিমধ্যেই তিনবার জাতীয় স্তরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন তিনি।
‘পাওয়ার লিফটিং দিয়ে আমি শুরু করি। ২০২৩ থেকে বডি বিল্ডিংয়ের প্রস্তুতি নিয়েছি। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এবছর মে মাসে দিল্লিতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এনপিসি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড-এ ব্রোঞ্জ মেডেল জিতেছি। এর আগে তিনবার গোল্ড মেডেল পেয়েছি’— জিম থেকে ফিরে ফোনে বলছিলেন খুশবু। বস্তার বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলজির স্নাতকোত্তর ছাত্রীটির সারা দিন কীভাবে কাটে? ‘সকাল পাঁচটা থেকে সাড়ে ন’টা পর্যন্ত জিমে ট্রেনার হিসেবে কাজ করি। নিজের ট্রেনিংও করি। ১১টার সময় ইউনিভার্সিটি যাই। প্রতিযোগিতা চললে বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়া হয় না। তার আগে প্র্যাকটিসও থাকে। বিকেল পাঁচটায় আবার জিমে যাই। রাত ন’টা পর্যন্ত কাজ করি’ একটানা বলে থামলেন ২২ বছরের খুশবু।
বিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে যে মেয়ের পড়াশোনা শুরু হয়েছিল, সেই লক্ষ্যপূরণ তো হয়নি এখনও। পারিবারিক চাপ রয়েছে? ‘না। এখন বিয়ের জন্য আমার উপর কোনও চাপ নেই। আমি নিজেও ভাবছি না। শুধু কেরিয়ারে মন দিতে চাই। বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই। পরিবার আর্থিক সাহায্য করতে পারে না। কিন্তু এসবের জন্য কখনও বাধা দেয়নি’, স্পষ্ট বললেন খুশবু। আর সমাজ? তাঁর কথায়, ‘গ্রামবাসীরা গর্বিত আমাকে নিয়ে। এখানকার এসপি স্যার সাপোর্ট করেন। আমার কোচ বিনীত যাদবের সমর্থন ছাড়া কিছুই করতে পারতাম না। কিন্তু আমার পুরুষালি চেহারা নিয়ে অনেক কটূক্তি শুনতে হয়।’ বডি বিল্ডিং যেখানে জীবনের লক্ষ্য বদলে দিয়েছে, সেখানে নেতিবাচক মন্তব্য কি পিছিয়ে দিতে পারে? না! সেসব নিয়ে ভাবেন না খুশবু। ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু লোক বলে, আমার পুরুষের মতো চেহারা। কী করে বিয়ে হবে? কে বিয়ে করবে ওকে? এসব মন্তব্য শুনতে হয়। কিন্তু সেসব পাত্তা দিই না। এসব শুনলে আর এগতে পারব না। আবার কিছু মানুষ পজিটিভ মন্তব্য করেন। সেখান থেকে অনুপ্রেরণা পাই। কিন্তু সকলে ভালো মন্তব্য করবেন না, এটাও জানি’— পথটা যে বন্ধুর, তা এই মেয়ের জানা।
শারীরিক গঠনগত পার্থক্যের কারণেও এই পথ মেয়েদের জন্য সহজ নয়, অভিজ্ঞতায় জেনেছেন খুশবু। তিনি বলেন, ‘ছেলেদের পেশির বৃদ্ধি খুব তাড়াতাড়ি হয়। আর মেয়েদের অনেক সময় লাগে। কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। সঠিক ডায়েট লাগে। আমি ট্রেনারের কাজ করি। তাতে কিছু টাকা পাই। সেটা দিয়ে ট্রেনারের ঠিক করে দেওয়া ডায়েট— সয়াবিন, মুরগির মাংস, ডিম, কলা, দুধ হয়ে যায়। কিন্তু প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গেলে অনেক অর্থের প্রয়োজন। সেই ক্ষমতা আমার পরিবারের নেই।’
পড়াশোনা, জিমের কাজ, ট্রেনিং করেই সময় কাটে খুশবুর। খুব বেশি বন্ধু নেই তাঁর। অবসরে কী করেন? ‘ছবি আঁকি। বাঁশ কেটে তার ওপর নকশা করি। যেটা সকলে ‘বস্তার আর্ট’ নামে চেনে। ছোট থেকেই বাবাকে করতে দেখেছি, সেটা দেখেই শিখেছি। বাবার কাজে সাহায্য করি’, বললেন তিনি। সুযোগ পেলে বেড়াতেও ভালোবাসেন এই আদিবাসী কন্যা। ‘২০২৪-এর ডিসেম্বরে মুম্বই গিয়েছিলাম একটা প্রতিযোগিতায়। সোনা জিতেছিলাম। পাওয়ার লিফটিংয়ে ‘স্ট্রং উওম্যান অব ইন্ডিয়া’ হয়েছিলাম। সেসময় মুম্বই ঘুরেছি। এছাড়া বিশাখাপত্তনম, বিজয়ওয়ারা, আগ্রা আমার ঘোরা। আসলে পাহাড়ে বেড়াতে যেতে ভালো লাগে।’ কলকাতা এসেছেন কখনও? ‘না। কলকাতা কখনও যাওয়া হয়নি। সুযোগ পেলে যাব আপনাদের শহরে।’ হালকা হেসে প্রতিশ্রুতি দিলেন খুশবু।
আদিবাসী এলাকা থেকে এই লড়াই সহজ ছিল না। সামনে আরও কঠিন পথ পেরতে হবে, তা জানেন খুশবু। তিনি নিজেই আজ অনেকের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তাঁর অনুপ্রেরণা?
‘গীতা সাইনি, বডি বিল্ডার।
ও আমার আইডল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ওকে দেখে মনে হয়েছিল, আমাকেও ওর মতো হতে হবে’, বললেন তিনি। যে কথার মধ্যে নিহিত আত্মবিশ্বাসের সুর।
ছোট্ট গ্রামের সীমানা পেরিয়েছেন খুশবু। জগৎসভায় দেশের মুখ উজ্জ্বল করাই এখন তাঁর লক্ষ্য।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য