


নারী দিবস উপলক্ষ্যে চতুষ্পর্ণীর বিশেষ ফ্যাশন ফোটোশ্যুটে মধুবনী চট্টোপাধ্যায় এবং অদিতি মুন্সি।
• নারী দিবস। ক্যালেন্ডারের একটি নির্দিষ্ট দিনেই কি সীমাবদ্ধ? নাকি সারা বছর জুড়েই রয়েছে তার ব্যাপ্তি? উত্তর খুঁজতে চতুষ্পর্ণী পৌঁছেছিল এমন দু’জন নারীর কাছে যাঁরা নিজের কর্মক্ষেত্রে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। নৃত্যশিল্পী মধুবনী চট্টোপাধ্যায় এবং সংগীতশিল্পী তথা বিধায়ক অদিতি মুন্সি। নাচের জন্য নিজেকে পরিপাটি করে সাজিয়ে তোলেন মধুবনী। মঞ্চে সংগীত পরিবেশনের আগেও যথাযথভাবে নিজেকে তৈরি করে নেন অদিতিও। কিন্তু ফ্যাশন ফোটোশ্যুট? না! এ অভিজ্ঞতা তাঁদের কাছে নতুন। নারী দিবসের কথা মাথায় রেখে শাড়ি নির্বাচন করা হয়েছিল। হাতে বোনা পিওর সিল্কে জামদানির কাজ। মধুবনী পরেছিলেন স্লেট ব্লু রঙের শাড়ি। তাঁর খোলা চুলের মায়ায় বসন্ত দুপুর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। অদিতির পরনে ছিল ওয়াইন রঙা সিল্ক। মিষ্টি হাসি তাঁর লুকে আভিজাত্য বহন করে।
ফোটোশ্যুটের মাঝেই দুই নারীর সখ্য তৈরি হল। পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসায় ভরা আবহে শুরু হল নারী দিবসের গল্প। কোনো একটা দিনে নারীদের বেঁধে ফেলতে নারাজ দু’জনেই। মধুবনী বললেন, ‘আমার মনে হয় নারীত্ব প্রতিদিনের উদ্যাপন। প্রকৃতিকে যেমন একদিনে বাঁধা যায় না। নারীকেও একদিনে বেঁধে ফেলা অসম্ভব।’ একমত অদিতিও। বললেন, ‘নারীদের বিশেষ দিন বলে আলাদা করে দেওয়ার মানে হয় না। আমার কাছে এর খুব একটা গুরুত্ব নেই।’ শিল্পী হিসেবে তাঁদের গড়ে তোলার নেপথ্যে কোন নারীদের ভূমিকা রয়েছে? অদিতির কথায়, ‘আমার মায়ের কথাই বলব। তাঁর নিজের ইচ্ছে, গানের প্রতি ভালোবাসা, আমার জন্যই স্যাক্রিফাইস করেছেন। এখন মেয়েদের পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে, কয়েক বছর আগেও সন্তান আসা মানেই তাকে ঘিরে মায়ের জগৎ। আমার মাও তেমনই একজন।’ মধুবনী বললেন, ‘প্রথমেই বলব দিদার কথা। তিনি না থাকলে এত আলোকোজ্জ্বল শিল্পের জগতের খোঁজ পেতাম না। তারপর আমার মা। আদ্যোপান্ত শিল্পী হয়েও আমার ভালোবাসাকে রূপ দেওয়ার জন্য নিজের কেরিয়ারের সঙ্গে সমঝোতা করেন। আমার সেই শিক্ষিকারা, যাঁরা হাত ধরে সুন্দর জীবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। ইতিবাচক জীবনযাপন শিখিয়েছেন। আর যাঁরা জীবনের কঠিন অন্ধকার চিনিয়েছেন, আমি তাঁদের কাছেও কৃতজ্ঞ। কারণ শুধু আলো দিয়ে জীবনকে চেনা যায় না। আলোর মহিমা বুঝতে অন্ধকারকেও প্রয়োজন।’
সদ্য মা হয়েছেন অদিতি। বদলেছে জীবনের মানে। সেই আয়নায় নিজের মাকে যেন নতুন করে চিনছেন তিনি। ‘মায়েরা একটা কথা বলেন, ‘মা হলে বুঝবি’। আমি সত্যিই এখন বুঝতে পারছি। আগে মাকে বলতাম, তোমার নিজেকে আরও বেশি পলিশ করা উচিত ছিল। কেন করোনি? মা শুধুই হাসত। কোনো উত্তর দিত না। এখন সেই হাসির মানে বুঝি। মা আর সন্তানের মধ্যে এক অদৃশ্য আয়না কাজ করে’, হেসে বললেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে শিল্পমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত মধুবনী। মেয়েদের কতটা বদলাতে দেখলেন? তাঁর উত্তর, ‘খুব কিছু বদলায়নি। আমার কাছে নানা বয়সের মেয়েরা আসেন। এখনও নিজের জন্য বাঁচাটা অপরাধ বলে মনে করেন। এটা আগেও ছিল। এখনও আছে। এর থেকে বোধহয় মুক্তি নেই। এটাতেই তাঁরা অভ্যস্ত। এভাবেই তাঁরা বাঁচতে ভালোবাসেন। তবে তাঁরা নাচছেন। মঞ্চে উঠছেন। নিজেদের প্রকাশ করছেন। একাকিত্ব থেকে যেন মুক্তির আনন্দ। চিরকাল নিজেদের উপেক্ষিত করে বাকিদের জন্য এগিয়ে গিয়েছেন। নিজের জীবন যে নিজের অধিকার, এটা যতদিন না আমরা মজ্জাগত করে নেব, ততদিন এই হীনমন্যতা থেকেই যাবে। নিজেকে ভালো রাখা যে সবথেকে জরুরি, এটা এখনও যেন বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি মেয়েরা।’
অদিতির অভিজ্ঞতায় মেয়েরা এগিয়ে এসেছেন। তার থেকেও বেশি এগিয়ে এসেছেন তাঁদের মায়েরা। তিনি বলেন, ‘আগে হয়তো মায়েরা অনেক ক্ষেত্রে কথা বলতে পারতেন না। এখন সন্তানের জন্য তাঁরা অনেক সরব। সন্তানের মধ্যে দিয়ে স্বপ্ন দেখেন। আমি যখন কীর্তন নিয়ে পড়াশোনা করেছি, অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছি। এখন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অভিভাবকরাই সন্তানদের এই বিষয়ে পড়াতে আগ্রহী।’
স্বরলিপি ভট্টাচার্য