


ডঃ রণবীর লাইশরাম: এই দেশ যেমন মহারাষ্ট্রের, যেমন গুজরাতের, যেমন অসমের, তেমনই এই দেশ আমাদেরও। আমরা মণিপুর। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক কোণে পড়ে থাকা ভারতেরই একটা অংশ। গত তিন বছর ধরে অশান্তির আগুনে পুড়ছি আমরা। মৃত্যুমিছিল বাড়ছে। ভিটেমাটি ছাড়া মানুষও। প্রতিদিনের হিংসার খবর আর ভিডিয়ো দেখলে মনে হবে, এ যেন তেল আভিভ বা তেহরান। কিন্তু না। আমরা বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। ১২ বছর আগে আমাদের দেশে ‘আচ্ছে দিন’ এসে গিয়েছে। ডবল ইঞ্জিন ছুটছে। আমাদের রাজ্যেও। কিন্তু শুধু নিজেদের আখের গোছাতে। তাই আমাদের মণিপুরে মায়ের কোলে ছোট্ট দু’টি শিশু ঘুমের মধ্যে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার পরও ডবল ইঞ্জিনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের একবারের জন্যও এই জনপদের কথা মনে পড়ে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সোশ্যাল মিডিয়ায় পর্যন্ত মণিপুরের জন্য একটা শব্দ খরচ করার প্রয়োজন বোধ করেন না। মাত্র ৩৫০ কিমি দূরে অসমে তাঁরা প্রচারে আসেন। বারবার। ঝাঁকে ঝাঁকে। কিন্তু মণিপুর। তাঁদের কাছে দূরের গ্রহ। পশ্চিমবঙ্গে শুধু ভোটের জন্য আড়াই লক্ষ কেন্দ্রীয় বাহিনী তাঁরা নামাতে পারেন, কিন্তু হিংসায় বিধ্বস্ত মণিপুরকে শান্ত করার এতটুকু ইচ্ছে তাঁদের কাজেকর্মে প্রকাশ পায় না। এটাই তাঁদের মুখ। যা দেখা যায় বা দেখানো হয়, সেটা নয়। আজ আমরা জেনে গিয়েছি, সেটা স্রেফ মুখোশ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটা চিনেছেন বলেই লাগাতার লড়ে যাচ্ছেন এই গণতন্ত্রবিরোধী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে। তাই পশ্চিমবঙ্গের ভোট ময়দানকে যুদ্ধক্ষেত্রে বদলে দিয়েছেন দিল্লির একনায়করা।
বলতে দ্বিধা নেই, এমনই এক বিরোধী শক্তি দরকার মণিপুরের। গোটা দেশের। না হলে রাষ্ট্রশক্তির নামে এই রাজনৈতিক এজেন্ডার মোকাবিলা সম্ভব নয়। সংবিধান থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, সবকিছুকে ভেঙেচুরে নিজের প্রয়োজন মতো ব্যবহার করে চলেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই ক্ষেমচাঁদ সিংকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে তিনি ভোলেন না। কিন্তু সদ্যোজাত কন্যা সন্তানটি রকেট হামলায় প্রাণ হারালে তাঁর টনক নড়ে না। তিনিই আবার ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’-এর স্লোগান দেন! আমাদের কত সন্তান হিংসার আগুনে অকালে পুড়ে যায়, কত মা-বোনের নির্যাতন আন্তর্জাতিক খবর হয়, তার খবর দিল্লি রাখে না। বরং আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঝকঝকে স্যুটে টিভি ক্যামেরার সামনে বসে মহিলা সংরক্ষণ আইনের সংশোধনী নিয়ে কান্নাভেজা গলায় দেশবাসীর ভাবনাকে অন্য খাতে বইয়ে দেন। মহিলা দরদি হওয়ার অভিনয় করেন।
বাকি পাঁচজন ভারতবাসীর মতো আমরাও তো দেশকে ভালোবাসি। আমরাও ভারতীয় হিসাবে কর দিই, ভোটের লাইনে দাঁড়াই। কিন্তু অন্য ভারতীয়দের মতো কেন সংবিধানের মৌলিক অধিকারটুকু আমরা পাব না? কেন? মানুষের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করি বলে? তাই আমরা দেশদ্রোহী? সরকারের চোখে তো তাই। কারণ, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, রাষ্ট্রসংঘে আমরা এই ভয়াবহ ছবি তুলে ধরি। তা আঁতে ঘা দেয় কেন্দ্রের। মণিপুরে অশান্তি নিয়ন্ত্রণে সরকারি স্তরে যাঁদের নিয়োগ করা হয়েছে... যেমন মুখ্যসচিব, পুলিশ মহানির্দেশক সহ অন্যান্য আধিকারিক, সবাই সরাসরি দিল্লি থেকে। রাজ্য মন্ত্রিসভাকে আড়ালে রেখে তাঁরাই সবকিছু করছেন। দিল্লির নির্দেশে। কেন্দ্রকে রিপোর্টও পাঠাচ্ছেন। কিন্তু সব জেনেশুনেও আশ্চর্যজনকভাবে মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন বিজেপির কর্তারা। এটাই তাঁদের চরিত্র। বিভাজন চাই। তাহলেই মানুষকে ভুল বোঝানো যাবে। ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে। তাঁরা শুধু নিজেদের আখেরের প্রয়োজনে উড়ে বেড়াবেন। হেলিকপ্টারে। বিশেষ বিমানে। পা মাটিতে পড়ে না তাঁদের। এতটাই ‘অসাধারণ’ তাঁরা। অহংকার তাঁদের সাধারণ মানুষের থেকে দূরে ঠেলে দেয়। কিন্তু তাতেও কিছু আসে যায় না। কারণ, ডবল ইঞ্জিন ছুটছে। চ্যালেঞ্জ ছোড়ার কেউ নেই। কর্তব্য মনে করানোর কেউ নেই। দু’মুখো নীতির ঘোড়ায় চেপে এই মহামহিম নেতারা পিষে দেন আম জনতার আর্তিকে। তাঁদের দ্বিচারিতার একটা বড়ো উদাহরণ হল সীমান্তের কাঁটাতার। বাংলার নির্বাচনকে সামনে রেখে কেন্দ্র সীমান্তে কাঁটাতার নিয়ে বারবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে দোষারোপ করেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকসভায় দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার জমি দিচ্ছে না বলে বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া যাচ্ছে না।’ অথচ মণিপুর-মায়ানমার সীমান্তে যদি কাঁটাতারের বেড়ার কাজ সম্পূর্ণ হত, এমন হিংসার ঘটনাই নগণ্য হয়ে যেত। মণিপুরের ডবল ইঞ্জিনের সরকারের নিশ্চয়ই অমিত শাহকে জমি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আপত্তি নেই! তাহলে এই কাজটাও হচ্ছে না কেন? এখানে তো পশ্চিমবঙ্গের মতো দোষ চাপানোর অজুহাত নেই! এটাই বাস্তব। সুরক্ষা থেকে উন্নয়ন—এই দল, এই সরকার মানুষের জন্য কিছুই করে না। এদের টার্গেট শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকা। আর তার জন্য বিরোধী রাজনীতিকে খুন করা। কেন্দ্র থেকে রাজ্য—সর্বত্র। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই সমীকরণে ঘায়েল করা যায়নি বলেই গেরুয়া নেতাদের এত গাত্রদাহ। এই কারণেই আজ কিছুটা হলেও এই রেজিমেন্টেড এজেন্ডাধারীরা ব্যাকফুটে। আর এই কারণেই প্রত্যেক রাজ্যে একজন মমতা প্রয়োজন। রাজ্যের জন্য কথা বলতে। বঞ্চনার জবাব দিল্লির দরবার পর্যন্ত পৌঁছে দিতে। তাঁর সাধারণ জীবনযাপন, সমৃদ্ধ বক্তব্য, আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, মানুষের জন্য কীভাবে লড়াই করতে হয়। হার না মেনে। রাষ্ট্রযন্ত্র লাগাতার পিছনে পড়ে থাকলেও।
আমাদের রাজ্যের ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। ১৯৬০ ভারত-চীন যুদ্ধে মণিপুরের বহু যুবক বলেছিলেন, ‘আমরা ভারতীয় সেনাতে যোগ দিতে চাই। দেশের জন্য লড়াই করতে চাই।’ অথচ আজ এই মণিপুর নিয়েই কতই অবহেলা কেন্দ্র সরকারের! আমরা আশাহত। গত রবিবার
মণিপুরের হাজার হাজার মহিলা যখন প্রিয়জন হারানোর শোকে, রাজপথে মশাল হাতে প্রতিবাদে বেরিয়েছিলেন, তখন নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ঠেকাতে কাঁদানে গ্যাস, গুলি ছুড়েছে। লাঠিচার্জ করা হয়েছে ‘অষ্টলক্ষ্মীর লক্ষ্মীদের’ উপর। আর ঠিক তখন আমাদের মাননীয় মোদিজি ব্যস্ত বাংলায় ঝালমুড়ি খেতে। এটাই ‘নতুন ভারত’। ‘বিশ্বগুরু’র স্বপ্নের ভারত। লেখক স্যোশাল সায়েন্টিস্ট, মণিপুর